বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায় কতটা অস্বস্তিতে ভারত

ছবির উৎস, @ChiefAdviserGoB
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
এখন থেকে মাসছয়েক আগেকার কথা, মাস্কাটে ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সের অবকাশে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বৈঠকে বসেছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে।
আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট বা 'সার্ক'কে পুনরুজ্জীবিত করে তোলার প্রসঙ্গ তোলা হয়, যেটি সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সুপরিচিত অবস্থান।
এর আগে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও একাধিকবার সার্ককে জিইয়ে তোলার কথা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, যে প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম প্রায় এক দশক হলো স্থবির হয়ে রয়েছে।
কিন্তু মাস্কাটের বৈঠক মি জয়শংকর পরিষ্কার জানিয়ে দেন, সার্কের কথা আপাতত না তোলাই ভালো – কারণ কোন দেশটির কারণে আর কেন সার্ক অচল হয়ে আছে, সেটা জোটের সদস্য দেশগুলোর ভালো মতোই জানা।
শুধু তাই নয়, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলা মানে সেটাকে ভারত যে 'পাকিস্তানের সুরে সুর মেলানো' হিসেবেই দেখবে, সেটাও বলেন মি জয়শংকর।
এর দিনকয়েক বাদেই দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, "আমরা বাংলাদেশকে আরও বলেছি, তারা যেন সন্ত্রাসবাদকে 'নর্মালাইজ' করার, বা স্বাভাবিক ঘটনা বলে তুলে ধরার কোনো চেষ্টা না করে!"
ভারত যেখানে সার্কের হয়ে কথা বলাকেও পাকিস্তানের হয়ে সওয়াল করা হিসেবে দেখছে – সেখানে ঢাকা ও ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা যে দিল্লিকে অস্বস্তিতে ফেলছে, তা সহজেই অনুমেয়!

ছবির উৎস, MEA INDIA
মাস্কাটে সেই বৈঠকের পরবর্তী কয়েক মাসে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ শুধু কাছাকাছিই আসেনি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি বা যোগাযোগ – প্রায় সব খাতেই দুই দেশের সহযোগিতা নিবিড় থেকে নিবিড়তর হয়েছে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সেই ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশ বহু বছরের মধ্যে প্রথমবার পাকিস্তান থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করে, দুই দেশের মধ্যে আবার শুরু হয় সরাসরি বাণিজ্য।
এরপর উদ্যোগ নেওয়া হয় ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করার এবং ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে ডিরেক্ট ফ্লাইট চালু করার। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও জানায় পাকিস্তান।
দু'দেশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারাও একে অপরের দেশে যেতে শুরু করেন, সেই সব সফরের ছবিও প্রকাশ করা হতে থাকে।
এই ধারাবাহিকতাতেই সদ্য বাংলাদেশ সফর করে গেলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা উপপ্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার, যিনি তার সফরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-সহ অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে তো বটেই – বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি-র শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন।
এমন কী ইশহাক দার বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে একাত্তর বা গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়েও কথা বলতে দ্বিধা করেননি, এটিকে একটি 'মীমাংসিত বিষয়' বলে দাবি করে তিনি বাংলাদেশিদের 'হৃদয় পরিষ্কার করে' সামনে এগিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ঘটনাপ্রবাহের এই গতি আর আকস্মিকতা ভারতকে রীতিমতো উদ্বেগে ফেলেছে।
পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর কিংবা করাচি থেকে চট্টগ্রামে পণ্যের চালান নিয়ে এর আগে যখনই ভারত সরকারকে প্রশ্ন করা হয়েছে, মুখপাত্র বাঁধাধরা জবাব দিয়েছেন, "আমাদের নিরাপত্তা পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন যে কোনো ডেভেলপমেন্টের দিকেই আমরা সতর্ক নজর রাখি।"
কিন্তু ভারতের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের অনেকেই এখন ঢাকা-ইসলামাবাদের এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ তাদের স্বার্থকে কীভাবে ব্যাহত করতে পারে এনিয়ে খোলাখুলি কথা বলছেন।
ভারতের প্রধান সেনাধ্যক্ষ (চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ) জেনারেল অনিল চৌহান পর্যন্ত গত মাসে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের (নিরাপত্তা) স্বার্থের ক্ষেত্রে এক ধরনের 'অভিন্নতা' দেখা যাচ্ছে – ভারতের জন্য যার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
জেনারেল চৌহান বলেন, "এই তিনটি দেশের ক্ষেত্রে যে সম্ভাব্য 'কনভার্জেন্স অব ইন্টারেস্ট' দেখা যাচ্ছে, তা ভারতের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ডায়নামিক্সের ওপর বড় প্রভাব ফেলতেই পারে!"
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কাছাকাছি আসাকে ভারত এখন ঠিক কীভাবে দেখছে, কোন কোন ঘটনা তাদের বিচলিত করছে এবং কেন – এই প্রতিবেদনে তারই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা আসছে বারবার
ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সরকারি নীতি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি যে বেশ শান্ত এবং স্বশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব যে ক্ষীয়মান, তার পেছনে শেখ হাসিনা সরকারের বড় ভূমিকা ছিল - এ কথা সুবিদিত।
কিন্তু ভারত মনে করছে, এখন এই পরিস্থিতি আবার পাল্টানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ ভিনা সিক্রি এমন একটা সময় ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার ছিলেন (২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল), যখন বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার ক্ষমতায় এবং তখনও ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
ভিনা সিক্রি যখন ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত, তখনই ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দশটি ট্রাকে করে অস্ত্র পাচারের ঘটনা ঘটেছিল – যা আলফা-সহ ভারতেরই বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর জন্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়।
মিস সিক্রি মনে করেন, আজকের ঢাকায় ড. ইউনূস ও ইশহাক দারের করমর্দনের যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে সেটা একরকম 'ডেজাঁ ভু' মোমেন্ট – কারণ ভারত অবিকল এই ধরনের পরিস্থিতি আগেও পার করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসিকে তিনি বলেছেন, "সে সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গিরা বাংলাদেশের মাটিতেই ঘাঁটি তৈরি করে তৎপরতা চালাত।"
"আমরা তখন বাংলাদেশ সরকারকে বহুবার এই সব প্রশিক্ষণ শিবিরের তালিকা, লোকেশন ও নানা সাক্ষ্যপ্রমাণও দিয়েছি", জানাচ্ছেন তিনি।
তখনকার বাংলাদেশ সরকার অবশ্য কখনোই ভারতের ভাষায় এই সব 'জঙ্গি শিবিরের' অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।
এসব স্বশস্ত্র গোষ্ঠির সাথে বরাবরই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করে এসেছে ভারত।
কিন্তু ২০০৯ সালের গোড়ায় শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর অরবিন্দ রাজখোয়া বা অনুপ চেতিয়ার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অনেক শীর্ষ নেতাকেই ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তবে গত এক বছরে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের আনাগোনা আবার বেড়েছে, তাতে ভারতের নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজিস্টদের কপালে আবার দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে যথারীতি।
সামরিক পর্যায়েও পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে তাই ভারতের জন্য 'খুব বড় সিকিওরিটি কনসার্ন' বলে মনে করছেন ভিনা সিক্রি।

