বাংলাদেশে করোনাভাইরাস: কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন নিয়ে যত প্রশ্ন

    • Author, মুন্নী আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর নতুন করে দুটি শব্দ সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে 'কোয়ারেন্টিন'; আর আরেকটি হচ্ছে 'আইসোলেশন'।

এখনো পর্যন্ত ১১৮টি দেশে ভাইরাসটির সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে লাখেরও বেশি মানুষ।

দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ কোয়ারেন্টিনের আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া চীনের হুবেই প্রদেশসহ দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন শহরে জনগোষ্ঠী এমনকি পুরো ইতালিকে কোয়ারেন্টিন বা অবরুদ্ধ করার ঘোষণার খবরও এসেছে।

কোয়ারেন্টিন শব্দটি কীভাবে এলো?

১৪শ শতকে ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথ মহামারি আকার নিলে, ভেনিস কর্তৃপক্ষ একটি নিয়ম জারি করে।

আর তা হলো, বন্দরে কোন জাহাজ ভিড়িয়ে যাত্রীদের নামানোর আগে সেটাকে সমুদ্রে ৪০ দিন নোঙর করে রাখতে হবে।

এই ৪০ সংখ্যাটিকে ইতালির ভাষায় কোয়ারানতা বলা হয়। এই অপেক্ষার সময়টিকে তারা বলতো কোয়ারান-তিনো। সেই থেকে এসেছে কোয়ারেন্টিন।

কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন কী?

এ বিষয়ে নিজস্ব সংজ্ঞার কথা জানাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর। সংস্থাটির একজন সাবেক পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, আপাতভাবে সুস্থ মনে হওয়া মানুষদের জন্য কোয়ারেন্টিন।

তার মতে, যেসব ব্যক্তিকে আপাত দৃষ্টিতে সুস্থ মনে হয়, কিন্তু সে সুস্থ হতে আবার নাও পারে, তার মধ্যে হয়তো জীবাণু আছে কিন্তু তার মধ্যে কোন ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়নি- এমন ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।

অর্থাৎ যারা এখনো অসুস্থ না এবং যাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়নি, তাদেরকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়।

আইসোলেশন হচ্ছে, কারো মধ্যে যখন জীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়বে বা ধরা না পড়লেও তার মধ্যে উপসর্গ থাকবে তখন তাকে আলাদা করে যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে তাকে বলা হয় আইসোলেশন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায়, আইসোলেশন হচ্ছে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য আর কোয়ারেন্টিন হচ্ছে সুস্থ বা আপাত সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য।

অবশ্য সারা পৃথিবীতেই কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে কী না সেটা স্পষ্ট নয়।

কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে কত দিন রাখ হচ্ছে

যে রোগের জন্য কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে রাখা হয় সেই রোগের জীবাণুর সুপ্তকাল কত দিন সেটার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ওই রোগের জন্য মানুষকে কতদিন কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে রাখা হবে।

করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে, এই ভাইরাসটির সুপ্তকাল হচ্ছে ১৪ দিন। অর্থাৎ ১৪ দিন পর্যন্ত কাউকে কোয়ারেন্টিন করে রাখলে যদি তার ভেতরে জীবাণু থাকে তাহলে এই সময়কালের মধ্যে তার উপসর্গ দেখা দেবে।

ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, কোয়ারেন্টিনে রাখা অবস্থায় যদি কারো উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে তাকে আইসোলেশনে নিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু আইসোলেশনে কতদিন রাখা হবে তার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। যত দিন পর্যন্ত তার চিকিৎসা দেয়া হবে ততদিন তাকে আইসোলেশনে রাখতে হবে। অর্থাৎ পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত তাকে আইসোলেশনে রাখতে হবে।

একই সাথে ভাইরাসটি যদি বিভিন্ন মাধ্যমে যেমন হাঁচি, কাশি, থুতু বা মল-মূত্র ত্যাগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে তাহলেও তাকে ওই সময় পর্যন্ত আলাদা করে আইসোলেশনে রাখতে হবে।

কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন কোথায় করা হয়?

