আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রাজশাহীতে বিএনপি-জামায়াতের লড়াইয়ে ফ্যাক্টর আওয়ামী লীগের ভোটার
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, রাজশাহী
নির্বাচন কমিশনের নতুন আইনের কারণে পথে পথে পোস্টার-ব্যানার নেই, নেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রচার-প্রচারণা। তবুও ভোট নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই বিভাগীয় জেলা রাজশাহীতে।
জেলার ছয়টি আসনের অন্তত তিনটিতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে ভোটার ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে।
২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত বিএনপির ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ছিল রাজশাহী জেলা।
তবে ভোটারদের কেউ কেউ বলছিলেন, মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির কোন্দলের কারণে এবারের নির্বাচনে এই জেলায় জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির নির্বাচনী লড়াইটা জমে উঠতে পারে।
বিএনপি অবশ্য মনে করছে, দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান থাকার কারণে এই জেলায় হালেই পানি পাবে না অন্য কোনো দল।
বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন দাবি করেন, বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে মনোনয়ন নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও সেটি ভোটের ফলাফলে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না।
ঠিক উল্টো বক্তব্য দিচ্ছে জামায়াত। জরিপ ফলাফলের তথ্য জানিয়ে দলটির দাবি, অন্তত চারটি আসনে বিএনপির চেয়ে এগিয়ে আছে তারা।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল বলছিলেন, শক্ত অবস্থান থাকলেও বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতিবাচক অবস্থানই জামায়াতকে নির্বাচনের মাঠে বাড়তি সুবিধা দেবে।
বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিললেও এই জেলার বিভিন্ন আসনে ভোটে লড়ছে জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, বাসদ, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে জয় পরাজয়ে এবার বড় ভূমিকা রাখতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার।
বিবিসি বাংলা এই এলাকার যে ভোটারদের সাথে কথা বলেছে, বয়সে তরুণ থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সী মানুষদের বেশিরভাগই এক বাক্যে বলেছেন, কর্মসংস্থানের অভাবে রাজশাহী এখন একটি শিক্ষিত বেকারদের নগরী।
নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশার বাইরে ভোটের সময়ের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা বলছিলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কেউ কেউ।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
আগের নির্বাচনগুলোর ফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০১ সালে রাজশাহীর সবগুলো আসন ছিল বিএনপির দখলে। এর পরে তারা আর কোনো আসন পায়নি সেখানে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে আওয়ামী লীগ ও একটিতে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি জয়ী হয়।
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি ও জামায়াত। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে রাজশাহীর আসনগুলো আওয়ামী লীগ তাদের দখলে ছিল।
চব্বিশের গণ-আন্দোলনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো রাজশাহীর আওয়ামী লীগ নেতারা এলাকাছাড়া হয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগের ভোটাররা অন্য দলগুলোর জন্য এবার বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
এর বাইরে তরুণ ভোটাররা, বিশেষ করে যারা প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, তারাও জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন।
যে সমস্যার কথা বলছেন তরুণরা
বুধবার বিকেলে রাজশাহী শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট পদ্মা নদীর পাড়। এখানে প্রতিদিন বিকেলে হাজারো মানুষ ঘুরতে আসেন।
রাজশাহীর শহর থেকে যেমন অনেকেই আসেন, তেমনি আশপাশের উপজেলাগুলো থেকেও আসেন অনেকেই। এসব দর্শনার্থীদের অনেকেই বয়সে তরুণ তরুণী।
আমরা সেখানে পৌঁছাতেই আলাপ হয় এক ঝাঁক তরুণের সাথে। তাদের সবাই যেন বলছিলেন রাজশাহী জেলাটি যেন এক শিক্ষিত বেকারের নগরী।
"এখানে শিক্ষা আছে, শিক্ষিত মানুষ আছে, কিন্তু তাদের কোনো চাকরি নাই। তাহলে এই শিক্ষা দিয়ে লাভ কী", বলছিলেন ২৮ বছরের ইমতিয়াজ হোসেন।
তিনি অবশ্য একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কিন্তু তার সাথে যে বন্ধুরা এসেছিলেন তাদের অনেকেই পড়াশোনা শেষ করেও বসে আছেন কর্মহীন।
উচ্চা শিক্ষা নিয়েও কেন বেকার হয়ে ঘুরছেন অনেকে? এই প্রশ্নে পাশে থাকা মমিনুল হাসান বলছিলেন, "এত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু আপনি পড়াশোনা শেষ করে যে চাকরি নেবেন, কোথায় চাকরি করবেন?"