ছবির উৎস, Getty Images
সেনাধ্যক্ষ অনিল চৌহান সম্প্রতি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় যে 'ঝুঁকি'র কথা বলেছেন, সেটাও সম্ভবত এদিকে ইঙ্গিত করেই।
ভারত ও বাংলাদেশের চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ স্থল-সীমান্তের বেশির ভাগটাই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে, এবং সেটা একেবারেই নিশ্ছিদ্র নয়। কাজেই এই সব ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মাটিকে আবার ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের চেষ্টা হতে পারে বলে মনে করছেন দিল্লিতে অনেক পর্যবেক্ষক।
বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও পাকিস্তানের মধ্যে আইএসআই-এর মধ্যে সহযোগিতা ও সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরি হয় কি না বা তা কতদূর প্রসারিত হয়, সে নিয়েও আলোচনা রয়েছে ভারতে।
ভূরাজনীতির দৃষ্টিতে এই সমীকরণের গুরুত্ব কী?
লন্ডন-ভিত্তিক জিওপলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট প্রিয়জিৎ দেবসরকার বাংলাদেশ ও ভারত-সহ দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক রাজনীতি ও কূটনীতি নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন দীর্ঘদিন ধরে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক নৈকট্যকে তিনি আবার দেখতে চান একটু ভিন্ন আঙ্গিকে।
"আমি মনে করি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের 'ওয়ার্ল্ডভিউ'-এর সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত ও পাকিস্তানকে একই হাইফেনে জুড়ে তিনি যেভাবে দুটো দেশকে একই দৃষ্টিতে দেখানোর চেষ্টা করছেন, এটা তারই একটা এক্সটেনশন বা সম্প্রসারণ।"

ছবির উৎস, Getty Images
"মানে ট্রাম্প এই অঞ্চলে ভারতকে তাদের প্রধান মিত্র বা সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে মোটেই তুলে ধরতে চান না, বরং চান পাকিস্তান, ভারত ও সেই সঙ্গে বাংলাদেশকেও 'ইকুয়াল ফুটিং'-এ বা এক কাতারে ফেলতে", বিবিসিকে বলছিলেন মি দেবসরকার।
ফলে ঢাকা ও ইসলামাবাদ যাতে নিজেদের মধ্যে কাছাকাছি আসতে পারে, সেই প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটনেরও প্রচ্ছন্ন সায় বা সমর্থন আছে বলে তিনি যুক্তি দিচ্ছেন।
বস্তুত বাংলাদেশকে আমেরিকা যে দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি 'ভারতের চোখ দিয়ে' আর দেখতে রাজি নয় – এবং বাংলাদেশের ব্যাপারে তারা নিজেরাই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে – বাইডেন প্রশাসনের আমলেই সেটা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে মার্কিন ভূমিকার মধ্যে দিয়েও তাদের সেই অবস্থান স্পষ্ট ছিল।
এখন ট্রাম্পের আমলে ঢাকা ও ইসলামাবাদকে কাছাকাছি আনার মধ্যে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াতে আমেরিকার কৌশলের পরের ধাপটি রূপায়িত হচ্ছে বলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করছেন।
প্রিয়জিৎ দেবসরকারের মতে, পাকিস্তানও এই প্রস্তাব লুফে নিয়েছে – কারণ এই পদক্ষেপ তাদের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

