ভয়েস অ্যাপে কণ্ঠ নকল করে ভারতের মধ্যপ্রদেশে আদিবাসী ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ

প্রতীকী ছবি- অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল পরিবারের ছাত্রীদের নিশানা করত অভিযুক্ত।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি- অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল পরিবারের ছাত্রীদের নিশানা করত অভিযুক্ত।
    • Author, নীতু সিং
    • Role, বিবিসি হিন্দির জন্য, মধ্যেপ্রদেশের সিধি থেকে

ভারতের মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটা গ্রামে দরিদ্র ছাত্রীদের স্কলারশিপ বা সরকারি বৃত্তি দেওয়ার নাম করে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। কলকাতার হাসপাতালে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নিয়ে তুমুল প্রতিবাদের মধ্যেই এই খবর প্রকাশ্যে এসেছে।

এখনও পর্যন্ত এমন পাঁচজন ছাত্রীর বিষয়ে জানা গেলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে ধর্ষণের শিকার ছাত্রীদের সংখ্যা আরও বেশি।

তবে এই অপরাধের ঘটনার ধরণ একটু আলাদা। এখানে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো অপরাধ সংগঠনের ক্ষেত্রে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

কিশোরীদের সরকারি বৃত্তির কথা বলতে যে নারী কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়েছিল তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ভয়েস অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি করা।

পুলিশ এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে।

বর্তমান সময়ে এ ধরনের অপরাধে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার পুলিশ প্রশাসন ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের হতবাক করে দিয়েছে।

আরও পড়তে পারেন:
মধ্যেপ্রদেশের সিধি জেলা থেকে ৮০ কিলোমিকার দূরে থাকেন নির্যাতনের শিকার এক স্নাতক স্তরের ছাত্রী।
ছবির ক্যাপশান, মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলা থেকে ৮০ কিলোমিকার দূরে থাকেন নির্যাতনের শিকার এক স্নাতক স্তরের ছাত্রী।

কী বলেছেন নির্যাতনের শিকার ছাত্রী?

২১ বছরের এক আদিবাসী ছাত্রী স্কলারশিপ পেতে চেয়েছিলেন লেখাপড়া চালানোর জন্য।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

নিজের বাড়ির আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে ওই শিক্ষার্থী বলেন, “আমি একজন দরিদ্র আদিবাসী মেয়ে। ভবিষ্যতে পড়াশোনা চালানোর জন্য এই বৃত্তি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

“তাই স্কলারশিপের জন্য যখন অর্চনা ম্যাডামের ফোন পেলাম তখন বেশি কিছু না ভেবেই চলে গিয়েছিলাম।”

‘অর্চনা ম্যাডাম’ নামে পরিচয় দিয়ে যে নারী কণ্ঠ কথা বলেছে এই শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাকে তিনি চেনেন না। কিন্তু স্কলারশিপ পাওয়ার আনন্দে এই বিষয়টা খেয়ালও করেননি তিনি।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মূল অভিযুক্ত ব্রিজেশ প্রজাপতি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মেয়েদের সরকারি বৃত্তি দেওয়ার নাম করে প্রতারণা করত। বছর তিরিশের ওই যুবক নারীর কণ্ঠে কথা বলার জন্য ব্যবহার করত একটা বিশেষ অ্যাপের, যা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য তৈরি।

জেলা পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে, ঘটনার সূত্রপাত এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে। সেই সময় থেকে গত ১৩ই মে-র মধ্যে পাঁচজন আদিবাসী মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

অভিযুক্তদের শেষ নিশানায় ছিলেন ২১ বছরের এই শিক্ষার্থী। নির্যাতনের শিকার মেয়েদের মধ্যে তিনিই প্রথম সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে এসে ১৬ই মে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করান।

এই ছাত্রী এগিয়ে এসে লিখিত অভিযোগ দায়ের না করলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতো বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিজের পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন ওই পড়ুয়া।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিজের পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন ওই পড়ুয়া।

এই ছাত্রী বলেছেন, “ওকে (অভিযুক্তের) দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম এখনও পর্যন্ত অনেক মেয়ের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটেছে। যদি আমি এগিয়ে না আসি তাহলে ও এটা চালিয়ে যাবে।”

“তাই সাহস সঞ্চয় করে বিষয়টা আমি আমার কাকাকে জানাই, তিনি পুলিশে চাকরি করেন। আমি চাইনি আমার মতো দরিদ্র মেয়েরা সরকারি বৃত্তির নামে এই প্রতারণার শিকার হোক।”