অর্থাৎ তাদের ভাষায়, শিক্ষা নগরীর খ্যাতি পাওয়ার এই শহরে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা শেষ করে তারা যে চাকরি করবেন, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম।
এই দলে এমন একজন তরুণও ছিলেন যিনি পড়াশুনা শেষে চাকরি পাননি। পরে নিজেই মোবাইল-ক্যামেরা নিয়েই শুরু করেছেন কন্টেন্ট বানানোর কাছ। তাতেও যে তার খুব একটা আয় হচ্ছে বিষয়টি তেমন নয়।
তার ভাষায়, চাকরি নাই তাই বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করে সেগুলোই ফেসবুক-ইউটিউবে আপলোড করছেন, এলাকায় তার পরিচিতিও আছে। কিন্তু এটি দিয়ে যা আয় হয়, তাকে কোনোভাবেই রোজগার বলা যায় না।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় নানা বয়সের নারী পুরুষদের সাথেও কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। সেখানে অনেকেই বলছিলেন, এখানে আগে জুট মিল ছিল, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল; যার অনেক কিছুই নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে, কর্মসংস্থানের পথও সংকুচিত হয়ে গেছে।
গৃহিনী সাহেরা বেগম বলছিলেন, "শিক্ষিত ছেলেপেলেরা, অটো চালাচ্ছে, নৌকা চালাচ্ছে, চটপটির দোকান দিচ্ছে। আর যারা এগুলো পারছে না তাদের কেউ কেউ মাদকে ঝুঁকছে, কেউ চাঁদাবাজি করছে"।
আসছে নির্বাচনে তারা চান, এমন একটা সরকার আসুক যারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই সমস্যা সমাধানের পথ দেখাবে।
নির্বাচনে বিএনপির বাধা 'অভ্যন্তরীণ কোন্দল'
১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর ছয়টি আসনেই বিএনপির দাপুটে অবস্থান ছিল। অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোতেও তুলনামূলক ভালো ফল করেছে বিএনপি। তবে ২০০৮ সালের পর সেখানে তাদের কোনো আসন ছিল না।
২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশই নেয়নি। আঠারোর নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ।
আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার পুরোনো ঘাঁট ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বিএনপির জন্য। তবে নির্বাচনের আগেই দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা গেছে।
যেমন তানোর গোদাগাড়ি নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা শরিফ উদ্দিনকে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পরই এই এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে।
ওই আসনে গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সদস্য সুলতানুল ইসলাম তারেক স্বতন্ত্র প্রার্থীও হয়েছিলেন।
রাজশাহী-২ আসনে দলের চেয়ারম্যানের আরেক উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু প্রার্থী হয়েছেন। এখানেও বিএনপির আছে শক্তিশালী তিনটি বলয়। এবং তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও রয়েছে। তবে, তার মনোনয়ন এখানে তেমন কোনো বিদ্রোহ দেখা যায়নি।
পবা ও মোহনপুর নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৩ বিএনপির শফিকুল হক মিলন মনোনয়ন পেয়েছেন। তার মনোনয়ন বিরোধীতা করে অন্তত দলের দুইটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
বাঘমারা উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-৪ আসনেও প্রার্থীতা ঘোষণার পর দলের অভ্যন্তরে বিরোধ দেখা গেছে।
রাজশাহী-৫ আসনে নজরুল ইসলামকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পর এলাকায় বিক্ষোভ ও মশালমিছিলও হয়। অনেকে আবার স্বতন্ত্রভাবেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
একদিকে অন্ত:কোন্দল অন্যদিকে নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছুটা চাপ রয়েছে বিএনপি প্রার্থীদের।
তবে, বিএনপি মনে করছে রাজশাহীর আসনগুলোয় তাদের রাজনৈতিক শক্তিই আগামী নির্বাচনে জয়ের বন্দরে নিয়ে যাবে।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমার মনে হয় মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় দলের যারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে চায়, তারা তাদের প্রার্থিতা তা প্রত্যাহার করে নেবে"।
সুযোগ কাজে লাগাতে চায় জামায়াত
রাজশাহীর আসনগুলোতে গত নভেম্বরে বিএনপি তাদের প্রার্থীতা চূড়ান্ত করলেও জামায়াতে ইসলামী আরো কয়েকমাস আগেই প্রার্থীদের মাঠে নামিয়েছে। আগেই নির্বাচন কেন্দ্রিক বেশ কিছু কমিটিও গঠন করেছে দলটি।
অতীত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসন থেকে জামায়াতের বর্তমান নায়েবে আমীর মজিবুর রহমান বিজয়ী হলেও পরবর্তীতে আর কোনো নির্বাচনে অন্য আসনগুলো থেকে জয় পায়নি দলটির প্রার্থীরা।
যে কারণে এবার গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত রাজশাহীর আসনগুলোয় জয় পেতে মরিয়া।
জামায়াতের নেতাদের কেউ কেউ বলছিলেন, বিএনপির মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, বিদ্রোহী প্রার্থী ও দলীয় কোন্দলের কারণে ভোটের মাঠেও তারা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
এক সময় বিএনপির দূর্গ হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের কর্মী সমর্থকের সংখ্যাও বেড়েছে বলে দাবি করছেন জামায়াতের নেতারা।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা যে জরিপ করেছি, তাতে আমরা দেখতে পেয়েছি ছয়টি আসনের মধ্যে অন্তত চারটি আসনে আমাদের প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছে। বাকি যে দুইটি আসন রয়েছে সেখানে প্রতিযোগিতা হবে"।
জামায়াত মনে করছে, এখানে যদি নির্বাচনে কোনো ধরনের কারসাজি না হয়, তাহলে জামায়াত এবার নতুন চমক দেখাবে।
মি. মন্ডল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখানে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হওয়ার শঙ্কা দেখছি আমরা। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, সরকারের একটা বড় পার্ট (অংশ) একটা দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য চেষ্টা করছে এটা দৃশ্যমান"।
এবার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, ভোটের পরিবেশ শেষ পর্যন্ত কতটা শঙ্কাযুক্ত থাকবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে নাগরিক সমাজেরও। কেননা, ভোটের আগেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় হানাহানি, রক্তপাত শঙ্কা বাড়াচ্ছে এই জনপদেও।