"বিগত বহু দশক ধরে পাকিস্তানের ঘোষিত নীতিই হলো, 'ব্লিড ইন্ডিয়া উইথ আ থাউজ্যান্ড কাটস' – মানে যত গুলো সম্ভব ধারালো আঘাত করে ভারতকে রক্তাক্ত করো। ভারত মনে করে মুম্বাই, উরি, পুলওয়ামা বা পহেলগাম তাদের সেই নীতিরই প্রতিফলন।"
"ভারতের পশ্চিম সীমান্তে তাদের সে চেষ্টা অব্যাহতভাবেই চলছে, এখন বাংলাদেশের দিক থেকে ভারতের পূর্ব সীমান্তেও যদিই একই কাজ করা যায় তাহলে পাকিস্তানের লাভ ছাড়া ক্ষতি তো কিছু নেই", বলছিলেন মি. দেবসরকার।
ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান ও উত্তর সীমান্তে চীনের সঙ্গে সম্পর্কে উত্তেজনা ও কমবেশি সংঘাত চলছে বহুকাল ধরেই। এখন পূর্ব সীমান্তে এতদিন ধরে অপেক্ষাকৃত শান্ত বাংলাদেশ ফ্রন্টিয়ারও সেই তালিকায় যুক্ত হলে ভারতের জন্য সেটা হবে বিরাট এক দুশ্চিন্তার কারণ।
'লড়াই এখানে ভাবধারা ও আদর্শের'
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কাছাকাছি আসাটা ভারতের জন্য শুধু সামরিক বা নিরাপত্তাগত উদ্বেগের প্রশ্ন নয়, এর মধ্যে একটি 'আদর্শিক ও চিন্তা-চেতনাগত দুর্ভাবনার জায়গা' আছে বলেও মনে করেন দিল্লির কোনো কোনো বাংলাদেশ ওয়াচার।

ছবির উৎস, Getty Images
এমনই একজন বর্ষীয়ান পর্যবেক্ষক হলেন সাবেক আইপিএস অফিসার শান্তনু মুখার্জি, যিনি ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মরিশাসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদেও ছিলেন এই বিশ্লেষক।
মি মুখার্জি বিবিসিকে বলছিলেন, পাকিস্তান যে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দিয়ে তাদের দেশে পড়াতে নিয়ে যেতে চাইছে – কিংবা বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে চাইছে – ভারতের জন্য সেটা দুশ্চিন্তার।
"ভারত এতদিন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের শান্তিনিকেতনে বা বরোদার এম এস ইউনিভার্সিটিতে পড়ার বৃত্তি দিয়েছে, তারা ভারতের সংস্কৃতিতে ও রাবীন্দ্রিক ভাবধারায় দীক্ষিত হয়েছেন এবং সেই চিন্তাধারা নিজের দেশেও নিয়ে গেছেন।"
"পাকিস্তান এখন ঠিক সেই কাজটাই করতে চাইছে তাদের মতো করে। তারা জিন্নাহ বা আল্লামা ইকবালের ডকট্রিনে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে দীক্ষিত করতে চাইছে, যেটা রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অবশ্যই এটার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী", বিবিসিকে বলছিলেন শান্তনু মুখার্জি।
দিল্লিতে বিশ্লেষকরা মনে করেন, আজও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হলো একাত্তর - যে যুদ্ধে ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল, এক সাথে রক্ত দিয়েছিল।
কিন্তু একাত্তরে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের মতো বিষয়গুলোকে হালকা করে দেখানো কিংবা সেই যুদ্ধকে 'ভারতের ষড়যন্ত্র' হিসেবে তুলে ধরার যে পাকিস্তানি ন্যারেটিভ, সেটাই আজকের বাংলাদেশে প্রাধান্য পাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।

শান্তনু মুখার্জি আরও বলছিলেন, "ইশহাক দার বাংলাদেশে এসে কোন কোন দলের সঙ্গে দেখা করলেন? বিএনপি-র সঙ্গে, জামায়াতের সঙ্গে আর ছাত্রদের নতুন দল এনসিপি-র সঙ্গে।"
'ধর্মনিরপেক্ষ' কোনো দলের সঙ্গে তাকে কিন্তু কথা বলতে দেখননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনে জিতে যে দল বা জোটই ক্ষমতায় আসুক, তারা যাতে পাকিস্তানের 'বয়ান'কেই প্রাধান্য দেয় এবং আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তান-চীনের দিকেই ঝোঁকে – সেটা নিশ্চিত করাই এই সব আলোচনার লক্ষ্য ছিল বলে মি মুখার্জি মনে করেন।
সবমিলিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা আগাগোড়াই ভারতের স্বার্থবিরোধী হতে যাচ্ছে বলে দিল্লীতে একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে।








