মন্ত্রীর চুরি হওয়া ফোন পুলিশি হেফাজতে, তথ্য চুরির আশঙ্কা আছে?

- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ছিনতাই হওয়ার দেড় মাস পর বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ. মান্নানের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে।
ধানমন্ডি থানা পুলিশ রোববার ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর চুরি যাওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে।
তবে ফোনটি এখনও পুলিশি হেফাজতে আছে। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর মোবাইল হ্যান্ডসেটটি মন্ত্রীকে বুঝিয়ে দেয়া হবে।
পুলিশ এখন পর্যন্ত মূল ছিনতাইকারীকে ধরতে না পারলেও চোরাই মোবাইল কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মোবাইল চুরি চক্রের সাথে জড়িত অন্য সদস্যদের ধরতে অভিযান চলছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
সোমবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রমনা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান।
চুরি যাওয়া ওই ফোনটির কোন তথ্য বেহাত হয়েছে কিনা কিংবা মন্ত্রীর মোবাইল ফোনে থাকা কোন তথ্য বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ করার কথা জানিয়েছে এ ব্যাপারে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ.কে.এম. হাফিজ আক্তার।
গত ৩০শে মে সন্ধ্যায় ঢাকার বিজয় সরণি মোড়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর গাড়ির ভেতরে তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি ছিনতাই হয়।
কেঁচো খুড়তে সাপ
মন্ত্রীর ফোন চুরির ঘটনায় সাধারণ ডায়রি করার পর সেটি উদ্ধারে পুলিশ তৎপরতা চালালেও কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না।
এসময় আরেকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে মন্ত্রীর ফোনটির খবর পাওয়া যায়। অনেকটা কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ পাওয়ার মতো।
পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১২ই জুলাই বিকেলে এক নারী রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল থেকে অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি তার ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়।
এরপর ওই নারী ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, DMP
সেই মামলার তদন্তকালে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দু'জনকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল।
এরপর তাদের দেয়া তথ্যে বেরিয়ে আসে তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় যিনি ওই ফোনটি কিনেছিলেন বলে পুলিশ জানতে পারে। কিন্তু তার কাছে ফোনটি পাওয়া যায়নি।
তিনি এটি এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের কাছে বিক্রি করেছেন বলে জানান।
সেই তথ্যের ভিত্তিতে ওই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞকে খুঁজে বের করে পুলিশ।
কিন্তু মন্ত্রীর ফোন ততদিনে আরেকজনের কাছে হাত বদল হয়ে গেছে বলে পুলিশ জানতে পারে।
ডিএমপি নিউজ সূত্রে জানা গেছে, ওই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মূলত, বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে আইফোনসহ বিভিন্ন স্মার্টফোন আনলক ও আইএমইআই পরিবর্তন করে সেটাকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে।
পরবর্তীতে সেটা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিক্রি করে দেয়া হতো।
তার কাছ থেকে আইএমইআই পরিবর্তনে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, ১০টি বিভিন্ন মডেলের স্মার্টফোন ও একাধিক মোবাইলের যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
কিন্তু সেগুলো মধ্যে মন্ত্রীর ফোনটি না থাকায় তার ল্যাপটপ সার্চ করার পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখান থেকে বেরিয়ে পঞ্চম ব্যক্তির নাম।
পুলিশ জানায়, "ল্যাপটপ সার্চ করার পর মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রীর ছিনতাই হওয়ার মোবাইলটির একটা ছবি ও তথ্য পাওয়া যায়। পরে সেটা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি এবং তার কাছে জানতে চাই এটা কোথায় আছে। পরে সে আমাদের একটা ঠিকানা দেয়।"
ওই ঠিকানা থেকে অভিযুক্ত পঞ্চম ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে তার কাছ থেকেই মন্ত্রীর ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই ব্যক্তি মন্ত্রীর আইফোনটি আনলক করার পর সেখানে মন্ত্রীর ছবি দেখতে পেয়ে ফোনটি পুনরায় বিক্রি না করে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন।
এখন ফোন হাতে পাননি মন্ত্রী
তবে পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ. মান্নান এখনও তার ফোনটি হাতে পাননি।
ফোনটি পুলিশের হেফাজতেই আছে। ফোন ছিনতাইয়ের বিষয়ে সাধারণ ডায়রি হওয়ায় আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষেই সেটা তাকে বুঝিয়ে দেয়া হবে।
এ ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে মি. মান্নান বলেন, "পুলিশ আমাকে জানিয়েছে যে আমার ফোনটা তারা পেয়েছে। সেটা এখন তাদের হাতে আছে। কিন্তু আমাকে তারা ফোনটা এখন দিতে পারছি না। এটা যেহেতু আলামত। তাই কোর্টের অনুমোদন নিয়ে আমাকে ফেরত দেয়া হবে। আমি খবর পেয়ে খুব আনন্দিত হয়েছি।"

ছবির উৎস, DMP
তথ্য চুরির আশঙ্কা রয়েছে?
