জামায়াতে ইসলামী কেন ঢাকায় সমাবেশ করতে চায়?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, আকবর হোসেন
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
বাংলাদেশে মাঠের রাজনীতিতে আবারো সরব হতে পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। এর অংশ হিসেবে ১০ই জুন ঢাকায় সমাবেশ করতে চায় দলটি। শেষ পর্যন্ত পুলিশের অনুমতি পেলে শনিবার ঢাকায় বড় ধরণের লোক সমাবেশ ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
গত বারো বছর যাবত বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সিনিয়র নেতারা দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে কথা বলেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এমন কথাও বলেছিলেন যে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা শুধু সময়ের ব্যাপার।
কিন্তু সেই জামায়াতে ইসলামী এখন আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরব হচ্ছে।
সমাবেশ করার অনুমতি চাইতে গত ২৯শে মে জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী প্রতিনিধি দল যেভাবে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার অফিসে গিয়েছে সেটি নিকট অতীতে দেখা যায়নি।
প্রথম দফায় গত ৫ই জুন সমাবেশ করতে চাইলেও সে অনুমতি মেলেনি পুলিশের তরফ থেকে। তারিখ পরিবর্তন করে ১০ই জুন সমাবেশের অনুমতি চেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু সে ব্যাপারেও পুলিশের দিক থেকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
পুলিশ কমিশনার অফিসে জামায়াতে ইসলামের আইনজীবী দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাইফুর রহমান। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, পুলিশের অনুমতি পেলে সমাবেশে এতো লোকসমাগম হবে যেটি ‘আউট অব ইমাজিনেশন’ বা ধারণারও বাইরে।

ছবির উৎস, Getty Images
জামায়াত কী চায়?
জামায়াতে ইসলামী সমাবেশ করতে চায় ঢাকার বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট এলাকায়। এজন্য তারা সাংগঠনিক প্রস্তুতিও নিয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, এই সমাবেশে ঢাকা মহানগর এলাকার থেকে তাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা যোগ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজন্য ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা নীরবে জনসংযোগও চালিয়েছেন।
বায়তুল মোকাররমে এই সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তুলে ধরতে চায় যে দল হিসেবে তারা এখনো 'দুর্বল হয়নি' এবং তাদের নেতা-কর্মীরা এখনো ‘সক্রিয় ও চাঙ্গা’ রয়েছে।
দলটির নেতারা বলছেন, গত ১৫ বছরে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে সেটি তুলে ধরা হবে এই সমাবেশে।
“আমরা মজলুম, আমরা নির্যাতিত। আমাদের উপর নানা অত্যাচার করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ১০ই জুন শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে চায়।
২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে জামায়াত ইসলামী রাজনৈতিকভাবে কার্যত কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবার পর কোন নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিতে পারেনি দলটি।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকার মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ রয়েছে। জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর অফিসগুলোও বন্ধ রয়েছে।
২০১৪ সালের পর থেকে রাজনৈতিকভাবে তাদের প্রকাশ্যে তেমন কোন কর্মসূচিও নেই। যদিও বিভিন্ন সময় তারা ঝটিকা মিটিং-মিছিল করেছে, কিংবা করার চেষ্টা রয়েছে। এমনকি ঘরোয়াভাবেও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা মিটিং করতে গেলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছে।
“আমাদের দশজন মানুষ কোন বাসায় একত্রিত হয়ে চা খেতে বসলেও তাদের ধরে নিয়ে গেছে,” বলেন সাইফুর রহমান।
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মনে করছেন আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে তৎপর হবার সময় এসেছে। এজন্য সমাবেশের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আবারো সামনে আনতে চায় দলটি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি যে আন্দোলন করছে সেটির সমর্থনে সক্রিয় আছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতে ইসলামী মনে করছে, দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি, ডলার সংকট এবং নাজুক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সরকার এখন রাজনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে।
ফলে মাঠের রাজনীতিতে সরব হওয়ার এখনই ‘আসল সময়’ মনে করছে জামায়াতে ইসলামী নেতা-কর্মীরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্বাচন আসলে সব রাজনৈতিক দল সরব হতে চায়, জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
আমেরিকার ভিসা নীতির প্রভাব?
জামায়াতে ইসলামী এমন সময়ে সমাবেশ করতে চাচ্ছে যখন বাংলাদেশের রাজনীতি বেশ ঘটনাবহুল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে আগামী সংসদ নির্বাচন যাতে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ হয় সে লক্ষ্যে মাত্র দু'সপ্তাহ আগেই নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
সেই ভিসা নীতির ভাষ্যমতে, যেসব কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বানচালের আওতায় পড়বে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে - শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার প্রয়োগ করা থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা।
জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির পর্যবেক্ষক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সালাউদ্দিন বাবর মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি জামায়াতে ইসলামীর জন্য নতুন ‘অপরচুনিটি’ বা সুযোগ তৈরি করেছে।
মি. বাবর মনে করেন গত ১০বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে জামায়াতে ইসলামী একটি অনুকূল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করছিল।
যদিও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করছেন না যে আমেরিকার ভিসা নীতি তাদেরকে উৎসাহিত করেছে।
“কারো কোন সিদ্ধান্ত দ্বারা জামায়াতে ইসলামী এনকারেজড (উৎসাহিত) হয় না। আমরা আইন অনুগত একটি রাজনৈতিক দল। আমরা সংঘাত-সংঘর্ষের পরিস্থিতি চাই না।” বলেন মতিউর রহমান আকন্দ।

ছবির উৎস, Getty Images
পুলিশ অনুমতি দিবে?
শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সমাবেশের জন্য পুলিশের দিক থেকে কোন অনুমতি মেলেনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) বিপ্লব কুমার সরকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, এখনো পর্যন্ত আমরা কোন সিদ্ধান্ত পাইনি।
“প্রোগ্রামের অনুমতি দেয়া হলে হলে এক ধরণের সিকিউরিটি প্রোগ্রাম, না পেলে আরেক ধরণের সিকিউরিটি প্রোগ্রাম। এ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা কোন সিদ্ধান্ত পাইনি। সম্মানিত পুলিশ কমিশনার মহোদয় এ সিদ্ধান্ত দেবেন।”
এর আগে বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াতে ইসলামী আমাদের নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃত দল নয়।
কোন ধরণের নাশকতা কিংবা সহিংসতার আশংকা আছে কি না সেটি পুলিশ কমিশনার নিরূপণ করবেন।
“সে সিদ্ধান্তটা আমাদের পুলিশ কমিশনার নেবে। এখানে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কিছু করার নাই,” বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।











