করোনাভাইরাস: কর্মীদের বেতন কাটছে প্রতিষ্ঠান, কারখানা লে-অফ

    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের লক্ষ্যে কার্যত লকডাউন চলাকালেই কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন কাটছে কিংবা অর্ধেক বেতন দিচ্ছে, এমনকি বেতন দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানাসহ অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে লে-অফ বা সাময়িক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে।

যদিও সরকার এর আগে কর্মীদের বেতন না কাটা এবং কর্মী ছাটাই না করার নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে সরকারকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

পোশাক কারখানায় লে-অফ

গত ১৪ বছর ধরে একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় মার্চেন্ডাইজ বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন মোহাম্মদ শাফায়েত হোসেন। এটি তার আসল নাম নয়, ছদ্ম নাম।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে একদিন প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ এবং মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ডেকে বৈঠক করে কারখানার মালিক জানিয়ে দেন, তিনি কোম্পানি লে-অফ করছেন।

কোন কর্মীকে ছাটাই এর ঘোষণা দেয়া হয়নি। শ্রমিকসহ সব কর্মীকে মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন দেয়া হয়েছে।

মালিক জানিয়েছেন, সময় ভালো হলে তিনি আবার কারখানা চালু করবেন, তখন সবাইকে চিঠি দিয়ে ডাকা হবে।

এরপর হঠাৎ করে কার্যত বেকার হয়ে পড়েছেন মি. হোসেনসহ প্রায় ১৪০০ কর্মী।

"আপনি ভাবুন অবস্থাটা, আমি সংসারের প্রধান উপার্জনকারী মানুষ। বাসা ভাড়া আছে, সংসার খরচ আছে, অসুস্থ মায়ের নিয়মিত চিকিৎসার খরচ চালাতে হয় আমাকে। সেই সঙ্গে আমার ব্যাংক লোন আছে, তার কিস্তি দিতে হয়। আমি জানি না এখন কিভাবে কী করবো!"

মি. হোসেনের এই পোশাক কারখানাটি ডেনমার্কসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে পোশাক রপ্তানি করত।

শুধু লে-অফ নয় পোশাক কারখানাসহ সেবা খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানে এখন কর্মীদের বিশেষ করে প্রবীণ কর্মীদের ফোর্সড লিভ বা অবৈতনিক বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার দাবি করেছেন সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া এবং ময়মসসিংহে প্রায় শতাধিক কারখানায় লে-অফ করে দেয়া হয়েছে।

কমে গেছে বেতন

ঢাকার একটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করেন সাবিহা সুলতানা, এটিও তার আসল নাম নয়।

কর্মস্থলে হয়রানির শঙ্কায় নিজের নামটি গোপন রাখতে চান তিনি।

তিনি জানিয়েছেন, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকেই তাদের প্রতিষ্ঠানসহ পর্যটন খাতে ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং, এবং ভিসা প্রসেসিং এর চাহিদা মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে।

যে কারণে কিছু কিছু এজেন্সি কাজ স্থগিত রেখেছে।

কিন্তু মিজ সুলতানার প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসার পরিস্থিতি কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানিয়েছে, এপ্রিল মাস থেকে কর্মীদের বেতন কমিয়ে দেয়া হবে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ পর্যায়ের কর্মীদের বেতন ২০ শতাংশ কমে যাচ্ছে, আর ম্যানেজার এবং সিনিয়র ম্যানেজারদের বেতন ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হবে।

তবে ওই কোম্পানিতে কর্মরত সাপোর্ট স্টাফদের বেতন কমানো হচ্ছে না।

চাকরি আছে, কিন্তু বেতন বন্ধ

ঢাকার একটি বিউটি পার্লারে কাজ করেন লাচিন সাংমা। সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটির দিন থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত তাদের পার্লারটি বন্ধ।

মার্চ মাসের ২৫ তারিখে ঐ মাসের অর্ধেক বেতন দেয়া হয়েছে তাদের।

তবে পার্লার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যতদিন পার্লার বন্ধ থাকবে ততদিন কর্মীদের বেতন দেয়া যাবে না।

লাচিনের মত হঠাৎ বেকার হয়ে পড়েছেন তার পার্লারের আরো ৪৫ জন কর্মী। লাচিনের টাকায় ঢাকায় তিনি ও তার বোন এবং নেত্রকোনায় তার মা-বাবার সংসার চলে।

এদিকে, লাচিন যে পার্লারে কাজ করেন, তার মালিক হুমায়রা সুলতানা স্বীকার করেছেন মার্চ মাসে কর্মীদের অর্ধেক বেতন দেয়া হয়েছে।

কিন্তু মিজ সাংমা তার প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করতে চাননি।

আরো পড়তে পারেন:

তিনি বিবিসিকে বলেছেন, "পার্লার বন্ধ থাকলে তো ইনকাম বন্ধ, বেতন দেব কোথা থেকে বলেন? কর্মীদের বেতন ছাড়াই আমার এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে মাসে ফ্ল্যাটের ভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল, গার্ডের বিল সব মিলে প্রায় ৪০ হাজার টাকার ওপরে খরচ আছে। সেটা জোগাড় করতেই হিমসিম খাচ্ছি আমি।"

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে কেবল কর্মীরাই নয়, তার মত ছোট উদ্যোক্তাদেরও খুবই আশংকার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

"কবে আবার পার্লার চালু করতে পারবো কেউ জানে না। আবার কর্মীদের যারা ফিরে আসবে তাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কী থাকে, ক্লায়েন্টরা তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে স্বস্তি পাবে কিনা---এসব নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে আমারো।"

নিয়োগদাতারা কী বলছেন?

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্তের হার প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

সেই সঙ্গে বাড়ছে সংক্রমণ বন্ধে সরকারের ঘোষিত সাধারণ ছুটির মেয়াদও।

সর্বশেষ ১৪ই এপ্রিল থেকে বাড়িয়ে সাধারণ ছুটির মেয়াদ ২৫শে এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মহাসচিব ফারুক আহমেদ বলেছেন, এ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এমন প্রায় ৫ কোটি মানুষের ওপর।

তবে, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন বাংলাদেশের প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষ যারা দৈনিক হিসেবে মজুরি পান।

তবে তিনি বলেছেন, পুরো পরিস্থিতি বোঝার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

"কারণ এমন পরিস্থিতিতে আমরা আগে কখনো পড়ি নাই, যে কারণে খাত ধরে হিসাব তৈরি এবং পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্যও সময় দরকার।"

অর্থনৈতিক প্রভাব

বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এখন বাংলাদেশে জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকিতেও পরিণত হয়েছে।

"একদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং আরেকদিকে লকডাউনের ফলে কলকারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন।

বিশেষ করে যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন এমন অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতির কারণে দারিদ্র সীমার ঠিক ওপরে যারা আছেন, অর্থাৎ নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, তারাও দারিদ্রসীমার মধ্যে পড়ে যাবেন বর্তমান অবস্থার কারণে।"

তিনি আশংকা করছেন এর ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে।

সিপিডির গবেষণা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ পরিবার ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়বেন এবং তাদের সরাসরি সরকারের অর্থ-সহায়তার প্রয়োজন হবে।