যে সরকারি বৃত্তির কথা বলে ওই ছাত্রীকে অভিযুক্তকে ডেকেছিল, তার নাম ‘গাঁও কি বেটি যোজনা’। মধ্যপ্রদেশের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রীদের জন্য এই প্রকল্প। দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করার পর ওই ছাত্রীদের পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ৫০০০ টাকার বৃত্তি দেওয়া হয়।

এই প্রকল্প সম্পর্কে তাকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন অভিযুক্ত।

স্নাতক স্তরের অই পড়ুয়া বলেন, “আমাকে গাঁও কি বেটি যোজনার আওতায় স্কলারশিপের কথা বলা হয়েছিল। লোকটা (অভিযুক্ত) বলেছিল এই প্রকল্পে আমি তিন বছরের স্নাতক স্তরে ডিগ্রি অর্জনের জন্য প্রতি বছর ২০,০০০ টাকা পাব। আমার অর্থের প্রয়োজন ছিল আর ও (অভিযুক্ত) আমাকে কথায় ভুলিয়ে ছিল।”

মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত এলাকায় এই ছাত্রীর গ্রাম। গোণ্ড আদিবাসী তারা। তিনিই পরিবারের প্রথম মেয়ে যাকে স্নাতক স্তরে পড়াশোনার জন্য সিধিতে পাঠিয়েছিলেন তার অভিভাবক।

পরিবারের চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে এই ছাত্রী চতুর্থ।

বাবা-মা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মেয়েটির ভাই অন্য শহরে একটা বেসরকারি কারখানায় কাজ করেন। পরিবারের আয় খুবই কম। কোনওমতে সংসারের খরচ সামলানো যায়।

স্নাতক স্তরে লেখা পড়া করার জন্য সিধি জেলায় তার কাকার বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল লেখাপড়া করে চাকরি করা যাতে পরিবারের আর্থিক অসঙ্গতি দূর করতে পারেন। ঘটনার দিন কাকার বাড়ি থেকেই তিনি সেখানে পৌঁছান যেখানে তাকে সরকারি বৃত্তির পাওয়ার জন্য একটা নথিতে সই করতে ডাকা হয়েছিল।

বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে পুরুষ কণ্ঠস্বর নারীর গলার স্বরে পরিবর্তন করত অভুযুক্তরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে পুরুষ কণ্ঠস্বর নারীর গলার স্বরে পরিবর্তন করত অভুযুক্তরা।

নারী কণ্ঠ ব্যবহার করে প্রতারণা

ঘটনার দিন বিকেল চারটে নাগাদ হঠাৎ ওই ছাত্রীর ফোন বেজে ওঠে। অন্য প্রান্ত থেকে যে কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল তা ছিল এক নারীর।

ওই আদিবাসী পড়ুয়ার নাম নিয়ে ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে আসা কণ্ঠস্বর বলে “আমি তোমার কলেজের অর্চনা ম্যাডাম কথা বলছি। তুমি এক্ষুনি টিকরিতে চলে এসো। তোমার স্কলারশিপের টাকা আটকে আছে। সই করে দিলে টাকা তোমার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে আসবে।”

এর জবাবে ছাত্রী বলেছিল, "ম্যাডাম, বিকেল হচ্ছে। আমি আজ আর আসতে পারব না।"

কিন্তু ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর তাকে বলে, “আজই শেষ দিন। তুমি যদি আজ সই না কর তাহলে গাঁও কি বেটি প্রকল্পের আওতায় থাকা বৃত্তির সুবিধা পাবেন না।”

১৩ই মে-র আনুমানিক বিকেল ৫-৬টা নাগাদ এই ছাত্রী স্কলারশিপের আশায় সিধি জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টিকরিতে পৌঁছন।

টিকরির কাছে পৌঁছে যে নম্বর থেকে তাকে প্রথমবার ফোন করা হয়েছিল সেখানে ফোন করেন। কিন্তু সেই সময় নিজেকে ‘অর্চনা ম্যাডাম’ বলে পরিচয় দেওয়া কণ্ঠস্বর তাকে জানান, আপাতত কাজে ব্যস্ত তিনি।

তাকে বলেন, “আমার ছেলেকে পাঠাচ্ছি। তুমি ওর সঙ্গে চলে এস। সই করা হয়ে গেলে তোমাকে ছেড়ে দেব।”