মাহমুদুর রহমান বলছেন, আইসোলেশন অবশ্যই হাসপাতালে করতে হবে।

"আইসোলেশন মানে হচ্ছে রোগীকে একাকী রেখে চিকিৎসা দেয়া।"

কিন্তু যেসব রোগ নিজে নিজে সেরে যায়, সেসব রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগীকে বাড়িতে আলাদা থাকতে বলা হয়। শুধু জরুরী স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলা হয়। এটাও এক ধরণের আইসোলেশন।

"তবে এসময়ও অন্যদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে," বলেন তিনি।

কোয়ারেন্টিন অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। রোগটির গুরুত্ব, আক্রান্তের ধাপ, পরিস্থিতি, অবস্থান, সক্ষমতা অনুযায়ী কোয়ারেন্টিন কোথায় করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

যেমন, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে, কেউ যদি চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে আসে তাহলে তাকে আলাদা করে সরিয়ে নিয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টিন করা হয়। যাকে বলা হয় নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিন। যেমনটা আশকোনার হজ ক্যাম্পে করা হয়েছিল।

স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিন সেসব জায়গাতে করা হয় যেখানে সংক্রমণ তেমন নেই। সেখানে বাসিন্দাদের নির্দিষ্ট সময় ঘরে থাকতে বলা হয় এবং এই সময়ের মধ্যে কোন উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসক বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, "তবে এক্ষেত্রেও যারা বিদেশ থেকে আসে তাদের ফোন নম্বর রেখে খোঁজ নেয়া হয় যে তারা কোয়ারেন্টিন করছে কিনা"।

যেকোনো রোগের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে তা ঠেকাতে হলে প্রথম একশ বা দুশো জনকে খুব কড়াকড়ি ভাবে নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে এবং যদি তারা অসুস্থ হয় তাহলে তাকে আইসোলেশনে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।

তার সাথে ওই রোগীর সংস্পর্শে যারা এসেছে অর্থাৎ তার চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরুর পরে কিংবা তার মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়ার সময় যারা তার আশেপাশে ছিল তাদের একটা তালিকা তৈরি করতে হয়।

এই তালিকায় থাকা মানুষদেরও আবার কোয়ারেন্টিন কিংবা আইসোলেশনে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।

এ ধরণের পরিস্থিতি ভালভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হলে একটি দেশের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে কী ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা আবার সময় ও আক্রান্তের সংখ্যার সাথে পরিবর্তিত হবে।

আইসোলেশনে থাকা রোগীদের চিকিৎসা সেবা কিভাবে দেয়া হয়?

করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ ভাগই নিজে নিজে ভাল হয়ে যায়।

সেক্ষেত্রে রোগী যখন অনেক বেশি হয়ে যায় বা ভাইরাসটি যখন ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে তখন রোগীদের বাড়িতে আলাদাভাবে থাকতে পরামর্শ দেয়া হয়। আর জরুরী উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে তাদের হাসপাতালে রাখা হয়।

হাসপাতালে নেয়ার পর অবশ্যই তাকে "বেরিয়ার নার্সিং" বা যারা তার দেখাশোনা করবে যা চিকিৎসা সেবা দেবে তারা সব ধরণের সতর্কতা ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েই সেটি করতে হবে। কারণ তার মধ্যে যখন উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তার থেকে অন্যদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়ায়।

তবে বাড়িতে আইসোলেশন তখনই করা হয়, যখন রোগটি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে।

নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিন কিভাবে করা হয়?

বাড়িতে বা স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিন না করে যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বা নিয়ন্ত্রিত কোয়ারেন্টিন করা হয়, তখন কোয়ারেন্টিনে থাকা কেউ বাইরে যেতে পারবে না। ঠিক একইভাবে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। যেমনটি করা হয়েছিল আশকোনার হজ ক্যাম্পে।

তবে আশকোনার হজ ক্যাম্পে চীন ফেরত বাংলাদেশিদের কোয়ারেন্টিন ছিল গণ কোয়ারেন্টিন।

তবে ডা. মাহমুদুর রহমানের মতে, গণহারে কোয়ারেন্টিনে রাখা হলে তেমন সুবিধা আসে না। আলাদা আলাদা করে রাখলে ভাল হয়। কারণ আলাদা থাকলে কারো মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলেও সে সুস্থ কাউকে সংক্রমিত করতে পারে না।

এক্ষেত্রে বলা যায় জাপানের উপকূলে থাকা ডায়মন্ড প্রিন্সেস নামে একটি প্রমোদ জাহাজের কথা। জাহাজটিতে সবাই শুরুতে আক্রান্ত না হলেও সবাইকে একসাথে বা গণ কোয়ারেন্টিনে রাখার কারণে পরে সবার মধ্যেই ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়ে।

কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে রাখার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে।