কোটা আন্দোলন, সহিংসতা, কারফিউয়ের খবর যেভাবে এসেছে ভারতের গণমাধ্যমে

কলকাতার কয়েকটি সংবাদপত্রে যেভাবে বাংলাদেশের সহিংসতার খবর দেওয়া হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, কলকাতার কয়েকটি সংবাদপত্রে যেভাবে বাংলাদেশের সহিংসতার খবর দেওয়া হয়েছে

প্রতিবেশী বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সেখান থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, প্রায় দেড়শো মৃত্যু এবং অবশেষে কারফিউ, ঢাকার রাস্তায় সেনা ট্যাঙ্ক - এ সবই গত এক সপ্তাহে পড়েছেন বা দেখেছেন ভারতের নাগরিকরা।

এর আগে অবশ্য কয়েক সপ্তাহ ধরে যে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন চলছিল ঢাকা সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, সে সব অবশ্য আগে বিশেষ জানতেন না ভারতের পাঠক-দর্শকরা।

কারণ মোটামুটিভাবে ১৬ই জুলাই আন্দোলনে ছয় জনের মৃত্যুর আগে গুরুত্ব দিয়ে এই আন্দোলনের খবর দেয়ইনি ভারতের মিডিয়া।

গত সপ্তাহের মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই ছয় জনের মারা যাওয়ার খবর পরের দিন ভারতের কাগজে প্রকাশিত হয়।

আর তখন থেকেই লাগাতার বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন, সহিংসতার খবর প্রকাশ করেছে কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা পত্রপত্রিকা আর টিভি চ্যানেলগুলি।

জাতীয় স্তরের দৈনিক এবং ইংরেজি ও হিন্দি টেলিভিশনও মোটামুটিভাবে সংঘর্ষ-সহিংসতার খবর গুরুত্ব সহকারেই দেখিয়েছে বলে মনে করছেন গণমাধ্যমের ওপরে নজর রাখেন, এমন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন বাংলাদেশের গত এক সপ্তাহের ঘটনা প্রবাহের প্রতিবেদনের সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ভারসাম্য রেখেই খবর প্রকাশ করেছে।

সেই সব প্রতিবেদনে যেমন সর্বশেষ ঘটনার খবর থেকেছে, তেমনই ছাপা হয়েছে কোটা আন্দোলনের প্রেক্ষিত, ছাত্ররা যেভাবে সংগঠিত হয়েছিল সেই সব তথ্যও।

কলকাতার খবরের কাগজ বাংলাদেশের গতএক সপ্তাহের খবরাখবরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে - প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলকাতার খবরের কাগজ বাংলাদেশের গতএক সপ্তাহের খবরাখবরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে - প্রতীকী ছবি

তবে ভারতের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশের মধ্যে বাংলাদেশের এই আন্দোলনকে ‘ভারত-বিরোধিতার আন্দোলন’ এবং ‘আওয়ামী লীগ বিরোধী’ বলে যে ধরনের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে, তার একটা আংশিক প্রতিফলন কিছু কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও পড়েছিল বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

কলকাতার গণমাধ্যমে কী দেখানো হয়েছে

কলকাতার খবরের কাগজগুলিতে বাংলাদেশের কোটা সংস্কারের আন্দোলন প্রথম পাতায় জায়গা পেতে শুরু করে গত সপ্তাহের শুক্রবারের কাগজে।

তার আগের দিনই সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতায় অন্তত ২৫ জন মারা গিয়েছিলেন বলে বিবিসি বাংলা সংবাদ প্রকাশ করেছিল।

কলকাতার খবরের কাগজে অবশ্য সংবাদ সংস্থা এএফপি-র দেওয়া মৃতের সংখ্যাই উল্লেখ করেছিল যে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে আগের দিন। খবরের সঙ্গে বড় করে ছবিও দিয়েছিল কলকাতার কাগজগুলি।

মূল ধারার সংবাদ পত্র ছাড়াও বিভিন্ন বাংলা সংবাদ পোর্টালও নিয়মিতই বাংলাদেশের খবর দিয়েছে।

তিন চার দিন প্রথম পাতার শীর্ষ সংবাদ কখনও বা দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ হিসাবে উঠে এসেছিল ঢাকা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার সংঘর্ষের খবর।

পাশাপাশি কয়েকটি কাগজে বাংলাদেশ থেকে কোনওভাবে যারা ভারতে ফিরে আসতে পেরেছেন, তাদের দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানও ছাপা হয়েছিল।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে সংবাদ সংস্থা এবং বিবিসি বাংলার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দেওয়া খবরকেই সূত্র হিসাবে উল্লেখ করে, অথবা কখনও তা না করেই কলকাতার একাধিক বাংলা কাগজ সংবাদ প্রকাশ করেছে।

কলকাতার পত্রপত্রিকায় আবু সাঈদের মৃত্যুর ঠিক আগের এরকম ছবিও ছাপা হয়েছে

ছবির উৎস, SHARIER MIM

ছবির ক্যাপশান, কলকাতার পত্রপত্রিকায় আবু সাঈদের মৃত্যুর ঠিক আগের এরকম ছবিও ছাপা হয়েছে

প্রতিবেদনগুলিতে ভারসাম্য কি থেকেছে?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক স্নেহাশিস সুর বলছিলেন, “গত সপ্তাহের আগে পশ্চিমবঙ্গের পাঠকরা ঠিক জানতে পারেননি যে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নিয়ে কী ঘটছে। যখন আন্দোলনের সঙ্গে সহিংসতা-সংঘর্ষ এল, তখন থেকে এখানকার পাঠক-দর্শকরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হতে থাকলেন, নিয়মিত আপডেট পেতে থাকলেন।"

“ওই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা আর সংঘর্ষ যখন শুরু হল, পুলিশ-র‍্যাব এবং অবশেষে সেনা নামল, তখন ঘটনার গুরুত্ব এবং ব্যাপ্তি অনেক বেড়ে যায়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সব বাংলা-ইংরেজি দৈনিক এবং টেলিভিশন চ্যানেল সেই সব খবর দেখিয়েছে।"

"ঘটনাস্থলের সব ছবি, ভিডিও-ও এসেছে সর্বশেষ আপডেট হিসাবে। আবার প্রতিবেদন বলা বা লেখার সময়ে কাগজ ও টিভিগুলি কিন্তু পুরো ঘটনার একটা প্রেক্ষিত দেওয়ারও চেষ্টা করেছে। সেই ২০১৮ থেকে শুরু করে কী কী ঘটেছে, পূর্বাপর প্রেক্ষিত সে সবই জানানোর চেষ্টা করেছে এখানকার সংবাদমাধ্যম”, বলছিলেন মি. সুর।

তার কথায়, “প্রতিবেদনগুলিতে ছাত্র এবং সরকার – উভয় পক্ষেরই বক্তব্য থেকেছে। যেহেতু এটা একটা অন্য দেশের ঘটনা, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দিকে খেয়াল রেখে দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা রেখেছে কলকাতার কাগজ আর টিভিগুলি। তাদের প্রতিবেদনেও ভারসাম্য বজায় ছিল বলেই আমার মনে হয়েছে।“

তবে তথ্যচিত্র নির্মাতা ও মওলানা ভাসানী গবেষক সৌমিত্র দস্তিদার বলছিলেন, “মোটের ওপর ভারসাম্য রেখেই এখানকার কাগজ ও টিভিগুলি প্রতিবেদন করেছে এটা ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি বেশ কিছু প্রশ্নও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।"

"যেমন নিরাপত্তা বাহিনীগুলির ভূমিকা বা কোটা সংস্কার আন্দোলন শুধুই কি ছাত্রদের দাবি না কি শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, এরকম প্রশ্নও কলকাতার গণমাধ্যমের একাংশে তোলা হয়েছে, যদিও সেখানেও ভারসাম্য রেখেই সেই সব প্রশ্ন তারা তুলেছে“, জানান তিনি।

জাতীয় টিভি চ্যানেল ও দৈনিকগুলিতেও বাংলাদেশের সংঘর্ষ-সহিংসতার খবর গুরুত্ব পেয়েছে - প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় টিভি চ্যানেল ও দৈনিকগুলিতেও বাংলাদেশের সংঘর্ষ-সহিংসতার খবর গুরুত্ব পেয়েছে - প্রতীকী ছবি

ভারতের জাতীয় গণমাধ্যম কীভাবে দেখেছে

কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা-ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহকে জাতীয় স্তরের গণমাধ্যমের থেকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

তবে গত এক সপ্তাহে ঢাকা সহ বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যা হয়েছে, তাকে কলকাতার কাগজগুলির মতোই খুবই গুরুত্ব দিয়েছিল দিল্লি কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম।