কিছুক্ষণের মধ্যে এক যুবক বাইকে চেপে টিকরি মোড়ে আসে। তার পরনে ছিল হলুদ টি-শার্ট, হাতে গ্লাভস। নিজেকে অর্চনা ম্যাডামের ছেলে বলে পরিচয় দেন।

বাইকে ওঠার পর যুবক জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তাকে অভিযুক্ত বলে, “মা বাড়িতে আছে। সেখানে নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।”

একটু অন্ধকার নামতে শুরু করলে তাকে জঙ্গলে ঘেরা এক নির্জন জায়গায় নিয়ে যায় অভিযুক্ত। সেখানে ঝুপড়ির মতো ঘর ছিল।

অর্চনা ম্যাডাম কোথায় জানতে চাইলে তাকে শাসায় ওই যুবক। হুমকি দিয়ে বলে বেশি প্রশ্ন করলে হত্যা করা হবে।

ছাত্রী বলেছেন, “খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ওর মুখে মদের গন্ধ ছিল। আমাকে ভয় দেখিয়ে বলে আওয়াজ করলে মুখে কাপড় ভরে দেব। আমি ভয়ে কিছু বলিনি। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আমার সঙ্গে জঘন্য কাজ করে।”

এই ধর্ষণ কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত ব্রিজেশ প্রজাপতি একটা বিশেষ ভয়েস অ্যাপের মাধ্যমে নিজের গলার স্বর পরিবর্তন করে নারীর কণ্ঠস্বর করে ফেলতেন। তারপর 'অর্চনা ম্যাডামের' পরিচয় দিয়ে সরকারি বৃত্তির কথা বলে মেয়েদের এই ভাঙ্গাচোরা ঝুপড়িতে নিয়ে আসতেন। সেখানে মদ্যপ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ নির্যাতনের পর হয় মাঝরাতে মাঝপথে জঙ্গলে ফেলে আসা হতো অথবা ওই ঘর থেকে বের করে দেওয়া হতো।


প্রতারণা করে ঘন জঙ্গলে নিয়ে আসা হতো মেয়েদের।
ছবির ক্যাপশান, প্রতারণা করে ঘন জঙ্গলে নিয়ে আসা হতো মেয়েদের।

নির্যাতনের পর ঘন জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয় ছাত্রীকে

আনুমানিক রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ওই নির্যাতিতাকে ঘটনাস্থল থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে ছেড়ে দিয়ে আসেন ওই অভিযুক্ত।

তিনি বলেন, “চারপাশে জঙ্গল ছিল। এত রাতে কোথায় যাব ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম। তিনি ইতিমধ্যে আমার ফোনটি নিয়ে গিয়েছিলেন এবং এটি বন্ধ করে রেখেছিলেন।”

পথ খুঁজে পাওয়ার আশায় জঙ্গলেই এদিক ওদিক ঘুরতে থাকেন তিনি।

জঙ্গলের মাঝে অবস্থিত অনেক বাড়িতে সাহায্যের জন্য ডাক দিলেও কেউ সাড়া দেননি। তবে সাহস হারেননি ওই পড়ুয়া। হাঁটতে থাকেন।

অবশেষে, একটা বাড়ি থেকে সাহায্য মেলে। ওই বাড়ির বছর ৬৫র এক নারী তাকে সাহায্য করেছিলেন। প্রায় দুই কিলোমিটার এবড়োখেবড়ো রাস্তা হাঁটার পর একটা নদী পেরিয়ে তার সঙ্গে দেখা হয় নির্যাতনের শিকার এই তরুণীর। সেদিন আবহাওয়া খারাপ ছিল, বৃষ্টি হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন ছাত্রী।

যে নারী তাকে সাহায্য করেছিলেন তিনি বলেছেন, “রাতে মেয়েটির অবস্থা দেখে আর থাকতে পারিনি। ভয় পেয়েছিলাম যে ওকে বাড়িতে রাখলে ওর পিছু নেওয়া কেউ আমাদের হামলা করতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, এই মুহূর্তে ওর খুব সাহায্য দরকার।”

“ও জল খেতে চেয়েছিল। তারপর পুরো ঘটনা আমাকে জানায়। ও খুবই যন্ত্রণায় ছিল।”

 নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর বাড়ির পরিস্থিতি।
ছবির ক্যাপশান, নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর বাড়ির পরিস্থিতি।

মেয়েটিকে যিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন যে নারী তার বাড়ি ছিল জঙ্গলের মাঝখানে।

তিনি বলেন, “ব্যথার কারণে ও কিছুতেই ঘুমাতে পারছিল না। খুব কাঁদছিল। ওকে ওষুধ দিই। তারপর একটু ঘুমায়। সকালে আমাদের কাছে ফোন চেয়ে ওর কাকার সঙ্গে কথা বলে যিনি পুলিশে চাকরি করেন।”

কাকাকে সমস্ত ঘটনা জানানোর পর ১৬ই মে এফআইআর দায়ের করা হয়। এরপর মূল অভিযুক্তকে ধরে ফেলে পুলিশ। পুলিশি সক্রিয়তায় অন্য চারটি ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসে।

আতঙ্ক কাটেনি

এই ঘটনার পর আতঙ্কে রয়েছেন ছাত্রী। একইসঙ্গে তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে উদ্বিগ্নও।

ঘটনার পর তিন মাস পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও বেশ আতঙ্কে রয়েছেন তিনি। তার কথায়, “ঘটনার পর কোথাও যাওয়া আসা করি না। সেদিনের কথা মনে পড়লে খুব ভয় পেয়ে যাই, কাঁদতে শুরু করি।”

“আদিবাসী মেয়েদের জন্য পড়াশোনা করাটা খুব কঠিন। এই ঘটনা ঘটার পর আরও কঠিন হয়ে পড়বে। লোকে এটাই বলে যে মেয়েটার দোষ। কাউকে না জানিয়ে ফোনে কথা বলল কেন?”

দ্বিতীয় ছাত্রীর বাড়ির পরিস্থিতি।
ছবির ক্যাপশান, দ্বিতীয় ছাত্রীর বাড়ির পরিস্থিতি।

দ্বিতীয় তরুণীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

দ্বিতীয় মেয়েটির বাড়ি সিধি জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। একটা ভাঙাচোরা বাড়িতে থাকেন বইগা সম্প্রদায়ভুক্ত এই মেয়েটির পরিবার।

যেদিন আমাদের টিম তার বাড়ি গিয়েছিল, সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ফুঁটো ছাদ থেকে পড়া জল সামলাতে জায়গায় জায়গায় বাসন পেতে রাখা হয়েছিল।

কাছাকাছি স্কুল না থাকায় ২০১৮ সালে অষ্টম শ্রেণির পর তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। ঘটনাচক্রে যে অপ্রীতিকর ঘটনার ভয়ে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শেষপর্যন্ত সেই ঘটনারই শিকার হতে হয়েছে তাকে।

তিনি জানিয়েছেন, “গত ১৫ এপ্রিল আমার কাছে এক আন্টির ফোন আসে। তিনি বলেন- তোমার ১৮ বছর বয়স, টাকা পাবে তুমি।”

“এ বিষয়ে আমার কোনও ধারণা ছিল না। ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই কোনও সরকারি প্রকল্প রয়েছে যেখানে যাতে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পরে মেয়েরা অর্থ পায়।”

“সেদিন আমি পিসির বাড়িতে ছিলাম। পিসির মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে পৌঁছাই যেখানে আমাকে যেতে বলা হয়েছিল,” এই পর্যন্ত বলে চুপ করে যান তিনি।

অভিযুক্ত বাইক চালিয়ে আসে। তার হাতে কালো দস্তানা ছিল। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর অভিযুক্ত তাদের বাইকে করে সেই নির্জন কুঁড়েঘরে নিয়ে যায়।

“বাধা দিলে আমাদেরকে তিন চারবার থাপ্পড় মারে। সেটা দেখে আমার বোন ভয় পেয়ে যায়। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাদের উপর অত্যাচার চালায়। তারপর বার করে দেয়,” কথা বলতে বলতে গোলা বুজে আসছিল মেয়েটির।

সারারাত জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটেছিল এই তরুণী এবং তার ১৬ বছরের পিসতুত বোন।

“রাস্তায় টাঙানো বোর্ড দেখে দেখে কোনও মতে সকাল সাতটা নাগাদ বাড়ি পৌঁছাই ,” বলেছেন তিনি।

অভিযুক্ত তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় প্রাথমিকভাবে বাড়িতে কিছু জানাননি এই দুই তরুণী।

গ্রামের বর্তমান পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “প্রতিদিন পুলিশ বাড়িতে আসায় গ্রামের সবাই ঘটনাটা জানতে পারে। এখন মেয়েরা ভয় পায়। কেউ আর মেয়েদের একা বাজারের বা স্কুলে পাঠায় না যাতে তাদের সঙ্গে যেন কোনও অঘটন না ঘটে।”

দুই বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে এই তরুণীই সবচেয়ে বড়। ঘটনার পর বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায় তার পরিবার।

