গোপালগঞ্জের পর কক্সবাজারেও এনসিপি'র কর্মসূচিতে বাধার অভিযোগ

গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি'র কর্মসূচি ঘিরে সংঘাত-সহিংসতার রেশ না কাটতেই এবার কক্সবাজারের চকরিয়ায় দলটির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া ও মঞ্চ ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় এনসিপি'র অস্থায়ী পথসভা মঞ্চ ভাঙচুরের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। যেখানে দেখা গেছে, ট্রাকের ওপর নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চ থেকে দলটির ব্যানার নামিয়ে ফেলছেন একদল ব্যক্তি। এসময় ট্রাকটিতেও ভাঙচুর চালাতে দেখা যায়।
শনিবার দুপুরের পর বিএনপি'র স্থানীয় নেতাকর্মীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছেন এনসিপি'র নেতারা।
যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চকরিয়া বিএনপির স্থানীয় নেতারা। তাদের দাবি, এনসিপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তারা জড়িত নন।
তবে তারা বলছেন, ওই এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমদকে নিয়ে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কটূক্তি করায় তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
এ নিয়ে বিএনপি'র স্থানীয় নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলেও মঞ্চ ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

ছবির উৎস, NCP FACEBOOK PAGE
চকরিয়ায় এনসিপি'র কর্মসূচি ঘিরে যা ঘটেছে
দেশের বিভিন্ন জেলায় ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার কক্সবাজারে সমাবেশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। দুপুরের ওই আয়োজনে বক্তব্য রাখেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতারা।
এনসিপি'র পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী কক্সবাজারের পর বান্দরবানে নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল তাদের।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে চকরিয়াতেও একটি পথসভার আয়োজন করেছিল দলটির নেতাকর্মীরা। যেখানে ব্যানার, ফেস্টুন টানিয়ে ট্রাকের ওপর একটি অস্থায়ী মঞ্চও তৈরি করা হয়।
কক্সবাজার ও চকরিয়ার স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো সমস্যা ছাড়াই কক্সবাজারে কর্মসূচি শেষ করে এনসিপি। কিন্তু এই সমাবেশে সংগঠনটির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর একটি বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়।
স্থানীয় একাধিক সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের নামের সাথে মিলিয়ে কক্সবাজারের একজন নেতার উদ্ধৃতি দেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
ওই সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, "আগে নারায়ণগঞ্জে বিখ্যাত গডফাদার শামীম ওসমান ছিল। এখন শুনছি কক্সবাজারের নব্য গডফাদার শিলং থেকে এসেছে। ঘের দখল করছে, মানুষের জায়গাজমি দখল করছে। চাঁদাবাজি দখল করছে।"
তিনি বলেন, "আবার নাকি সে সংস্কার বোঝে না। নাম না বললাম। কক্সবাজারের জনতা এ ধরনের সংস্কারবিরোধী, যে পিআর বোঝে না রাজপথে তাদের দেখিয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ।"
তার এই বক্তব্যের পরই কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

চকরিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক এহসান আল কুতুবী বিবিসি বাংলাকে জানান, নাসীরউদ্দীনের এই বক্তব্যের পর চকরিয়াতেও বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। এখনো বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপির কর্মসূচি চলছে বলে জানান তিনি।
মি. কুতুবী বলেন, "চকরিয়াতে ওরা সড়কে অবরোধ করতে চেয়েছিল কিন্তু সেনাবাহিনী সেটা করতে দেয়নি। আর এনসিপির একটা পথসভা করার কথা ছিল, মঞ্চটা ভেঙে দিয়েছে, ঈদগাহতে একটি পথসভা করার কথা ছিল সেটাও হয়নি।"
"এনসিপি নেতাদের গাড়িবহর সেনাবাহিনী নিরাপত্তা দিয়ে বান্দরবানে নিয়ে গেছে," বলেন মি. কুতুবী।
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। তারা বলছেন, রাজনীতিতে কথার জবাব "কথার মাধ্যমেই দেওয়া উচিত"।
কিন্তু "এভাবে মঞ্চ ভাঙা বা আমাদের ব্যানার ছিড়ে ফেলা এটা অগণতান্ত্রিক আচরণ" উল্লেখ করে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, "চকরিয়ার ঘটনাটি আমাদের সামনে ঘটে নাই। আমাদের আসলে সেখানে কোনো কর্মসূচি শিডিউলড (পূর্বনির্ধারিত) ছিল না। স্থানীয় নেতাকর্মীরা একটি পথসভার আয়োজন করেছিল।"
"এখন আমারা বান্দরবান আছি। ওই এলাকা ক্রস করার সময় দেখলাম আমাদের অস্থায়ী মঞ্চটি ভাঙা হয়েছে, ব্যানার, ফেস্টুনগুলো ছিড়ে ফেলা হয়েছে," বলেন মি. সালেহীন।
তার দাবি, "আমরা খবর পেয়েছি এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি ওই খানে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।"

চকরিয়ার স্থানীয় বিএনপি নেতারা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তারা বলছেন, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন আহমদকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল বের করলেও কোনো মঞ্চ ভাঙচুর বা হামলার ঘটনায় তারা জড়িত নন।
চকরিয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রহিম উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে জানান, কক্সবাজারের সমাবেশ থেকে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমদকে নিয়ে কটূক্তি করায় স্থানীয় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে।
তিনি বলেন, "এখানে কোনো ভাঙচুর হয়নি, এরকম কিছু আমরা দেখিনি। আমাদের দলীয় লোকজন কোনো ভাঙচুর করে নাই। হয়তো উত্তেজিত জনতা কিছু করতে পারে। আমাদের দলীয় লোকজন ওনারা চলে যাওয়ার পর একটি মিছিল করেছে," বলেন মি. উদ্দিন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির পথসভা ঘিরে একটা সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল তবে কেনো হামলা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলীও।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এখানে তেমন কিছু হয়নি তো, বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে হয় একটা মিছিল করছে সামান্য।"
অস্থায়ী মঞ্চ ভাঙচুরের বিষয়ে মি.আলী বলেন, "ট্রাকের মধ্যে একটা মঞ্চ, ওইটা তো ভাঙার কিছু নাই।"
এর আগে গত বুধবার গোপালগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্ক এলাকায় সমাবেশস্থলে এনসিপি'র কেন্দ্রীয় নেতারা পৌঁছানোর আগেই সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। সমাবেশ শেষে ফেরার পথে গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে আবারো হামলার মুখে পড়ে এনসিপি'র কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহর, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় সহিংস সংঘাতে।
কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় গোপালগঞ্জ ছেড়ে খুলনার দিকে রওনা দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা।
এদিন দুপুর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হামলাকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে ঘটে হতাহতের ঘটনা। যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই গোপালগঞ্জে ঘোষণা করা হয় কারফিউ।
বুধবার দিন রাতে গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেশ বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, সংঘর্ষের ঘটনা চারটি মৃতদেহ হাসপাতালে এসেছে।
পরে শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজন মারা গেছেন।








