আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
করোনা ভাইরাস টিকা সংকট: কেনার সময় কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েছিল সরকার?
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
সাতাশে জানুয়ারি ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাসের টিকা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
"পর্যায়ক্রমে দেশের সবাই টিকা পাবে" - প্রথম টিকা গ্রহীতা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
"এরপর আমরা সারা বাংলাদেশেই দেবো ভ্যাকসিনটা - যাতে আমাদের দেশের মানুষ তাড়াতাড়ি স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে পারে সে ব্যবস্থা আমরা করবো। বিশ্বের অনেক দেশ এখনো শুরুই করতে পারেনি। সেখানে আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশ সীমিত অর্থনৈতিক শক্তি নিয়েই আমরা কিন্তু মানুষের কল্যাণে যে কাজ করি তাই প্রমাণ হলো" - বলেছিলেন শেখ হাসিনা।
বেসরকারি কোম্পানি বেক্সিমকোর মাধ্যমে সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি টিকা কেনার চুক্তি করেছিল সরকার।
গত নভেম্বরে সম্পাদিত ওই চুক্তি অনুযায়ী সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে বাংলাদেশে প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা আসার কথা ছিল। এরপর জানুয়ারি মাসেই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে প্রায় এক হাজার তিনশ কোটি টাকায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উৎপাদিত তিন কোটি ডোজ টিকা সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে কেনার অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটি।
তবে কমিটির ওই বৈঠকে টিকা নিয়ে কোন সংকট হতে পারে কিনা, বা সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা পেতে সংকট হলে কিভাবে বাংলাদেশ টিকা পাবে - এসব প্রশ্ন নিয়ে তেমন কোন কথাবার্তা হয়নি।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটির সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলছেন, টিকার ক্ষেত্রে বিকল্প আর কোন উৎস তখনো সরকারের হাতে ছিলোনা বলেই এসব বিষয় তারা তখন বিবেচনায় নেননি।
"কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রথমত প্রশ্ন ছিলো মান নিয়ে। কিন্তু যেহেতু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং সিরাম যারা বিশ্বের বৃহৎ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী হিসেবে যাদের সুনাম আছে। এছাড়া আমাদের নিকটতম দেশ। পরিবহনসহ সব ব্যাপারে সহজ ছিলো। সব মিলিয়ে এটা ছিলো ভালো ক্রয়। সেভাবেই সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। ভারতে যে এমন ভয়াবহ অবস্থা হবে কে জানতো তা?"
তবে পরিকল্পনামন্ত্রীসহ ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত একাধিক কর্মকর্তারা বলছেন, আসলে ভারত থেকে ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে দু-দেশের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্কের কারণে - বিশেষ করে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যকার যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে - তখন ধারণাই করা হয়েছিলো যে সংকট এলেও তা সহজেই সমাধান হয়ে যাবে।
মি. মান্নান বলছেন, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দু-দেশের মধ্যকার সম্পর্কও বিবেচনায় ছিলো এবং তারা এখনও মনে করেন চলমান সংকটের অবসান হবে শিগগিরই।
"তাদের সরকারপ্রধান ও সরকার থেকে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন দেয়া নিয়ে তাদের অঙ্গীকার তারা রক্ষা করবে। একবার রপ্তানি বন্ধের কথা বলা হয়েছিলো যা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিলো। এরপর তাদের পররাষ্ট্রসচিব আসলেন। অন্যরাও বললেন যে বাংলাদেশকে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিলো সেটি রক্ষা করা হবে।"
"আমার ধারণা সেখানেই আছে বিষয়টি। আমার ধারণা, উভয় সরকার আলোচনা করে এটা উভয়ের মঙ্গলের জন্য এটার সমাধান করবে। কারণ বন্ধুত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ"।
কিন্তু বাস্তবতা হলো চুক্তির পর সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে দু'টি চালানে এ পর্যন্ত মাত্র ৭০ লাখ ডোজ টিকা বাংলাদেশ পেয়েছে গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে।
এরপর থেকে ৩২ লাখ ডোজ উপহার হিসেবে এলেও চুক্তি অনুযায়ী আর কোন টিকা পায়নি বাংলাদেশ।
'টিকাদান কর্মসূচি ঝিমিয়ে পড়ছে'
ফলে জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক শুরুর পর সাতই ফেব্রুয়ারি থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচি এখন স্তিমিত হয়ে আসছে পর্যাপ্ত টিকা না থাকার কারণে।
আবার প্রথম ডোজ যাদের দেয়া হয়েছে তাদের সবাই এখন দ্বিতীয় ডোজ পাবেন কি-না তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এর ফলে প্রথম ডোজ নিয়ে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় থাকা বহু মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। তেমনি একজন বরিশালের মনিকা সরকার।
"সদর হাসপাতাল থেকে করোনার প্রথম ডোজ নিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ। এখন তো করোনার অবস্থা খারাপ। দ্বিতীয় ডোজ নিতে পারবো এমন কোন সম্ভাবনা আছে কিনা আমি জানিনা। অনিশ্চয়তার মধ্যেই আছি। মনে হয় পাবো, কিন্তু ভরসা কোথায়?"