তার মা ইতস্ততঃ করে বললেন, “আমরা খুব বেশি শিক্ষিত নই। জঙ্গলে থাকি। বাইরের লোকজন এলে ভয় লাগে। এখন আরেকটা দুশ্চিন্তা আছে, মেয়ের বিয়ে হবে কী করে? সবাই তো জেনে গিয়েছে।”

কেন সরকারি বৃত্তির নাম করে প্রতারণা

পুলিশ জানিয়েছে, হয় সরকারি বৃত্তি নয়ত কোনও সরকারি প্রকল্পের নাম করেই মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করত ওই অভিযুক্ত। তাদের আর্থিক অবস্থা যে খুবই শোচনীয় এই বিষয়টা অভিযুক্তর জানা ছিল।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে ততটা সচেতন নন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাদের তরফেও সেভাবে জানানো হয়নি। আর তার সুযোগ নিয়ে থাকে অনেকে।

১৬ বছরের এক নাবালিকাও একই ঘটনার শিকার। তার মা নিজেদের আর্থিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমার মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করছি।”

“ঘটনা নিয়ে কিছুই বলব না। পুলিশ মানা করেছে। বহুবার থানার চক্কর কেটেছি , আর চাই না," অসন্তোষের সুরে বলেছেন তিনি।

তার চিন্তা মেয়ের বিয়ে কীভাবে হবে। কারণ সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা আসায় সবাই জানতে পেরেছে।

প্রসঙ্গত ধর্ষণের শিকার পাঁচজনের মধ্যে মাত্র তিনজনের পরিবারই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছে।

এই পরিবারের সঙ্গে কথা বলাও কঠিন ছিল। এই সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের সঙ্গে বহিরাগতদের তেমন সম্পর্ক নেই। সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বললে পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করছে এই পরিবারগুলো।

সিধি জেলার এক গভর্নমেন্ট কলেজে পড়ান অজিতা দ্বিবেদী। তিনি বিবিসিকে বলেন, “এই ঘটনা সমস্ত মেয়েদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। আদিবাসী মেয়েরা খুব সোজাসাপ্টা এবং রক্ষণশীল।”

“ওরা কারও কাছে নিজেদের কথা বলতে পারে না। ধর্ষণের মতো ঘটনায় মেয়েরা অভিযুক্তের চেয়ে তাদের পরিবার এবং সমাজের কাছে বেশি নির্যাতিত হয়। তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায় তাদের। এমন ঘটনায় মেয়েদের পুরো জীবনটাই ধ্বংস হয়ে যায়।”

বৃত্তির বিষয়ে কলেজ থেকে ছাত্রীদের কতটা তথ্য দেওয়া হয় এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “কলেজে তো এই নিয়ে বলা হয়। অভিযুক্ত শিক্ষিকা সেজে কথা বলে মেয়েরা বুঝতে পারেনি।”

“এরা খুব দরিদ্র। এই স্কলারশিপ তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা পেলে তারা আরও পড়াশোনা করতে পারবে। তাই এই মেয়েগুলো এর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারেনি।”

যে ধরনের নতুন প্রযুক্তি আসে সে সম্পর্কে স্কুল, কলেজে জানানো উচিৎ যাতে কেউ এর সাহায্য নিয়ে প্রতারণা না করতে পারে।

পুলিশ কী বলছে?

সিধি পুলিশ জানিয়েছে, মূল অভিযুক্ত ব্রিজেশ প্রজাপতি ছাড়াও আরও তিন অভিযুক্ত রয়েছে। রাহুল এবং সন্দীপ প্রজাপতি দুইজন ভাই। আর মূল অভিযুক্ত তাদের আত্মীয়।

সিধি পুলিশ জানিয়েছে, চতুর্থ অভিযুক্ত লভকুশ প্রজাপতি ওই বিশেষ অ্যাপ ডাউনলোড করেছিল। একটা কলেজের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে মেয়েদের মোবাইল নম্বর সরবরাহ করতেন তিনি।

সিধি জেলা প্রশাসন সমস্ত অভিযুক্তদের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মূল অভিযুক্ত ব্রিজেশ প্রজাপতি পেশায় শ্রমিক।

সিধির পুলিশ সুপার ড. রবীন্দ্র ভার্মা বিবিসিকে বলেন, “মূল অভিযুক্তের ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে ১৮টা মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ, যার মধ্যে পাঁচটা নির্যাতিতা তরুণীদের। বাকি ফোনগুলো চুরি করা।”

“সুরাটের যে কারখানায় কাজ করতেন ব্রিজেশ, সেখানে নাইট শিফটে কর্মরতদের ফোন চুরি করতেন তিনি। এর জন্য তার নাম এফআইআরও হয়েছে।”

ডঃ রবীন্দ্র ভার্মা আরও বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে রাজ্য সাইবার সেলকে একটা চিঠি পাঠানো হয়েছে। যেখানে আমরা এই অ্যাপ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছি। ভারত সরকারকে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।”

সাইবার এক্সপার্ট কী বলছেন?

সাইবার সিকিউরিটি ও ডিজিটাল এভিডেন্স বিশেষজ্ঞ আইনজীবী অক্ষয় বাজপেয়ী বিবিসিকে বলেন, “আজকাল মানুষ মূল উৎসের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন না। তাড়াহুড়ো করে খোঁজ খবর না করেই পাওয়া তথ্য বিশ্বাস করছে। যার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।”

‘ফোনে কথাবার্তার পর ওই শিক্ষার্থীরা বৃত্তির উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন তাহলে তারা বাঁচতে পারতেন।”

তিনি আরও বলেন, “ভয়েস মেসেজে গলার স্বর পরিবর্তন করে অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত অনেক অনলাইন প্রতারণার ঘটনা ঘটছে।”

“প্রযুক্তির সাথে মানুষকে নিজেকে বদলাতে হবে। স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে, তবেই শিক্ষার্থীরা এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে পারবে।”

অভিযুক্তদের পরিবার কী বলছে?

ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে মূল অভিযুক্তের শ্বশুরবাড়ি । নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্বশুর বলেন, “ওর (অভিযুক্তর) স্বভাব ভাল না হওয়ায়, বাড়ি চলে আসে আমার মেয়ে। ওদের ৫-৬ বছরের একটা ছোট মেয়ে আছে।”

“আমার মেয়েকে মারধর করত, তাই সে স্বামীর সঙ্গে ফিরে যেতে চায়নি। কখনও এখানে, কখনও তার বাড়িতে বা কাজের জায়গায় যাতায়াত করত ও (অভিযুক্ত যুবক।”

অন্য দুই অভিযুক্ত সন্দীপ ও রাহুল প্রজাপতির বাবা মাটির পাত্র তৈরির কাজ করেন। তার অভিযোগ তুই ছেলেকে ফাঁসানো হয়েছে।

প্রশাসনের তরফে বুলডোজারের দিয়ে ভাঙা বাড়িটি দেখিয়ে তাদের বাবা বলেন, “আমার সন্তানদের গ্রেফতারের এক সপ্তাহের মধ্যে বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হয়। আমরা শ্রমজীবী মানুষ, ছোট্ট একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করেছিলাম, সেটাও ভেঙে ফেলা হয়েছে।”

“আমার ছেলেদের দোষ ওরা মূল অভিযুক্তের কাছ থেকে কাছ কম টাকায় দুটো মোবাইল ফোন কিনেছিল। এই জন্য পুলিশ তাকে আটক করেছে। ওদের ছোট ছোট বাচ্চা আছে, কখনওই এমন কাজ করবে না ওরা।”

এলাকায় এখনও আতঙ্ক রয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, এলাকায় এখনও আতঙ্ক রয়েছে।

স্থানীয় মেয়েদের উপর ঘটনার প্রভাব

এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় মেয়েদের মধ্যে পরিবারের তরফে তাদের লেখাপড়া না করতে দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ জন্মেছে। কারণ ধর্ষণের মতো ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় মেয়েদের ওপরেই।

গভর্নমেন্ট কলেজ জিডিসি থেকে স্নাতকোত্তর পড়েছেন জ্যোতি প্যাটেল বলেন, “এই ঘটনার পর থেকে অনেক পরিবারেই মেয়েদের পড়াশোনা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের উপর মানসিক চাপ বাড়ছে। ওদের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়, তাই সরকারি প্রকল্পে আশায় থাকে।”

পূজা সিং কুশরাম গান্ধীগ্রামের জেলা পঞ্চায়েত একজন সদস্য। তিনি গোণ্ড সম্প্রদায়ভুক্ত।

তার কথায়, “আমি আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত এবং আমি জানি ওরা কতটা দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার শিকার।”

“এই ঘটনায় দুটো দিক সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, প্রযুক্তি না বুঝলে মানুষ আটকে যায়। দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য এতটাই বেশি যে এদের কাছে স্কলারশিপ খুব গুরুত্বপূর্ণ।”