প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি ও দিল্লির সিনিয়র সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী জানাচ্ছিলেন যে সেখানকার ইংরেজি গণমাধ্যম শুধু নয়, হিন্দি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার সংবাদমাধ্যমও বাংলাদেশে ঘটনাক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে।

তার কথায়, “ওইসব পত্রিকা ও টিভিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগই প্রকাশ পেয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। কোনও কোনও গণমাধ্যমে ছাত্রদের দাবিগুলির প্রতি সরাসরি সহানুভূতিও দেখানো হয়েছে।"

"তবে ইংরেজি ও হিন্দি গণমাধ্যমের একটা অংশে এটা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে আন্দোলনের রাশটা ধীরে ধীরে ছাত্রদের হাত থেকে চরমপন্থীদের হাতে চলে যাচ্ছে।"

“বাংলাদেশে কোনও অস্থিরতা তৈরি হলে যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে একটা আশঙ্কা তৈরি হয়, সে কারণেই এখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে একটা উদ্বেগ দেখা গেছে”, বলছিলেন গৌতম লাহিড়ী।

বাংলার মতোই জাতীয় গণমাধ্যমও মূলত নির্ভর করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলির পাঠানো তথ্যের ওপরে।

অল্ট নিউজ ধরে ফেলে একটি ভুয়ো খবর

ছবির উৎস, Altnews

ছবির ক্যাপশান, অল্ট নিউজ ধরে ফেলে একটি ভুয়ো খবর

ভুয়ো খবরও ছড়িয়েছে

একটা নামী সংবাদ সংস্থার উত্তর পূর্ব ভারতের জন্য যে ওয়েবসাইট আছে, সেখানে তারা একটা বড় ভুয়ো খবর দিয়ে ফেলেছিল।

ভুয়ো খবর খুঁজে বের করার পোর্টাল অল্ট নিউজ ওই ভুয়ো খবরটি ধরে ফেলে।

ওই ইংরেজি সংবাদ পোর্টালে ‘নির্ভরযোগ্য সূত্র’ উল্লেখ করে লেখা হয় যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রবিবার ২১শে জুলাই ঢাকা থেকে বিমানে চাপিয়ে কোনও এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অল্ট নিউজ ওই প্রতিবেদনটির উল্লেখ করে জানায় যে তাতে বলা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে তার বাসভবন থেকেই বিমানে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য টুইট করা ওই খবরটি তুলে নেওয়া হয়। যদিও অল্ট নিউজ বলছে ওই পোর্টালের টুইট বহু মানুষ শেয়ারও করেছিলেন। ফেসবুকে কিছু পোস্ট এখনও রয়ে গেছে।

অল্ট নিউজ জানাচ্ছে, ঘটনাটা যদি সত্যিই হত, তাহলে অন্য সমস্ত সংবাদমাধ্যমে শীর্ষ সংবাদ হিসাবে এই খবর চলে আসত।

তাদের আরও অবাক করেছে যে শেখ হাসিনাকে বিমানে চাপিয়ে বাসভবন থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো তথ্য পুরো প্রতিবেদনের চতুর্থ অনুচ্ছেদে বেশ কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের পরে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে যে ভিডিওটি দিয়েছিল ওই পোর্টাল, সেখানেও এই বিষয়টির কোনও উল্লেখ নেই।

অল্ট নিউজের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে যে এই বিষয়গুলি লক্ষ্য করার পরে তারা সেদিন শেখ হাসিনার কর্মসূচী খুঁজে বার করে এবং জানতে পারে যে সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে তিনি সেদিন একটি বৈঠক করেছেন।

এই বৈঠকের কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ছবি সহ প্রতিবেদন করেছে। একই প্রতিবেদন করেছে বাংলা সংবাদ পোর্টাল ‘দ্য ওয়াল’ও।

পরবর্তীতে ভারতে বাংলাদেশের দূতাবাসও খবরটির প্রতিবাদ জানায় এবং ২২শে জুলাই ওই ইংরেজি পোর্টাল ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয়।

এছাড়া আরও বেশ কিছু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ভিডিও মিথ্যা তথ্য দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও জানা যাচ্ছে।

তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার বলছিলেন, “বেশ কিছু চ্যানেলের প্রতিবেদনে বা কিছু সামাজিক মাধ্যমে বহু আগেকার ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে এটা দেখানোরও চেষ্টা হয়েছে যে এই আন্দোলন আসলে ভারত-বিরোধী আন্দোলন।“