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছিলো যে দেশে এ পর্যন্ত এমন প্রথম ডোজ নেয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৫৭ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮৬ জন। এর মধ্যে মাত্র ১৯ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭৮ জন দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েছেন।
অন্যদিকে টিকা নেয়ার জন্য এ পর্যন্ত মোট নিবন্ধন করেছেন ৭১ লাখ ৮৪ হাজার ৪০৬ জন। কিন্তু টিকার সংকট তৈরি হওয়ায় প্রথম ডোজের টিকাদানের সংখ্যা কমিয়ে এনেছে কর্তৃপক্ষ।
ফলে প্রথম ডোজের টিকা সহসা পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েও অনেকের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এমনই একজন ঢাকার শ্যামলী বেগম, যার পরিবারের একজন সদস্য ইতোমধ্যেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
"চলতি মাসের ১২ তারিখে রেজিস্ট্রেশন করেছি। কিন্তু টিকা দেয়ার জন্য কোন তারিখ আমি এখনো পাইনি। আশা করি যেন খুব সহজে তারিখটা পেয়ে যাই যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে টিকা দিতে পারি"।
টিকা রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে ভারত
কিন্তু শ্যামলী বেগমের এমন আশা কতটা পূরণ হবে তা বলা কঠিন। কারণ সিরাম থেকে যে বেসরকারি কোম্পানি টিকা এনে বাংলাদেশ সরকারকে দেয়ার কথা - তারাই এখন ভারত সরকারের সাথে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করছে।
কারণ ভারতের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে টিকা রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে দেশটির সরকার।
দেশটির ১৮ বছরের বেশি প্রায় একশ কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার জন্য তারা বরং অন্য দেশ থেকেও টিকা আমদানির চিন্তা করছে । এমন পরিস্থিতিতে সিরাম ইন্সটিটিউট আগামী মাসেও কোন টিকা দিতে পারবে কিনা - তা নিয়ে কোন নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে ভারত থেকে টিকা পাওয়ার চুক্তি হয়ে যাওয়ার কারণে অন্য কোন দিকে দৃষ্টি দেয়নি বাংলাদেশ।
এমনকি চীনা টিকার ট্রায়াল নিয়ে যে প্রস্তাব এসেছিলো - সেটি প্রথমে সম্মত হয়েও পরে পিছিয়ে এসেছিলো বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোসহ ধনী দেশগুলো প্রায় সব টিকাই অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে বৈশ্বিক উদ্যোগ অর্থাৎ কোভ্যাক্স থেকে টিকা আসার কথা থাকলেও সেটি কবে আসবে তা চূড়ান্ত হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাওসার আফসানা বলছেন, চুক্তি করার সময় বিকল্প কম থাকলেও ক্রয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়ার সময় এগুলোর সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জন্য এখন এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা সহজ হতো।
"বাংলাদেশ তখন শুধুমাত্র অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু শুধু এটার ওপর নির্ভর না করে আরও যেসব যেমন রাশিয়া বা চীন আছে - কিন্তু এটিও সত্যি যে রাশিয়া ও চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পায়নি। কিন্তু মাঝে মধ্যে বাংলাদেশে যেহেতু শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। আমার মনে হয় তেমন বোল্ড ডিসিশন এখানে নিলে দেশের জন্য ভালো হতো"।
একটিমাত্র উৎস থেকে টিকা কেনা কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল?
তিনি বলছেন, সিরাম বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের দেশে। তারপরেও ক্রয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার সময় একটি মাত্র কোম্পানিকে সুযোগ দিয়ে একটি মাত্র উৎস থেকে আমদানির পরিকল্পনা কতখানি যুক্তিসংগত হয়েছে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। কি প্রক্রিয়ায় কেন এমন সিদ্ধান্ত হলো - তা নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে নানা দিক থেকে।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলছেন ভ্যাকসিন নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে এটা ছিলো অনুমেয় এবং সে কারণেই ক্রয় পরিকল্পনায় সতর্ক থাকার দরকার ছিলো।
"এক ধরণের ভ্যাকসিন ন্যাশনালিজম কিন্তু শুরু হয়েছে। ফলে যেসব দেশ তৈরি করতে পারছেনা তাদের কাছে এটা যাওয়া দু:সাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
চীন ও রাশিয়ার টিকা নিয়ে ভাবনাচিন্তা?
"শুধুমাত্র কোন একটি কোম্পানি বা একজন আমদানিকারককে অনুমতি না দিয়ে ব্যক্তি খাতের অনেককে অনুমতি দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি অন্য দেশের ভ্যাকসিনগুলো কিভাবে পাওয়া যাবে সেটিও দেখা উচিত"।
তবে ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলছেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই তখন শুধু মাত্র ভারত থেকে ভ্যাকসিন কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
"চিকিৎসকের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি আছে,তারাই বলেছিলো যে বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুমোদন দেয়নি সেটা গ্রহণ করা ঠিক হবে না। একমাত্র আমেরিকানটা ছিলো - কিন্তু সেটা সংরক্ষণের সক্ষমতা আমাদের নেই। সেজন্য আমরা সেটা উপেক্ষা করেছি। সেগুলো আমরা ম্যানেজ করতে পারবো আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দিলে আমরা আনবো।"
"কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে সেটার পরিবর্তন করতে হবে" - বলছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কর্মকর্তারা বলছেন, খুব শিগগিরই চীন থেকে ভ্যাকসিন আনা এবং রাশিয়ার সহায়তা নিজেরাই টিকা তৈরির কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কয়েকটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি নিজেরাও ভ্যাকসিন আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আর চলমান সংকটের জরুরি সমাধানে টিকা রপ্তানির ওপর ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য কিছুটা শিথিল করা যায় কিনা - তা নিয়েও জোর তৎপরতা চলছে।