পেগাসাস ফোন হ্যাকিং: ইসরায়েলি প্রযুক্তি দিয়ে বিশ্ব জুড়ে রাজনীতিক, সাংবাদিক, আইনজীবীদের ওপর গোপন নজরদারি

ইসরায়েলের হার্জলিয়ায় এনএসও গ্রুপের অফিসের সামনে ফোন হাতে এক নারী।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলের হার্জলিয়ায় এনএসও গ্রুপের অফিসের সামনে ফোন হাতে এক নারী।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার কর্মী, রাজনীতিক, সাংবাদিক এবং আইনজীবীদের ফোনের ওপর গোপনে নজরদারি করতে ইসরায়েলের একটি প্রতিষ্ঠান সরকারগুলোর কাছে একটি ফোন স্পাইওয়্যার বিক্রি করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যাচ্ছে।

ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপের এই স্পাইওয়্যার কিনেছে যেসব ক্রেতা তারা ৫০ হাজার ফোনের ওপর গোপনে নজরদারী চালিয়েছে বলে খবরে বলা হচ্ছে।

এই তালিকা এবং এর ওপর তদন্তের প্রতিবেদনটি সারা বিশ্বের কিছু প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

লন্ডনের দ্যা গার্ডিয়ানসহ ১৬টি সংবাদমাধ্যম একযোগে এই তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করেছে।

তবে মোট কয়টি দেশে কতগুলো ফোন হ্যাক করা হয়েছে তা এখনও পরিষ্কার নয়।

আরও পড়তে পারেন:

আইওএস কিংবা অ্যান্ড্রয়েড - কোন ফোনই পেগাসাসের হাত ফসকে যেতে পারে না। ছবিতে ইসরায়েলে এনএসও গ্রুপের সদর দফতর।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আইওএস কিংবা অ্যান্ড্রয়েড - কোন ফোনই পেগাসাসের হাত থেকে নিস্তার পায় না।

ম্যালওয়্যারটি বিক্রি করেছে যে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান সেটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তারা বলছে, মানবাধিকার রেকর্ড ভাল এমন দেশের সামরিক বাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা বিভাগের কাছে তারা এই সফটওয়্যার বিক্রি করেছে।

পেগাসাস নামে এই স্পাইওয়্যারটি সম্পর্কে ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্যা গার্ডিয়ান, ল্য মোঁদ এবং আরও ১৪টি সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে।

ভারতের নিউজ পোর্টাল দ্য ওয়্যার এই হ্যাকিংয়ের তালিকায় সে দেশের অন্তত ৩০০ রাজনীতিক, সাংবাদিক, অধিকার কর্মী, বিজ্ঞানীর নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে।

তালিকায় এই পোর্টালের দু'জন প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিকের নামও রয়েছে বলে দ্য ওয়্যার জানাচ্ছে।

কাদের লক্ষ্য করে এই হ্যাকিং

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগজির হত্যার কিছুদিনের মধ্যে তার বাগদত্তা হাতিশ চেংগিজ ফোনও পেগাসাস দিয়ে হ্যাক করা হয়।

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগজির হত্যার কিছুদিনের মধ্যে তার বাগদত্তা হাতিশ চেংগিজের ফোনও পেগাসাস দিয়ে হ্যাক করা হয়।

পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই তদন্তের সাথে জড়িত সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বিশ্বের ৫০টি দেশে অন্তত ১০০০ জনের নাম তারা জানতে পেরেছে।

এদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, অধিকার কর্মী এবং আরব দেশের বেশ রাজপরিবারের কয়েকজন সদস্য।

সিএনএন, আল জাজিরা এবং নিউইয়র্ক টাইমসসহ ১৮০ জনেরও বেশি সাংবাদিকের নাম এই তালিকায় রয়েছে।

এই অবৈধ নজরদারির ঘটনা বেশিরভাগ ঘটেছে মূলত ১০টি দেশে: ভারত, আজারবাইজান, বাহরাইন, হাংগেরি, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, রোয়ান্ডা, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

তদন্তের অংশ হিসেবে যখন এসব দেশের সাথে যোগাযোগ করা হয় তখন তাদের মুখপাত্ররা পেগাসাস ব্যবহার এবং অবৈধভাবে নজরদারি চালানোর কথা অস্বীকার করেন।

পেগাসাস ব্যবহার করে কোন্ কোন্ দেশে কাদের ফোন হ্যাক করা হয়েছে তার বিস্তারিত তালিকা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে বলে জানা যাচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

পেগাসাস স্পাইওয়্যার কী ও এটা কীভাবে কাজ করে?

ব্রিটিশ দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ান বলছে, পেগাসাস সম্ভবত কোন বেসরকারি কোম্পানির তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী স্পাইওয়্যার।

আইওএস বা অ্যান্ড্রয়েড-চালিত ফোনের ওপর গোপনে নজরদারি চালানোর ক্ষমতা এই ম্যালওয়্যারটির রয়েছে।

দ্যা গার্ডিয়ান-এর এক বিস্তারিত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, পেগাসাস যদি কোনভাবে একবার আপনার ফোনের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে, তাহলে আপনার অজান্তে ম্যালওয়্যারটি আপনার ফোনকে ২৪ ঘণ্টার এক নজরদারির যন্ত্রে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে।

আপনার ফোন থেকে আপনি যত মেসেজ বা ছবি পাঠান, কিংবা রিসিভ করুন, পেগাসাস তা কপি করে গোপনে পাচার করে। পাঠিয়ে দেয় নির্দিষ্ট জায়গায়।

এই স্পাইওয়্যারটি আপনার অগোচরে ফোনের কথাবার্তা রেকর্ড করতে পারে, এমনকি ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে গোপনে আপনার ভিডিও রেকর্ড করতে পারে।

আপনি কোথায় আছেন, কোথায় গিয়েছিলেন, অথবা কার কার সাথে দেখা করেছেন, পেগাসাস সে সম্পর্কেও জানতে পারে বলে মনে করা হয়।

দ্যা গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, ২০১৬ সালে গবেষকরা পেগাসাসের সবচেয়ে প্রথম ভার্সনটির কথা জানতে পারেন।

সে সময় কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফোনে টেক্সট মেসেজ বা ইমেইলে পাঠানো হতো, যাতে থাকতো একটি লিংক।

সেই লিংকে ক্লিক করলেই পেগাসাস ফোনের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নিতো।

অবশ্য এরপর এনএসও গ্রুপ এই স্পাইওয়্যারের ক্ষমতাকে আরও বহুগুণ শক্তিশালী করেছে।