করোনাভাইরাস: হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে সামাজিকভাবে হয়রানির অভিযোগ চিকিৎসকদের

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলছেন অনেকেই।

চিকিৎসা দিতে চাচ্ছেন না এমন অভিযোগ উল্লেখ করে অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের বিরূপ মন্তব্য করে পোস্ট দিতে শুরু করেন।

তবে এমন পরিস্থিতিতেও অনেক চিকিৎসকই রয়েছেন যারা রাত-দিন এক করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আক্রান্ত মানুষদের।

শুধু চিকিৎসক নন, চিকিৎসা কর্মী এমনকি স্বেচ্ছাসেবী অনেক মানুষও এগিয়ে এসেছেন এই সময়ে।

তারা পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে, করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় কাজ করার কারণে তাদের অনেকেই সামাজিকভাবে নানা ধরণের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

এমনই একজন ডা. ফারিয়া তুজ-ফাতিমা। তিনি জানান, পরিবারের কথা মাথায় না রেখেই, সংক্রমণের ঝুঁকি আর পর্যাপ্ত পিপিই বা সুরক্ষা সরঞ্জামাদির নিশ্চয়তা না পেয়েও নিয়মিতই কর্মস্থলে গিয়ে সেবা দিচ্ছেন তিনি।

তিনি বলেন, বাসায় ফেরার পথে প্রায়ই শুনতে হয় যে, "ওই যে ডাক্তার যাচ্ছে। করোনা রোগী ধরে আসছে"।

"মানুষ বলে, আমাদের এলাকায় করোনা ছড়ালে উনিই নিয়ে আসবে," তিনি বলেন।

"অথচ আমরা এখানে অনেক দিন ধরে বাস করি। কখনো এমনটা হয়নি"।

তিনি বলেন, অনেক রোগীই আসছেন যারা তাদের হিস্ট্রি বা স্বাস্থ্য তথ্য গোপন করছেন।

তারা হয়তো বলছেন না যে, তারা আসলে কী ধরণের সমস্যায় ভুগছেন।

এতে করে আসলে কোন লাভ তো হচ্ছেই না, বরং রোগীর এবং চিকিৎসক দুজনেরই সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

"কারণ এতে করে তাদের চিকিৎসা সঠিক সময়ে শুরু করা যাচ্ছে না,"তিনি বলেন।

এছাড়া সুরক্ষা সরঞ্জামাদির অভাব রয়েছে বলেও জানান এই চিকিৎসক।

সরকারি সরবরাহ আসলেও সেটি বেশ বিলম্ব করেছে এবং সংখ্যায় পর্যাপ্ত নয়। এই সময়ে সেবা দিতে তারা নিজেরাই প্রোটেকটিভ গিয়ার বা সুরক্ষা সরঞ্জাম বানিয়ে নিয়েছেন।

বাজারে বিভিন্ন ধরণের সংক্রমণ রোধী পণ্যের যোগান কমে যাওয়ায় সেগুলোও ব্যবহার করেছেন একাধিকবার।

"একটা গ্লাভস, সেটা কিন্তু একবার ব্যবহার করার। কিন্তু যেহেতু নাই, আমরা ধুয়ে সেটাকে আবার ব্যবহার করেছি। মাস্ক ৮ ঘণ্টা পর পর পরিবর্তন করার কথা। কিন্তু সেটাও পর্যাপ্ত না থাকার কারণে আমাদের আর সেটা মানা সম্ভব হয় না।"

এর কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও জানান তিনি।

"কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই," তিনি বলেন।

তবে এতো সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যখন সেবা দিয়ে ঘরে ফেরেন তারা সেখানেও ফেরার পথে নানা ধরণের হয়রানি আর কটু কথা শুনতে হয় বলে অভিযোগ করেন ডা ফারিয়া তুজ-ফাতিমা।

প্রায় একই ধরণের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন আসমা আক্তার রিতু যিনি একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন।

তিনি বলেন, স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে, প্রশাসনের সাথে মিলে ত্রাণ সরবরাহ, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পরিবহন, নমুনা সংগ্রহের মতো কাজ করে থাকেন তিনি।

উপজেলা প্রশাসনে যেতে প্রতিদিন ১৫ কিলোমিটার মোটর সাইকেল চালিয়ে যান তিনি।

কিন্তু এতে করেও নিজের এলাকায় নানা ধরণের হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।

তিনি বলেন, তার এলাকার কয়েক জন ছেলে তাকে প্রথম দিকে এলাকায় ঢুকতে এবং বের হতে বাধা দিয়েছে।

"আমি মাস্ক পড়েছি কিনা, গ্লাভস পড়েছি কিনা জিজ্ঞেস করতো। অথচ তারাই লাঠিসোটা নিয়ে আট-দশ জন ছেলে একসাথে বসে আড্ডা দিতো, ভাল ভাবে মাস্ক, গ্লাভস কিছুই পড়তো না।"

তিনি বলেন, "আমাকে বলতো যে একবার গ্রামের বাইরে গেলে আর ফিরতে পারবেন না।"

এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী মেখলা সরকার বলেন, মহামারির এই সময়টাতে মানুষ আসলে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে বেশি ভাবছে। অন্যের বিষয়ে ভাবছে না। তারা বেশি স্বার্থপর হয়ে উঠেছে।

আর এসব কারণেই "প্যানিক বায়িং" বা অন্যদের কথা না ভেবে নিজেরা বেশি বেশি কিনে মজুদ করে থাকে। এটা স্বার্থপর আচরণ।

একই কারণে তারা চিকিৎসকদের নিয়েও নানা মন্তব্য করে থাকে।

এছাড়া চিকিৎসকরা যেহেতু আর্থ-সামাজিক দিক থেকে একটি ভাল অবস্থানে থাকেন, তাই শ্রেণী বিভাজনের কারণেও এটা হয়ে থাকে বলে মনে করেন তিনি।

তবে মনোবিজ্ঞানী মেখলা সরকারের মতে, এক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও কিছু দায় রয়েছে।

তিনি বলছেন, "সব চিকিৎসকরা কিন্তু সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানায়নি। কিন্তু যারা জানিয়েছে তাদেরটাই ফলাও করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরণের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে"।

এক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন, সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের বিষয়ে খবর প্রকাশ মানুষের মধ্যে এমন মনোভাব সরিয়ে দিতে পারে এবং তা চিকিৎসকদের জন্যও অনুপ্রেরণার হতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: