ইরানে আটকা পড়েছেন চার হাজার ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী, বেশিরভাগই জম্মু-কাশ্মীরের

ইরানে মেডিক্যাল পড়তে গিয়ে আটকে পড়া ছাত্রী রৌনক আশরাফ, সঙ্গে তার বাবা আশরাফ ভাট

ছবির উৎস, Ashraf Bhatt

ছবির ক্যাপশান, ইরানে মেডিক্যাল পড়তে গিয়ে আটকে পড়া ছাত্রী রৌনক আশরাফ, সঙ্গে তার বাবা আশরাফ ভাট
    • Author, সৈয়দ মোজিজ ইমাম
    • Role, বিবিসি সংবাদদাতা

ইরান আর ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে প্রায় চার হাজার ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রী ইরানে আটকে রয়েছেন। আকাশপথ বন্ধ থাকার ফলে তাদের আপাতত ভারতে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ওই ছাত্রছাত্রীদের পরিবার-পরিজন চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

যেসব ছাত্রছাত্রীরা আটকে পড়েছেন, তাদের বেশিরভাগই ভারত শাসিত জম্মু-কাশ্মীরের। তাদের পরিবার-পরিজনরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে রোববার শ্রীনগরে একটি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।

ইরানে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, "তেহরানে ভারতীয় দূতাবাস পরিস্থিতির ওপরে নজর রাখছে। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সরকার চিন্তিত। কিছু ছাত্রছাত্রীকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।"

ভারত সরকার ইরানে বসবাসকারী সব নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন নিজেদের ব্যবস্থাপনায় তেহরান থেকে সরে কোনো নিরাপদ জায়গায় চলে যান। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য মঙ্গলবার থেকে একটি হেল্পলাইনও চালু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সরকারের তরফ থেকে কিছু ছাত্রছাত্রীকে আর্মেনিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

ভারতশাসিত কাশ্মীরের যেসব ছাত্রছাত্রী ইরানে আটকে পড়েছে তাদের অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতশাসিত কাশ্মীরের যেসব ছাত্রছাত্রী ইরানে আটকে পড়েছে তাদের অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন

ইরানে কেন পড়তে যাওয়া?

ভারত-শাসিত জম্মু-কাশ্মীরের কুপওয়াড়া জেলার বাসিন্দা আশরাফ ভাট একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তার মেয়ে রৌনক আশরাফ এবছরই তেহরানের ইরান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে এমবিবিএস পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছেন। মাত্র তিন মাস আগেই তিনি ভারত থেকে ইরানে গেছেন।

কিন্তু এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মিজ. ভাট সেখানে আটকে পড়েছেন।

আশরাফ ভাট বিবিসিকে বলছিলেন, "মেয়ে যখন পড়তে গেল ওদেশে তাতে আমরা খুবই খুশি ছিলাম। কারণ ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন তো ওর নিরাপত্তার জন্য আমরা সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। যদিও ভারতীয় দূতাবাস শিক্ষার্থীদের নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।"

তার কথায়, "আমরা ভারত সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।"

বিবিসি যখন মিজ. রৌনকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে, তখন তিনি কুম শহরে ছিলেন।

মিজ. ভাট বলছিলেন, "আমরা সোমবার ভোর ছয়টা (ইরানের স্থানীয় সময়) তেহরান থেকে রওনা হয়ে এখানে পৌঁছাই ১০টা নাগাদ। এখন আমরা একটা হোটেলে আছি। এখানে প্রায় হাজার খানেক ছাত্র ছাত্রী রয়েছি। এর মধ্যে ১৮০ জন আমারই ইউনিভার্সিটির। বাকিরা দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে এসেছে।"

তেহরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, "যে টিভি স্টেশনে হামলা হয়েছে, সেটি আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকে মাত্র দু মিনিট দূরে। তবে আমরা যখন কলেজ থেকে রওনা হচ্ছিলাম, তখন কোনো বোমা হামলা হয়নি।"

ভারতীয় কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের ভারতে ফেরার ব্যাপারে এখনো কোনো স্পষ্ট তথ্য দেননি, কারণ এখন আকাশ পথ বন্ধ রয়েছে আর ইরান থেকে বেরনোর জন্য তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে আসতে হবে।

