পশ্চিমবঙ্গে স্ত্রীকে ফেসবুকে বাজে মন্তব্য করায় যুবককে থানায় মারধর - বিপদে ডিএম

- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি, কলকাতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক জেলা প্রশাসক থানার ভেতরে এক যুবককে প্রচণ্ড মারধর করছেন এরকম একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে তা নিয়ে একদিকে যেমন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমনই বিতর্ক চলছে সামাজিক মাধ্যমেও।
উত্তরাঞ্চলীয় আলিপুরদুয়ার জেলার ওই প্রশাসকের স্ত্রীকে তার ফেসবুক বন্ধু একজন যুবক অশ্লীল কথা লিখেছিলেন বলে অভিযোগ।
পুলিশ ওই যুবককে থানায় নিয়ে আসার পরে জেলা প্রশাসক নিখিল নির্মল এবং তার স্ত্রী দুজনেই ওই যুবককে ব্যাপক মারধর করেন। গোটা ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পরলে রাজ্য সরকার জেলা প্রশাসককে ১০ দিনের ছুটিতে পাঠিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে শুরু হবে বিভাগীয় তদন্ত।
জেলা প্রশাসক মি: নির্মল ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস বা আইএএস অফিসার। কিন্তু আইএএস অফিসারদের সংগঠনও তার পাশে দাঁড়ায় নি।
এ ঘটনায় সরব হয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরাও।
মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের প্রধান কিরীটী রায় বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, "সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। দশদিনের ছুটির পরে তিনি কী ফিরে আসবেন?"
"জেলা প্রশাসকের নামে পুলিশে অভিযোগ কী দায়ের হয়েছে? তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হোক। তদন্ত হয়তো একটা হবে নামকে ওয়াস্তে।"
তার কথায়, "এই ভিডিও-টা সামনে এসেছে ঠিকই, কিন্তু আমরা এরকম অনেক অভিযোগ পাই যেখানে পুলিশ অফিসার বা সিনিয়র অফিসাররা বেআইনিভাবে মারধর করেন।"
নিখিল নির্মলের সঙ্গে যোগাযোগ না করা গেলেও তার স্ত্রী এবং তার অনেক ফেসবুক বন্ধু-বান্ধবী সামাজিক মাধ্যমেই বক্তব্য রাখছেন বিষয়টি নিয়ে।
স্বামীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়ার পরে তার স্ত্রী রোমান হরফে হিন্দিতে একটি বড়সড় পোস্ট দিয়েছেন।
অনুবাদ করলে সেটি এরকম : "অনেক বকওয়াস হয়েছে। সরাতে হলে সরিয়ে দাও। কিন্তু স্ত্রী-সন্তান সহ একজন 'ফ্যামিলি ম্যান'কে আর জ্বালিয়ো না। তোমারা কি সবটা জানো? কী দেখানো হচ্ছে ভিডিওটাতে?"
সেখানে আরো লেখা হয়েছে, "জেনেশুনেই একটা অংশ দেখানো হচ্ছে। যা হয়েছে, সেটা দেখানো হচ্ছে না। ব্লাডি হেল! হ্যাঁ, থাপ্পড় মেরেছি ওই শালাকে.. অন্য কেউ হলে এরকম লোককে মেরেই ফেলত।"
"আমার স্বামী বিয়ের সময়ে বলেছিল আমি তোমার দেখাশোনা করব, তোমাকে রক্ষা করব। আমি গর্বিত, সে আমার কাছে সত্যিকারের হিরো," তিনি আরো লিখেছেন।
অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে ফেসবুক চ্যাটের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি লিখেছেন, "......নিখিলের প্রতি আপনাদের সবার মনোভাবটা যেন 'রেপ তো করে নি! শুধু কমেন্টই করেছে। চড় মারা উচিত হয় নি!"
"আরে গোল্লায় যাক এই সমাজ, এই মানুষরা। চাকরী থাকল কী থাকল না, তাতে কিছু এসে যায় না, কিন্তু ভালবাসা তো রয়েছে। লাভ ইউ নিখিল।"
এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি স্থানীয় পুলিশের কোন কর্মকর্তা।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

