নুরের আহত হওয়ার ঘটনা ঘিরে অস্থিরতা, সামনে আসছে নানা প্রশ্ন

ছবির উৎস, MD Abu Sufian Jewel/NurPhoto via Getty Images
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
সেনাবাহিনী ও পুলিশের লাঠিপেটায় গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুর আহতের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ঠিক এই ঘটনাগুলো যখন ঘটছে তার মাত্র একদিন আগেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
এমন অবস্থায় গণঅধিকার পরিষদ - জাতীয় পার্টি সংঘাত ইস্যু ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটির পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কী-না সেই আলোচনাও দেখা যাচ্ছে রাজনীতির আলোচনায়।
এমনকি বর্তমানে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনকে পেছানো বা ব্যহত করার একটি পরিকল্পিত উদ্দেশ্য থাকতে পারে এই হামলার পেছনে।
শনিবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবিসি বাংলাকে বলেছেন,"পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনকে ব্যাহত করার জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থির করার জন্য একটা মহল কাজ করছে।"।
তবে জামায়াত ইসলামী নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি এখনই ভাবছে না। তবে দলটি বলেছে যে, পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে কোনো না কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে।
যদিও গণঅধিকার পরিষদ শুক্রবারের ওই ঘটনার পর থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। যে কারণে তাদের দলের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
শুক্রবার রাতে নুরের ওপর হামলার ঘটনায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রোববারই বিএনপি জামায়াত ও এনসিপির সাথে বৈঠক করছেন প্রধান উপদেষ্টা।

ছবির উৎস, RAFIQUL ISLAM
রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর সেনাবাহিনী ও পুলিশের হামলায় আহত হন গত শুক্রবার রাতে। ওইদিন জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে দুই দফায় সংঘর্ষও হয় দল দুটির নেতাকর্মীদের মধ্যে।
বর্তমান সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদের প্রধানকে প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিপেটা করলে তিনি গুরুতর আহত করার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা দেখা যায়। যেখানে অনেকেই ওই হামলা ও মারধরের ঘটনাটিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টভাবেই বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির করার জন্য পরিকল্পিতভাবেই ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
নুরের ওপর হামলার ঘটনার জের ধরে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিক্ষোভও প্রদর্শন করে।
শুক্রবারের ওই ঘটনার পরদিন জাতীয় পার্টির ওই রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। গণঅধিকার পরিষদের মিছিল থেকেই হামলার ঘটনার অভিযোগও ওঠে।
স্বাভাবিকভাবেই এই বিষয়গুলো নিয়ে হঠাৎই রাজনীতিতে এক ধরনের গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "নুরের ওপর হামলাসহ গত তিন চারদিনে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎই এক ধরনের অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যেটিকে দেশের ভেতর বা বহিঃশক্তির ইন্ধনেও হতে পারে"।
এই ধরনের পরিস্থিতির পেছনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, সরকার চাইলেই পরিস্থিতিকে অন্যভাবে সামাল দিতে পারতো। কিন্তু সে রকম কোনো পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে তারা দেখছেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী মারুফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "সরকারের একক কোনো সেন্ট্রাল কমান্ড নেই। সরকারের নিজেদের ভেতরেই দুই ধরনের সিদ্ধান্ত। যা অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে"।
এটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলছেন, "একটি দলের প্রধানকে যখন আক্রমণ করা হয় তখন রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর মহলের অগোচরে তা হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আমরা দেখলাম এরপরই সরকারের কেউ কেউ নিন্দা জানাচ্ছে আবার চিকিৎসার দায়িত্ব নিচ্ছে"।
রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন তার কাছে এই প্রশ্নগুলোই করা হয়েছিল।
জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা চেষ্টা করতেছি। একটা কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, এখন আগুন ধরায়ে দেওয়ার আগেই যদি পুলিশ অ্যাকশনে যেতো তখন আপনারা বলতেন শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানে কেন বাধা দিলো"?
শুক্রবার রাতে ওই সংঘর্ষের ঘটনার পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ অধিদপ্তর থেকে পাঠানো একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, "মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা"এবং "সংগঠিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ" হয়েছে। ফলে "জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়"।