ছিনতাই হওয়া ফোনের তথ্যের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে পরকল্পনামন্ত্রী জানিয়েছেন, তার ফোনে ব্যক্তিগত কিছু তথ্য থাকলেও সেখানে রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল কোন তথ্য অথবা তার কাজ ও দায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোন তথ্য ছিল না।
ওই ধরণের সংবেদনশীল তথ্যের অংশীদারও তিনি নন বলে জানান।
তাই তার এই ফোন চুরির মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য বেহাত হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে মন্ত্রী মনে করছেন।
তবে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কোন তথ্য চুরি বা তার তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে পুলিশ অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, "আমার ফোনে রাষ্ট্রীয় ক্লাসিফাইড কোন তথ্য ছিল না। আর আমার যেসব ব্যক্তিগত তথ্য ছিল সেগুলো এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ নয় যেটা হারিয়ে গেলে আমার ক্ষতি হবে। আমি ফেসবুক এতোটা চালাই না। এটা আমার সহকারীরা দেখেন। ছিনতাই হওয়ার পর গত দেড় মাসে কোন সমস্যা তাই আমি খুব একটা আতঙ্কিত নই।"
তবে পুলিশের আইনগতভাবে সামনে যা করণীয় তারা যেন সেটি অব্যাহত রাখেন, সেই প্রত্যাশা করেছেন মন্ত্রী।
এ ব্যাপারে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ.কে.এম. হাফিজ আক্তার বলেন, "সাইবার জগতে কোন ক্রাইম মোবাইলের মাধ্যমে হয়। তথ্য টুইস্ট করা হয়। যেহেতু মন্ত্রী মহাদয়ের ফোন, একটা ভিআইপি মোবাইল আমরা আগে এটা তাকে ফেরত দেবো। তিনি যদি মনে করেন কোন ব্যবস্থা নিতে হবে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ করবো।"
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
কিভাবে ছিনতাই হয়েছিল মন্ত্রীর ফোন
গত ৩০শে মে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে অফিস থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী মি. মান্নান।
পথে বিজয় সারণি মোড়ে সিগনালে থাকার সময় মন্ত্রী তার ব্যবহৃত গাড়িটির এসি বন্ধ করে জানালার কাঁচ নামিয়ে, কাঁচের ওপর কনুই রেখে ফোনে খবর পড়ছিলেন।
তিনি গাড়ির পেছনের সিটে বাম পাশে একা বসেছিলেন। সামনে চালকের পাশে সিটে ছিল তার সুরক্ষায় নিয়োজিত পুলিশের গানম্যান।
হঠাৎ এক মুহূর্তে তার হাত থেকে ফোনটি কেউ ছিনিয়ে নেয়। মন্ত্রী জানান পুরো বিষয়টি বুঝে উঠতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে যায়।
সামনে বসে থাকা গাড়ির চালক, গানম্যানও কেউ কিছু টের পাননি।
মি. মান্নান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। আমি পেছনের সিটে বসা ছিলাম, আমার হাতে মোবাইল ছিল। আমি মোবাইলে কিছু একটা করছিলাম। হয়তো নিউজ পড়ছিলাম।"
"হঠাৎ করে এক ঝলকে অবিশ্বাস্য রকম গতিতে ঝড়ের মতো এসে হাত থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে চলে গেল। আমি দেখিনি লোকটাকে।"
পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মন্ত্রী গানম্যানকে মোবাইল ছিনতাইয়ের কথা বললে। ওই গানম্যান অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারীর পেছনে ধাওয়া করে। কিন্তু কাউকে ধরা যায়নি।
পরে পহেলা জুন ছিনতাইয়ের ঘটনায় কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়রি করা হয়।
সেই জিডির ৫০ দিন পর আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।








