'নরেন্দ্র মোদীর দর্পচূর্ণ, বঙ্গে মমতা ঝড়'

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের সংসদের নিম্ন-কক্ষ লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে গেলে কোনও দলকে ২৭২ টি আসন পেতে হয়। বিজেপি এককভাবে সেই সংখ্যা থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছে। তবে এনডিএ জোট সঙ্গীদের নিয়েই যে তাদের সরকার গড়তে হবে, সেই প্রসঙ্গ বুধবারের ভারতের সংবাদপত্রগুলিতে লেখা হয়েছে।
কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা শীর্ষ শিরোনামে লিখেছে ‘গণদেবতা’। তার নীচে মূল শিরোনামে লেখা হয়েছে 'কুর্সির পথে টানা ৩বার, দর্পচূর্ণ শরিক-নির্ভরতায়’।
প্রতিবেদনের প্রথম লাইনটা এরকম : “দর্পচূর্ণ করে জনতাই জনার্দন। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এই নিয়ে টানা তিনবার ক্ষমতায় আসার পথে এনডিএ সরকার। পাঁচবছরের পূর্ণ মেয়াদ পরপর দুবার শেষ করে এ ভাবে তৃতীয় বার ক্ষমতায় ফেরা গত ছ’দশকে প্রথম। কিন্তু বিজেপি একার শক্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না।“
এই প্রতিবেদনের পাশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি লম্বাকৃতি ছবি ছাপা হয়েছে, যেখানে তিনি দুই আঙ্গুল তুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন এবং তার ওপরে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে।
প্রথম পাতার অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এবং তার ভাইপো ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী – এরা দুজনেও দুই আঙ্গুল দিয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন, সেই ছবিও আছে।

End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন


ছবির উৎস, ANI
শীর্ষ প্রতিবেদনের পাশে এক কলমের একটি প্রতিবেদন রয়েছে আনন্দবাজারে, যার শিরোনাম: ‘পুনর্মানবো ভব’ বলছে যেন দেশের জনাদেশ।
লেখা হয়েছে “তাঁর ‘পরমাত্মার সন্তানের’ ভাবমূর্তিতে আজ বড় ধাক্কা দিল লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল। রাজনৈতিক শিবির কিছুটা হালকা চালে বলছে, এ যেন ‘পুনর্মানবো ভব’।
‘মোদীর ক্ষয়... দিদির জয়’
কলকাতার আরেকটি বাংলা পত্রিকা ‘এই সময়’ তাদের শীর্ষ শিরোনাম করেছে ‘মোদীর ক্ষয়... দিদির জয়’ ।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এর নিচে পরিসংখ্যান রয়েছে ভোটের, আর তারও নিচে পাশাপাশি তিনটি শিরোনাম ছেপেছে কাগজটি।
বড় অক্ষরে মূল শিরোনামে লেখা হয়েছে ‘নিরঙ্কুশ নন, রামধাক্কা রামরাজ্যেই’, মাঝের শিরোনাম পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল নিয়ে : ‘মমতা বঙ্গে ফুল ফোটালেন সেনাপতি অভিষেক’ আর একেবারে ডানদিকের শিরোনাম ‘আজ বৈঠকে টিম ইন্ডিয়া’।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জী এবং রাহুল গান্ধী – তিনজনের ছবিই রয়েছে তিনটি প্রতিবেদনের সঙ্গে।
প্রথম প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে যে কীভাবে ‘৪০০ পার’ এর যে স্লোগান বিজেপি দিয়েছিল, সেই আশা তাদের পূরণ হয় নি এবং আড়াইশোর গণ্ডিও একা বিজেপি পেরতে পারে নি।
পাশের চার কলমের খবরটি, যা পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল কেন্দ্রিক, সেখানে লেখা হয়েছে “মমতা-অভিষেকের যুগলবন্দীতে বঙ্গে ফেল মোদী-ম্যাজিক। দিদি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিয়েছে আর মোদী বাংলার গরিব মানুষের টাকা আটকে রেখেছেন – তৃণমূলের সুনির্দিষ্ট এই প্রচারের সামনেই ধূলিসাৎ হলো বিজেপির বাংলা জয়ের স্বপ্ন।“
কলকাতার আরেকটি কাগজ ‘বর্তমান’ অবশ্য জাতীয় ফলাফলের পরিবর্তে শীর্ষ শিরোনাম করেছে পশ্চিমবঙ্গের ফল নিয়ে।
তারা লিখেছে, বঙ্গে মমতা ঝড় ।
এর নিচে অবশ্য তারা এই উপ-শিরোনামও দিয়েছে ‘মোদী ম্যাজিক শেষ ভরসা এনডিএ’।
শিরোনামে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফলের প্রতিফলন দেখা গেলেও প্রতিবেদনের শুরু হয়েছে এভাবে : “পরাস্ত বিদ্বেষ-বিভাজন। প্রত্যাখ্যাত ধর্মের রাজনীতি। স্পষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বার্তা। আর সবথেকে বড় নৈতিক পরাজয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর।“


