জামায়াতে ইসলামী: নিবন্ধন প্রত্যাশী নতুন দলের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কেন এত আলোচনা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা বিডিপি নামের একটি রাজনৈতিক দলের সাথে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক আছে কি না-এই প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিডিপি নামের দলটির কার্যক্রম আগে জানা না গেলেও এখন নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে।
নতুন এই দলের নেতাদের অনেকে জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে।
এই নতুন দলের নেতারা অবশ্য পরিচিত কেউ নন।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা বিডিপি নামের নতুন দলটি তাদের ১৫-সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির নামের যে তালিকা দিয়েছে, এই তালিকার বেশিরভাগই জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
এর মূল যে দু'জন নেতা তাদের মধ্যে দলটির চেয়ারম্যান এ. কে. এম. আনোয়ারুল ইসলাম এক সময় বিএনপি সমর্থক ছাত্রদলে সম্পৃক্ত ছিলেন।
পরে তিনি জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত হন বলে জানা যায়।
কিন্তু মি. ইসলাম তার নিজের জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয় অস্বীকার করেন।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইট
নিবন্ধনের আবেদনকারী দলটিররাজনীতি কী
মি. ইসলাম বলেন, তিনি ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জহুরুল হক হলে ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও ছিলেন তিনি।
এরপর মি. ইসলাম লম্বা সময় সৌদি আরবে ছিলেন এবং সেখানে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার দাবি করেছেন।
তিনি আরও দাবি করেছেন, ২০১৮ সালে দেশে ফেরার পর থেকে তিনি কোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
যদিও তিনি সৌদি আরবে থাকার সময় থেকেই জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন তথ্য জামায়াতের একাধিক সূত্র থেকেই পাওয়া যায়।
'জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ততা অতীত'
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামের নতুন দলের সেক্রেটারী জেনারেল নিজামুল হক ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন বলে জানা যায়। ছাত্র সংগঠনটির ভেতরে সমস্যার কারণে তিনি ঐ পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
তবে পরে মি. হক জামায়াতের ঢাকা মহানগর কমিটির মজলিশে শুরার সদস্য হয়েছিলেন।
ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ. কে. এম. আনোয়ারুল ইসলাম তাদের দলের সেক্রেটারী জেনারেলসহ অন্যদের জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের সাথে যুক্ত থাকার বিষয়কে অতীত বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, "আমাদের নতুন দলের কারও ব্যক্তিগত অতীত টেনে এনে আমাদের জন্য প্রতিবন্ধকতারসৃষ্টি করা হচ্ছে।"
এর ব্যাখ্যায় মি. ইসলাম বলেন, "আমাদের সাথে যারা আছে, তাদের কেউ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছে বা ছাত্রদলের রাজনীতিতে ছিল। বিভিন্ন দল, হয়তো শিবিরের ভাইয়েরাও আমাদের সাথে আছেন।
"অন্য ছাত্রসংগঠন বা অন্য দল করলে নতুন দল করা যাবে না-সংবিধান বা রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে এরকম কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকার বিষয় আমরা খঁজে পাইনি," বলেন বিডিপি নেতা মি. ইসলাম।
জামায়াতে ইসলামীর সাথে ডেভেলপমেন্ট পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই বলে এই নতুন দলের নেতা মি. ইসলাম যে দাবি করছেন, তার সমর্থনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, তাদের দলের গঠনতন্ত্রে ইসলামী রাজনীতি নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই।
তিনি বলেন, "সংবিধান সমুন্নত রাখা, রাজনৈতিক এবং জাতীয় ঐক্য করা, আমাদের সামাজিক সমস্যার সমাধান-এসবই আমাদের মুখ্য বিষয়।
"ইসলামিক রাজনীতি সম্পর্কে কোনো একটা শব্দ আমাদের গঠনতন্ত্রে খুঁজে পাবেন না" বলেন মি. ইসলাম।
জামায়াত নেতারা কী বলছেন?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালে।
এরপর ২০১৮ সালে সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল।
সেই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

নিবন্ধন না থাকায় জামায়াতে ইসলামী বছর দুয়েক আগে তাদের দলের নাম পরিবর্তন করাসহ সংস্কার করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল।
এখন আবার জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত বিভিন্ন কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে।
সেই পটভূমিতে এখন জামায়াতের কৌশলের অংশ হিসাবে ডেভেলপমেন্ট পার্টি নামের নতুন দলের আত্মপ্রকাশ হয়েছে কিনা- এই প্রশ্ন অনেকে করছেন।
এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে নানা খবর প্রকাশ হলেও জামায়াত বিষয়টিতে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি।
তবে জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমীর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসিকে বলেছেন, অন্য কোনো নামে নিবন্ধন করে সেই দলে একীভূত হওয়া - এমন কোন সিদ্ধান্ত বা কৌশল জামায়াত নেয়নি।
ফলে নিবন্ধনের আবেদনকারী দলটির সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই বলে মি. তাহের উল্লেখ করেন।
"জামায়াত কোনো ভিন্ন নামে বা কোনো প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে নিবন্ধন নিয়ে সেই দলের মাধ্যমে নির্বাচন করবে- এরকম কোনো পলিসি জামায়াতের নেই বা এরকম কোনো সিদ্ধান্তও জামায়াতের নেই," বলেন জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
'প্রক্সি সংগঠনের সিদ্ধান্ত নেই'
কিন্তু ডেভেলপমেন্ট পার্টির নেতাদের অনেকেই যে জামায়াত এবং ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথা উঠেছে, সে ব্যাপারে জানতে চাইলে জামায়াত নেতা মি. তাহের বলেন, "এখনতো বিভিন্ন দলে বিভিন্ন গ্রুপের লোকজন আছে। জামায়াত এবং ছাত্রসংগঠন থেকে চলে গেছেন, এমন অনেকেইতো বিভিন্ন দলে আছেন।
"কিন্তু তারাতো দলের সিদ্ধান্তে যায়নি বা দলকে ইনফর্ম করেও যায়নি। তাদের সাথে জামায়াতের কোন যোগাযোগও নেই," বলেন মি. তাহের।
জামায়াত নেতা আরও বলেন, "জামায়াতে ইসলামী যদি এরকম কোনো প্রক্সি সংগঠন করে তাহলে তো জামায়াতের আরও পরিচিত এবং মধ্যম সারি লোক দিয়ে অন্তত করা হতো। সে রকম কিছু হয়নি।"
জামায়াত সমর্থক বলে পরিচিত বাংলা দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর মনে করেন, জামায়াত তাদের নিবন্ধন বাতিল হওয়াসহ বিভিন্ন সময় নানা রকম চাপের মুখে পড়েছে।
কিন্তু, তার ভাষায়, ভূঁইফোড় কোন দলের নামে নিবন্ধ নেয়ার মতো পরিস্থিতিতে জামায়াত এখনও পড়েনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নতুন একটি দল এবং জামায়াতকে ঘিরে আলোচনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে তিনি বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দল হিসাবে জামায়াতের বিচারের ব্যাপারে এখন সংশ্লিষ্ট আইনে সংশোধনী আনা হচ্ছে।
এদিকে, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি নিবন্ধন পাবে কিনা-সেদিকেই সবার নজর থাকবে।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এপর্যন্ত ছোট ছোট ৩০টিরও বেশি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে।








