পাকিস্তানের ঘটনা বা গেমিং ক্লিপকেও চালানো হচ্ছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বলে, এআই দিয়ে বানানো ভুল তথ্যের ঢেউ

- Author, ম্যাট মারফি, ওলগা রবিনসন ও শায়ান সরদারিজাদেহ
- Role, বিবিসি ভেরিফাই
ইসরায়েল গত সপ্তাহে ইরানে হামলা শুরুর পর থেকেই অনলাইনে ভুয়া কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। বিবিসি ভেরিফাই যেসব পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে তার অনেকগুলোতেই দেখা গেছে, তেহরানের প্রতিক্রিয়া কতটা সফল বা কার্যকর ছিল তা বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বেশ কয়েকটি ভিডিওতে ইরানের সামরিক শক্তি নিয়ে গর্ব করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরের ঘটনাগুলো দেখানো হয়েছে ভুয়া ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে। বিবিসি ভেরিফাই যেসব ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করেছে তার মধ্যে তিনটি ভিডিও একশ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।
আবার ইসরায়েলপন্থি অ্যাকাউন্টগুলোও অনলাইনে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
মূলত ইরানের বিক্ষোভ এবং সমাবেশের পুরনো ভিডিও ভিডিও শেয়ার করে এগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, এগুলো সরকারবিরোধী ক্ষোভ। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতি ইরানিদের সমর্থন বোঝাতেই এসব শেয়ার করা হয়েছে।
গত ১৩ই জুন ইসরায়েল ইরানে সামরিক হামলা চালায়। জবাবে ইরানও কয়েক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ওপেন-সোর্স ছবি বিশ্লেষণকারী একটি সংস্থা ইসরায়েল-ইরান সংঘাত ঘিরে অবিশ্বাস্য মাত্রায় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে জানাচ্ছে। এই সংস্থাটি এর পেছনে অনলাইনে লাইক- কমেন্টস বাড়াতে কন্টেন্ট তৈরি করা ব্যক্তি বা পেজগুলোকেই দায়ী বলে মনে করছে।
অনলাইন ভেরিফিকেশন গ্রুপ 'জিওকনফার্মড' সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স- এ তাদের অ্যাকাউন্টে লিখেছে, "আমরা এমন সব ফুটেজ দেখছি যেগুলোর কোনোটি পাকিস্তানের ঘটনা, কোনোটি আবার ২০২৪ সালের অক্টোবরের পুরনো হামলার ভিডিও। সেগুলোর অনেকগুলোই ২০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ হয়েছে।"
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
"এছাড়াও বিভিন্ন গেমিং ক্লিপ কিংবা এআই জেনারেটেড (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার) ব্যবহার করে করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তব ঘটনা দাবি করেই শেয়ার করা হচ্ছে।"
এর মধ্যে কিছু অ্যাকাউন্ট ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে 'সুপার স্প্রেডার' হয়ে উঠছে এবং এর মাধ্যমে অনলাইনে তাদের ফলোয়ার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে।
তেহরান কর্তৃপক্ষের সাথে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়, এমন একটি ইরানপন্থি অ্যাকাউন্ট ডেইলি ইরান মিলিটারির এক্স অ্যাকাউন্টে (সাবেক টুইটার) গত ১৩ই জুন ফলোয়ার সংখ্যা ছিল সাত লাখ, সেটি ১৯শে জুন নাগাদ বেড়ে পৌঁছেছে ১৪ লাখে। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ফলোয়ার সংখ্যা বেড়েছে শতভাগ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে এমন অনেক অ্যাকাউন্ট দেখা যাচ্ছে। এগুলোর অনেকগুলোর নামের পাশে নীল টিকযুক্ত চিহ্নও রয়েছে। ফলে অনেকেই এগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য বলে ধরে নিচ্ছেন। তবে এটি যে কারা চালাচ্ছে সেটি অস্পষ্ট।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান গেট রিয়েলের প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা এমানুয়েল সালিবা বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, "এবারই প্রথমবারের মতো কোনো সংঘাতের সময় এত বড় পরিসরে জেনারেটিভ এআই ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে।"
বিবিসি ভেরিফাই যেসব অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করেছে, সেগুলো প্রায়ই এইআই দিয়ে তৈরি ছবি কিংবা ভিডিও শেয়ার করেছে, যেগুলোতে ইরানের সাফল্যকে অতিরঞ্জিতভাবেও উপস্থাপন করা হচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে। এমন একটি ভিডিও যেটি ২৭ মিলিয়ন ভিউ হয়েছে।
সেটিতে তেল আভিভ শহরের ওপর কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে।

আরেকটি ভিডিওতে গভীর রাতে ইসরায়েলের একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। মিজ সালিবা বলেন, "এই ভিডিও ক্লিপগুলোতে সাধারণত রাতের হামলার দৃশ্য দেখানো হয় যা যাচাই করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।"
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিওগুলোর একটিতে ইসরায়েলের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করা হয়েছে। এই যুদ্ধবিমানগুলো মার্কিন তৈরি এবং মাটি ও আকাশের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে।
অ্যালেথিয়ার বিশ্লেষক দলের সিইও লিসা ক্যাপলান বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, "যদি ভিডিওগুলো সত্যি হত, তাহলে ইরান ইসরায়েলের এই যুদ্ধ বিমানের ১৫ শতাংশ ভূপাতিত করে ফেলত। তবে এখনো আমরা কোনো এফ-৩৫ বিমান ভূপাতিত করার কোনো ভিডিও যাচাই বা নিশ্চিত করতে পারিনি।"
ব্যাপকভাবে শেয়ার করা একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, ইরানের মরুভূমিতে গুলি করে ভূপাতিত করার পর একটি জেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজির লক্ষণ স্পষ্ট ছিল।
জেট বিমানের চারপাশে থাকা বেসামরিক লোকদের আকার ছিল কাছাকাছি যানবাহনের সমান। অন্যদিকে মরুভূমির বালিতেও আঘাতের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
টিকটকে দুই কোটি ১১ লাখ ভিউ হওয়া আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে যে, বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর হাতে ইসরায়েলি এফ-৩৫ বিমান ভূপাতিত করা হচ্ছে। কিন্তু ফুটেজটি আসলে একটি ফ্লাইট সিমুলেটর ভিডিও গেম থেকে নেওয়া হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাই এ নিয়ে টিকটকের সাথে যোগাযোগের পর টিকটক ফুটেজটি সরিয়ে নিয়েছে।
ক্যাপলান বলেন, এফ-৩৫ নিয়ে এই বিভ্রান্তির কিছু অংশ এমন একাধিক অ্যাকাউন্ট চালাচ্ছে, যেগুলো আগে রাশিয়া যুদ্ধের নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, "এই ধরনের প্রচারণা বিশেষ করে আমেরিকান অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে পরিচিত অ্যাকাউন্টগুলো থেকেও যারা আগেও ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধে ও অন্যান্য সংঘাতে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেছে"।
তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু মানুষ হয়তো এই সংঘাত থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে চাচ্ছে। কারণ বড় বড় সামাজিক মাধ্যমগুলোও এমন অ্যাকাউন্টগুলোকে প্রচুর ভিউ পাওয়ার জন্য অর্থ দিয়ে থাকে।
এর বিপরীতে, ইসরায়েলপন্থি পোস্টগুলোও মূলত ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের দাবি নিয়ে ব্যস্ত।
এর মধ্যে একটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে দাবি করা হয়, তেহরানের রাস্তায় ইরানিরা "আমরা ইসরায়েলকে ভালোবাসি" স্লোগান দিচ্ছে, যা একেবারেই ভুয়া বা মিথ্যা।
সম্প্রতি, যখন মার্কিন হামলা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বেড়েছে, তখন কিছু অ্যাকাউন্ট এআই জেনারেটেড ভিডিও শেয়ার করছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে বি-টু বোমারু বিমান তেহরানের আকাশে উড়ছে।

ইরানে ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বি-টু বিমান বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, কারণ এটিই একমাত্র বিমান যা ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কার্যকরভাবে আক্রমণ চালাতে সক্ষম বলে মনে করা হয়।
ইরান এবং ইসরায়েলের সরকারি সূত্রগুলো কিছু ভুয়া ছবি শেয়ার করেছে। তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হামলার ভুয়া ফুটেজ এবং একটি এফ-৩৫ জেটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জেনারেটেড ছবি শেয়ার করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ'র শেয়ার করা একটি পোস্টে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যারেজের পুরানো ভিত্তিহীন ফুটেজ ব্যবহারের জন্য এক্সের (সাবেক টুইটার) কমিউনিটি নোট পেয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই দেখেছে যে, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর ভিডিওগুলোর বড় অংশই এক্স এ ছড়ানো হয়েছে। এবং অনেকেই এক্স এর এআই চ্যাটবট গ্রোক ব্যবহার করে এসব পোস্টের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন।
তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রোক ( সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সের চ্যাটবট) জোর দিয়ে দাবি করেছে যে ভিডিওগুলো ভুয়া নয়। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে পাহাড়ি গুহা থেকে অসংখ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ট্রাক বের হচ্ছে। তবে ভিডিওতে দেখা যায় পাহাড়ের পাথর নিজে নিজেই নড়ছে।
মিজ সালিবার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কন্টেন্টের স্পষ্ট লক্ষণগুলোর মধ্যে একটি ছিল ভিডিওতে পাথরগুলোর নিজে থেকেই নড়াচড়া করা। যেটি এআই তৈরি ভিডিওর চিহ্ন।
কিন্তু এক্স'এর ব্যবহারকারীদের প্রশ্নের জবাবে গ্রোক বারবারই জোর দিয়ে বলেছে যে ভিডিওটি আসল এবং নিউজউইক ও রয়টার্সের মতো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের উদ্ধৃত দেয়া হয়েছে সেখানে।
চ্যাটবটের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিবিসি ভেরিফাইয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও তার কোনো জবাব দেয়নি এক্স (সাবেক টুইটার)।
টিকটক ও ইনস্টাগ্রামেও এই ধরনের ভিডিও ছড়িয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাইকে দেওয়া বিবৃতিতে টিকটক জানিয়েছে, তারা বিভ্রান্তিকর, ভুল বা মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে কমিউনিটি গাইডলাইন ফলো করে এবং একই সাথে 'বিভ্রান্তিকর' কন্টেন্ট যাচাই করতে স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকারদের সঙ্গে কাজ করে।
এ নিয়ে ইন্সটাগ্রামের মালিক মেটার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
অনলাইনে ভুয়া কন্টেন্ট তৈরির উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীদের মাধ্যমেই এসব ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে।
নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ ফ্যাসিয়ানি বলেন, সংঘাতমূলক পরিস্থিতিতে যখন মানুষ দ্ব্যর্থহীনভাবে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তখন ভুয়া খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
"মানুষ এমন কনটেন্ট শেয়ার করে যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়। আবার সাধারণভাবে, সংবেদনশীল ও আবেগতাড়িত কনটেন্টই দ্রুত ভাইরাল হয়," যোগ করেন তিনি।