সরকার চালাতে জোট সঙ্গীদের দরকার
ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’ তাদের শীর্ষ প্রতিবেদনে লিখেছে যে বিজেপি সংখ্যায় পিছিয়ে আছে, সরকার চালাতে জোট সঙ্গীদের দরকার।
প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছেন মঙ্গলবার, কিন্তু তাকে নির্ভর করতে হবে জোট সঙ্গীদের ওপরে কারণ লোকসভার অর্ধেক আসনের লক্ষ্যমাত্রা ২৭২ টি আসনের থেকে ৩২টি আসন কম পেয়েছে বিজেপি।
“বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ২৯১ টি আসন পেতে চলেছে, অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আসন সংখ্যা ২৩৪। কংগ্রেস ২০১৯ সালে ৫২টি আসন পেয়েছিল আর এবার তারা জিতছে ৯৯টি আসনে,” লিখেছে ‘দ্য হিন্দু’।
ওই প্রতিবেদনে এও লেখা হয়েছে যে বিজেপি তাদের শক্তিশালী রাজ্যগুলিতে খারাপ ফল করেছে, উত্তরপ্রদেশ আর রাজস্থানে কম আসন পেয়েছে আবার পশ্চিমবঙ্গে বেশি আসন জেতার যে আশা করেছিল, তা-ও অধরা রয়ে গেছে।
তবে বিজেপি যেমনটা চেয়েছিল, ওড়িশায় প্রথমবারে মতো তারা ক্ষমতায় এসেছে (রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে) এবং লোকসভার ২১টি আসনের মধ্যে তারা ১৯টিতে জয়ী হয়েছে।

সঙ্গীদের ওপরে নির্ভর করতে হবে
ভারতের আরেকটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়া দুটি শীর্ষ শিরোনাম দিয়েছে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল সংক্রান্ত খবরের বিশ্লেষণে।
‘জ্যাকেট’, অর্থাৎ প্রথম পাতারও আগে যে অর্ধেক পৃষ্ঠায় খবর ছাপা হয় কাগজে, সেখানে তাদের শিরোনাম ‘এলএস কনস্টিটিউশন হ্যাজ চেঞ্জড’। এই বিশ্লেষণে তারা দেখিয়েছে যে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে যেভাবে ৩০৩ টি আসন পেয়ে বিজেপি ভারতকে গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিল, বিশেষত গোবলয়ের উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাত সম্পূর্ণভাবে আর মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের বেশিরভাগ অঞ্চলকে তাদের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসে, তা দেখে মনে হত যেন একটিই দল কর্তৃত্ব করছে পুরো দেশে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও গেরুয়া রঙের ছোঁয়া লেগেছিল। মঙ্গলবারের ফলাফল ওই ছবিটা বদলিয়ে দিয়েছে।
‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র মূল পত্রিকার প্রধান শিরোনামও স্বাভাবিক ভাবেই ভোটের ফল নিয়েই। তারা প্রধান খবরের শিরোনাম দিয়েছে ‘হ্যাট-ট্রিকি : এনডিএ ২৭২ পার, ইন্ডিয়া রেইজেস বার’। এই শিরোনামে একটু কথার কারসাজি থাকলেও তার নীচে যে উপ-শিরোনাম দেওয়া হয়েছে,
সেখানে স্পষ্টভাবেই লেখা হয়েছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জোট-সঙ্গীদের ওপরে নির্ভর করতে হবে বিজেপিকে।
খবরের শুরুতে লেখা হয়েছে নরেন্দ্র মোদী একটানা তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন ঠিকই, কিন্তু কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি আর তৃণমূল কংগ্রেস আশাতীত ফলাফল করায় ধাক্কা খেয়েছেন তিনি, যার ফলে লোকসভায় তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান নি।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া প্রথম পাতায় একটা ছবি ছেপেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ওপরে দলীয় প্রধান কার্যালয়ে তার ওপরে পুষ্পবৃষ্টি হতে দেখা যাচ্ছে আর পাশেই, একটি ছোট ছবি রাহুল গান্ধীর সহাস্য মুখ – তিনি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন।


ছবির উৎস, ANI
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ প্রথমপাতার ওপরের অর্ধেকটা জুড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে দুই তৃতীয়াংশের একটা আনতমস্তক ছবি ছেপে তার পাশে লিখেছে ‘ইন্ডিয়া কাটস মোদী ডাউন’।
এর নীচে পাশাপাশি দুটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ওই কাগজে। একটির শিরোনাম ‘ইলেক্টেড ইন নাম্বার্স : অ্যান ইন্সপায়ার্ড অপোজিশন’
প্রতিবেদনটি বেশ কড়া শব্দে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করে লিখেছে, ‘জনগণের শক্তি : উদ্ধতদের একটা স্বভাব হল নিজের আস্তানায় ফিরে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, যিনি মে মাসের মাঝামাঝি দাবি করেছিলেন যে তিনি শারীরবৃত্তীয় ভাবে নন, ঈশ্বর প্রেরিত, দেখা গেল আমাদের মতোই তিনিও একজন মানুষ যিনি আঙ্গুলের সামান্য ধাক্কাতেই কুঁকড়িয়ে যান।
তার পাশের খবরটি পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল নিয়ে। সেটির শিরোনাম ‘দিদি হ্যাজ বিজেপি অন দ্য ম্যাট, এগেইন’
প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছে যে প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট এবং ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২৯টি পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলায় বিজেপিকে পরাস্ত করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে দ্বিতীয়বার দেশের সবথেকে শক্তিশালী বিরোধী নেত্রী হিসাবে নিজের জমিকে শক্ত করেছেন মমতা ব্যানার্জী।“
সব সংবাদপত্রেই শীর্ষ শিরোনাম ছাড়া আরও বহু প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, ছবি, ম্যাপ এবং রেখাচিত্র দিয়ে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে রয়েছে নানা রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া এবং আজ বুধবার জাতীয় স্তরে কী কী রাজনৈতিক ঘটনা হতে চলেছে তারও পূর্বাভাস।