ছবির উৎস, Mamunur Rashid/NurPhoto via Getty Images
নির্বাচন নিয়ে সংকট আছে?
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা গত কয়েকমাস ধরে দেশের রাজনীতিতে নানা প্রশ্ন ছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোন ঘোষণা না থাকায় গত কয়েকমাস বিএনপিসহ কয়েকটি দল এ নিয়ে নানা শঙ্কাও প্রকাশ করেছিল।
তবে গত পাঁচই অগাস্ট প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
রোডম্যাপ ঘোষণার পরদিনই জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ ঘিরে নুরুল হক নুরসহ দলটির নেতাকর্মীদের ওপর সেনাবাহিনী ও পুলিশের হামলার পর আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়েও শঙ্কার প্রশ্ন তুলছে বিএনপিসহ কোনো কোনো রাজনৈতিক দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই শঙ্কাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বরং এর পেছনে কিছু যুক্তিও তারা তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার মনে করেন, ঠিক এই মুহূর্তে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে কোনোভাবে নির্বাচনকে প্রলম্বিত করার একটা উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে এই সংঘর্ষ এই পরিকল্পনার অংশ বলেই তিনি ধারণা করছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত যদি নির্বাচনকে বানচাল বা বিলম্বিত করার জন্যই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় সেটিতে দিন শেষে কেউ লাভবান হবে না বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা ধরনের অস্থিরতা হবে। যদি এটাকে ঘিরে নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করা হয় এবং সেই প্রচেষ্টা সফল হয়, নির্বাচন না হয় তাহলে তো কেউ লাভবান হবে না। পুরো দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে"।
তিনি মনে করছেন যে, সেরকম কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণঅভ্যুত্থানের মুল স্টেকহোল্ডাররাই।

নির্বাচনের আগে আলোচনায় জাতীয় পার্টি
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।
আওয়ামী লীগের অধীনে ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতসহ অনেক রাজনৈতিক দল অংশ না নিলেও সেবার নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি।
ওই নির্বাচনে গঠিত সংসদে একদিকে যেমন সংসদে বিরোধী দল ছিল জাতীয় পার্টি, অন্যদিকে তাদের কয়েকজন আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায়ও ছিলেন। যা নিয়ে দেশের রাজনীতিতে নানা হাসি তামাশাও ছিল।
এরপর ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সাথে অনেকটা 'সমঝোতা' করেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেখা যায়। সংসদের বিরোধী দলেও দেখা যায় দলটিকে।
শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও যখন বিএনপি বয়কট করে আসছিল তখন জাতীয় পার্টির নেতারা সে সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে 'সঙ্গ' দিতে দেখা গেছে।
যে কারণে শেখ হাসিনা সরকার পতনের গত এক বছরের রাজনীতির মাঠে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে আওয়ামী লীগের এক সময়ের মিত্র এই দলটি।
গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবিতে গণঅধিকার পরিষদকে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করতে দেখা গেছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায়ও গণঅধিকার পরিষদ-জাতীয় পার্টির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে একটি বিক্ষোভ মিছিল থেকে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কারণে তারা বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
অন্যদিকে রোববার একটি বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় পার্টি বলেছে, জাতীয় পার্টি কখনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেনি, তাই সন্ত্রাস বিরোধী আইনে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা বা কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার আইনগত দাবী উঠতে পারে না। আরপিও অনুযায়ী যেসকল কাজ করলে একটি দলের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে, এমন কোন কাজ জাতীয় পার্টি কখনই করেনি। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগও নেই। যারা জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবী তুলছে তাদের এ দাবী অযৌক্তিক।''
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকার পরও জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধ নিয়ে গণঅধিকার পরিষদ কেন এই তৎপরতা দেখাচ্ছে?
এই প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধে আগ্রহ হয়তো অনেক দলের আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাধবে কে। এই দায়িত্বটা হয়তো গণঅধিকার পরিষদই পালন করছে"।
"জাতীয় পার্টির ওপর আওয়ামী লীগ ভর করতে পারে বলে মনে করেছে গণঅধিকার পরিষদ। এটা বুঝতে পেরে সম্ভবত তারা বেশি সক্রিয়", যোগ করেন মি. আহমেদ।
কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থা চাইলেই কী জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল বানাতে পারে কী-না এই বিষয়টিকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
তারা মনে করেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যদি এমন ভূমিকা নিয়েও থাকে তা খুব একটা হালে পানি পাবে না।