কী ছিল ওই ভিডিওতে?
যে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, সেটির সত্যতা যাচাই করে নি বিবিসি। তবে ভিডিওটি যে জাল, সেই দাবীও কেউ করেন নি।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি ঘরে (জানা গেছে সেটি আলিপুরদুয়ারের অন্তর্গত ফালাকাটা থানার অফিসার ইনচার্জের ঘর) এক যুবককে চড় মারছেন জেলা প্রশাসক নিখিল নির্মল। পাশে যে নারীকে দেখা যাচ্ছে, তিনি তার স্ত্রী। এক পুলিশ অফিসার, অন্য একজন নারী এবং সাদা পোশাকের আরও কয়েকজন ব্যক্তিকেও দেখা যাচ্ছে।
ওই যুবক বারে বারে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছেন, বলছেন "ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দিন।" তা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসক তাকে শাসাচ্ছেন আর মারছেন।
তাকে জেলা প্রশাসক বলছেন, "তোমাকে যদি আধঘণ্টার মধ্যে থানায় ঢুকিয়ে দিতে পারি, তাহলে তোমার বাড়িতে গিয়ে মেরেও ফেলতে পারি।"
"আমার জেলায় আমার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারবে না," এই কথাও শোনা গেছে জেলা প্রশাসকের মুখে।
তার স্ত্রী এক পর্যায়ে বলছেন, "গাড়িতে লাঠি আছে। নিয়ে এসো।"
তখন পুলিশ অফিসার বাধা দিয়ে বলেন, "লাঠি বার করা যাবে না।"
তার স্ত্রী এরপরে বলেন, "লেখার সময়ে মনে ছিল না কাকে কী লিখছিস? এখন নিজে পড় কী লিখেছিলি.."
চড়, লাথি সমানেই চলেছে।
শেষ পর্যায়ে পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে ওই যুবককে সরিয়ে দেন।

সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক
ভিডিও ছড়িয়ে পরার পরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক চর্চা চলছে বিষয়টি নিয়ে।
উঠে আসছে দুই ধরণের মন্তব্য।
কেউ বলছেন স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে জেলা প্রশাসক সঠিক কাজ করেছেন।
অন্য অনেকের মন্তব্য নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না কেউই। স্ত্রীকে অশ্লীল কথা লিখে থাকলে জেলাশাসক পুলিশের মাধ্যমে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়াতে পারতেন, নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার কাররই নেই।
থানায় ঢুকে কাউকেই মারধর করা বেআইনি।
দেবযানী বক্সী লাহিড়ী নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, "ডি এম স্যার, [জেলাশাসককে ইংরেজিতে ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা সংক্ষেপে ডি এম বলা হয়] আপনাদের মতন লোকেরা যদি আইন হাতে তুলে নেন তবে সাধারণ মানুষকে আপনি কী মেসেজ দেবেন? .. কেউ অপরাধ বা অন্যায় করলে আমরা তাকে ঠিক এই ভাবেই পেটাতে পারব তো? পুলিশ, থানা, কোর্ট, বিচার ইত্যাদির তো আর কোনও প্রয়োজন নেই তবে?"
গোপ উদয় নামের একজন লিখেছেন, "ছেলেটি যদি রেপের হুমকি দিয়ে শাস্তি ভোগ করে তাহলে ডি এম আধ ঘণ্টার মধ্যে খুন করার হুমকি দিয়েও তো সমান অপরাধ করেছে। তাহলে এক্ষেত্রে ডি এম কে কেন শাস্তির আওতায় সরকার আনবেনা?"
আবার অনিরুদ্ধ সাহা নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, " ডি এম যেটা করেছে সেটা আমি থাকলে আমিও করতাম। আসলে নিজের ফ্যামিলিকে নিয়ে কেউ কিছু বললে মাথা ঠিক থাকে না। কিন্তু উনার আইন অনুযায়ী এগোতে হত।"
ফেসবুকে অতি সক্রিয় একজন, গর্গ চ্যাটার্জী বিবিসিকে বলছিলেন, "এই ভিডিওটা নিয়ে এত আলোচনার কারণ হল ক্ষমতার আস্ফাল এবং ক্ষমাহীনতা।"
"একজন সাধারণ মানুষকে একজন ক্ষমতাবান লোক মারছে। সাধারণ মানুষ ওই যুবকটির সঙ্গে নিজেকে আইডেন্টিফাই করছেন। গণমানুষ এখনও ক্ষমতাহীনের প্রতিই ঝুঁকে পরেন, সেটারই প্রতিফলন ওই যুবকটির প্রতি ফেসবুকে সহমর্মিতা দেখানোর।"
জেলা প্রশাসকের স্ত্রী যে ফেসবুক চ্যাটের প্রসঙ্গ লিখেছেন, সামনে এসেছে সেই চ্যাটের স্ক্রিনশটও। সেগুলির উল্লেখ করে অনেকেই মন্তব্য করছেন, জেলা প্রশাসকের স্ত্রী এবং তাঁর কয়েকজন বান্ধবীও অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে ফেসবুক চ্যাটে অতি অশ্লীল কথা বলেছেন।
সেইসব স্ক্রিনশট সামনে আসার পরে অনেক নারী-পুরুষই জেলা প্রশাসকের স্ত্রী এবং তার ফেসবুক গ্রুপের নারী সদস্যদের অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে চ্যাট করা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন।