কুপওয়াড়ারই আরেক বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মুহিদ্দিন সরাকরির মেয়ে নুর মুন্তহা শিরাজ মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।

মি. মুহিদ্দিন শ্রীনগরে রবিবারের বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, "মঙ্গলবার আমার মেয়ে ভিডিও কল করে জানিয়েছে যে দূতাবাস থেকে তাদের বাসে করে কোনো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ও এটা জানায়নি যে ঠিক কোথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।"

"আমরা চাই সরকার আমাদের ছেলে মেয়েদের যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনুক," বলছিলেন মি. মুহিদ্দিন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ পর্যন্ত ইরানে প্রায় দেড় হাজার ভারতীয় ছাত্রছাত্রী মেডিক্যাল পড়তে যেতেন।

এছাড়াও সেদেশে এমন ভারতীয় শিক্ষার্থীও আছেন যারা ধর্মশিক্ষার জন্য গিয়েছেন।

ইরানের তেহরান, কুম আর শিরাজ-এর মতো শহরগুলোতেই ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করে। এছাড়া কুম এবং মশহদ-এ শিয়া সম্প্রদায়ের পড়ুয়ারা ধর্ম শিক্ষা নিতে যায়। ইরাকের নজফ-এর পরেই শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্ম শিক্ষার একটা বড় কেন্দ্র কুম শহরটি।

তেহরানের আজাদ ইউনিভার্সিটিতেও অনেক ভারতীয় ছাত্রছাত্রী পড়তে যান - ফাইল চিত্র

ছবির উৎস, Kaveh Kazemi/Getty Images)

ছবির ক্যাপশান, তেহরানের আজাদ ইউনিভার্সিটিতেও অনেক ভারতীয় ছাত্রছাত্রী পড়তে যান - ফাইল চিত্র

ডাক্তারি পড়ার খরচ কম

আশরাফ ভাট বলছিলেন যে তার মেয়ে ভারতে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা 'নিট' দিয়েছিলেন কিন্তু তাতে অসফল হন। এর পরে তিনি মেয়েকে ইরান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, কারণ অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানে এমবিবিএস পড়ার খরচ অনেক কম।

ভারতীয় ছাত্ররা ডাক্তারি পড়তে ইউক্রেনের মতো দেশেও যান, কিন্তু সেখানকার পরিস্থিতিও খারাপ হওয়ার ফলে এখন ইরানে অনেকে মেডিক্যাল পড়তে যাচ্ছেন।

আশরাফ ভাটের কথায়, ইরানে ছয় বছরের এমবিবিএস পড়ার ফি মোটামুটি ১৫ থেকে ৩০ লাখ ভারতীয় টাকা, যেখানে বাংলাদেশে এর দ্বিগুণ, অর্থাৎ প্রায় ৬০ লাখ ভারতীয় টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

ইরানে এমবিবিএস পড়ার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম হলো তেহরানের ইরান ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, ইসলামিক আজাদ ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সে, শাহিদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটি আর কেরমান ইউনিভার্সিটি।

শ্রীনগরের সংস্থা এডুকেশন জোনের সঙ্গে বিবিসি ফোনে যোগাযোগ করেছিল। এক কর্মচারী, মি. সাজ্জাদ জানান যে তাদের সংস্থার নির্দেশক নিজেই এখন ইরানে আটকিয়ে পড়েছেন।

এডুকেশন জোনের মতো আরও বেশ কয়েকটি এজেন্সি ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের বিদেশে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে সহায়তা দিয়ে থাকে।

এরকমই একটি সংস্থার একজন কর্মী নাম উল্লেখ না করার শর্তে বলেন যে "ইরানে ছাত্রদের বৃত্তিও বেশ ভালোই দেওয়া হয়, সেজন্যই অনেক ছাত্র-ছাত্রী ইরানে পড়তে যাচ্ছে।"

ইরানে আটকে পড়া অন্যান্য দেশের ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি।

আবার কাশ্মীরের ছাত্র-ছাত্রীদের ইরানে যাওয়ার একটা কারণ যদি হয় কম খরচ, অন্য দুটো কারণ হলো সেখানকার থাকা-খাওয়া এবং আবহাওয়া অনেকটা নিজেদের এলাকারই মতো।

ফরজান রিজভি নয় বছর ধরে কুম শহরে ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছেন

ছবির উৎস, MOHD. FARZAN RIZVI

ছবির ক্যাপশান, ফরজান রিজভি নয় বছর ধরে কুম শহরে ধর্মীয় শিক্ষা নিচ্ছেন

শিয়া ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র

দুনিয়ার শিয়া মুসলমানদের কাছে ইরান এখন ধর্ম শিক্ষার একটা প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। যদিও ইরাকের নজফ আর সিরিয়ার দামেশ্কেও ছাত্ররা ধর্ম শিক্ষার জন্য গিয়ে থাকে।

কিন্তু ইরাকে সাদ্দাম হুসেইনের শাসনকালে ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্রস্থল ধীরে ধীরে ইরানের দিকে সরে আসতে শুরু করে। ইরানের মশহদ আর কুম শহরগুলিতে ছাত্ররা ধর্মীয় শিক্ষা নিতে যায়।

ইরানে ভারতীয় যে ছাত্ররা ধর্ম শিক্ষার জন্য যায়, তারা বেশ কিছু সুবিধা পায়। এদের পুরো পড়াশোনার খরচই দেয় ইরান সরকার।

তেহরান থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের কুম শহর ধর্ম শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র। এখানে পাঁচটি প্রধান মাদ্রাসা আছে, যেখানে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গেই ধর্মীয় শিক্ষাও দেওয়া হয়ে থাকে।

কুম শহরে প্রায় নয় বছর ধরে বাস করেন মুহম্মদ ফরজান রিজভি। তিনি মাদ্রাসা ইমাম খুমেইনিতে পড়াশোনা করেন। ফোনে কথা বলার সময়ে তিনি জানাচ্ছিলেন, "কুম শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিকই আছে।"

উত্তর প্রদেশের বারাবাঙ্কি জেলার বাসিন্দা মি. রিজভি বলছিলেন, "এখানে শুধুই আকাশ পথ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু স্কুল, বাজার সহ সব কিছুই স্বাভাবিকভাবেই চলছে। এই মুহূর্তে এখানে কোনো বিপদ তো দেখছি না।"

ইরানের মশহদ আর কুম – দুটি শহরই শিয়া মুসলমানদের কাছে ধর্মীয় দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ফরজান রিজভি বলছিলেন, "তেহরান থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার দূরে মশহদ শহর। ওখানেও কোনো বিপদ নেই।"

কুম শহরের প্রায় ছয়শো বছর প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফাইজিয়েহ স্কুল

ছবির উৎস, Yannis Kontos/Sygma/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কুম শহরের প্রায় ছয়শো বছর প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফাইজিয়েহ স্কুল

ভারত সরকারের পরামর্শ

ইরানে ভারতের দূতাবাস তেহরানে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের শহর ছেড়ে নিরাপদ এলাকায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে ভারতীয় দূতাবাসের এক্স হ্যান্ডেল থেকে লেখা হয়েছে, "যেসব ভারতীয়রা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় তেহরান থেকে বাইরে চলে যেতে সক্ষম, তাদের দ্রুত নিরাপদ এলাকার দিকে রওনা হয়ে যাওয়া উচিত।"

আবার যে সব ভারতীয় নাগরিক এখনো তেহরানে রয়েছেন কিন্তু দূতাবাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, তাদের বলা হয়েছে যে তারা যেন দ্রুত নিজেদের অবস্থান আর যোগাযোগের নম্বর দূতাবাসে জানিয়ে রাখেন।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দ্রুত তেহরান খালি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। নিজের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে তিনি লিখেছিলেন, "সবারই উচিত দ্রুত তেহরান খালি করে দেওয়া।"

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘর্ষ ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে, সেটা এখনই বলা কঠিন। তবে দুটি দেশে আটকিয়ে পড়া ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা আর তাদের ফিরিয়ে আনা ভারত সরকারের কাছে ইতোমধ্যেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।