ভারতে জনগণনা বন্ধ কিন্তু জাতিসংঘ বলছে দেশটি এ বছরই চীনকে ছাড়াবে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
চলতি বছরের মাঝামাঝি নাগাদ ভারত জনসংখ্যায় চীনকে ছাপিয়ে যাবে বলে জাতি সংঘের সর্বশেষ তথ্য জানাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা ঠিক কত তা কি কেউ জানে কারণ গত ১২ বছর ধরে সেদেশে জনগণনাই হয়নি।
ভারতে প্রতি দশ বছর অন্তর জনগণনা হয়ে আসছে ১৪০ বছর ধরে। কিন্তু ২০১১ -র পরে ২০২১ সালে সেই জনগণনা আর হয় নি। করোনা সংক্রমণের কারণ দেখিয়ে জনগণনা পিছিয়ে দেওয়া হয় যদিও নির্বাচন থেকে শুরু করে বড় বড় জমায়েত সবই হচ্ছে। এখন বলা হচ্ছে ২০২৪ সালে জনগণনা হতে পারে।
জাতিসংঘের অধীন ইউএনএফপিএ আভাস দিচ্ছে এ বছর জুন মাস নাগাদ ভারতের জনসংখ্যা হবে ১৪২ কোটিরও বেশি, যা চীনের জনসংখ্যার থেকে ২৯ লক্ষ বেশি।
তবে জনগণনা না হওয়ার কারণে এই সংখ্যা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি আছে। আর সেই গরমিলের কথা স্বীকার করেছে জাতিসংঘও।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের পপুলেশন এস্টিমেটস এন্ড প্রোজেকশানের প্রধান প্যাট্রিক গেরল্যান্ড বলছেন, “ভারতের বাস্তব জনসংখ্যা কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে একটা অনুমান মাত্র।“
“প্রকৃত, সরকারী তথ্য তো ভারত থেকে পাওয়া যায় নি,” মন্তব্য মি. গেরল্যান্ডের।

ছবির উৎস, Getty Images
১৪০ বছরে প্রথমবার জনগণনা স্থগিত
ভারতে প্রথমবার জনগণনা হয়েছিল ১৮৮১ সালে। তারপর থেকে প্রতি দশ বছরে একবার করে জনগণনা করা হয়।
প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা, পাকিস্তান আর চীনের সঙ্গে দুবার যুদ্ধ – কোনও সময়েই জনগণনা বন্ধ করা হয় নি।
২০১৯ সালে জনগণনার প্রাথমিক কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের গোড়ায় করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরে গেজেট বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তা স্থগিত করা হয়।
জনগণনার তথ্যে যে শুধু জনসংখ্যা থাকে তা নয়। দেশের প্রতিটা বাড়িতে গিয়ে সংগ্রহ করা তথ্য থেকে তাদের আয়, শিক্ষা, সাক্ষরতা, সম্পত্তি, স্বাস্থ্য – সবকিছুর তথ্য থাকে।
সেই তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই কোথায় কত স্কুল বা হাসপাতাল দরকার, বাজেটে কোন খাতে কত অর্থের সংস্থান রাখা দরকার সেসব যেমন নির্ধারিত হয়, তেমনই জনগণনার তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় সংসদীয় আসনের সীমানাও।
তবে জনসংখ্যার একটা প্রোজেকশান সরকার থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, যার ভিত্তিতেই সব পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে ভারতে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন যে জনগণনা তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই সরকার উন্নয়নমূলক পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করে, তাতে অর্থের সংস্থান করে। কিন্তু নিখুঁত সরকারী তথ্য না থাকায় সেই সব পরিকল্পনাতে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিত বসুর কথায়, “আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জনগণনা না হওয়া একটা সমস্যা তো বটেই। কিন্তু সরকার একটা উপায় বার করেছে, জনসংখ্যার একটা প্রোজেকশান করা হয়েছে। সব সরকারী কাজ এখন সেটার ওপরে ভিত্তি করেই চলছে। কিন্তু জনগণনায় যত বিস্তারিত তথ্য থাকে দেশের মানুষের সম্বন্ধে, তা তো আর ওই প্রোজেকশানে নেই। সেখানে শুধু নারী পুরুষ আর মোট জনসংখ্যার তথ্য দেওয়া আছে।"
“বিস্তারিত জনগণনার তথ্যে যেমন তপশীলি জাতি, উপজাতি, অন্যান্য পিছিয়ে থাকা শ্রেণী ইত্যাদির নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়, এই প্রোজেকশানে সেসব নেই,” বলছিলেন প্রসেনজিত বসু।
আবার জনগণনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কিছুটা ভিন্নমতও আছে।
অর্থনৈতিক বিষয়ের বিশ্লেষক প্রতীমরঞ্জন বসুর কথায়, “জনগণনার দরকার আছে ঠিকই, বিশেষ করে আর্থসামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণের জন্য, কিন্তু সরকারের হাতে যে তথ্য নেই, তা নয়। ডিজিটাল যুগে এখন নানা ভাবে সরকার তথ্য সংগ্রহ করে নেয়।
“উদাহরণ হিসাবে যদি আমরা একশ দিনের কাজে প্রকল্প নারেগার কথা ধরি, সেখানে নিয়ম করা হয়েছে, যিনিই কাজ করবেন, তাকে প্রতিদিন দুবার করে মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে হাজিরা দিতে হবে যে তিনি সত্যিই কাজ করছেন। সেটা জিওট্যাগ করা থাকছে। অর্থাৎ প্রতিদিন কত মানুষ সারা দেশে ওই প্রকল্পে কাজ করছেন, সো তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে পাওয়া যাচ্ছে, যা থেকে দরিদ্র মানুষের সংখ্যার প্রায় সঠিক আন্দাজ আমরা পেয়ে যাচ্ছি,”বলছিলেন প্রতীম রঞ্জন বসু।
তিনি আরও বলছিলেন যে ডিজিটাল বা নানা মাধ্যমে পাওয়া তথ্য জনগণনার সময়ে একাধিকবার মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে, যেটা তথ্যভাণ্ডারকে আরও নিখুঁত করে তুলতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images
এনআরসি-এনপিআর নিয়ে বিরোধিতাও জনগণনা বন্ধের কারণ
জনগণনার প্রস্তুতি পর্বেই সরকার জানিয়েছিল যে জনগণনার সঙ্গেই জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার বা এনপিআর হালনাগাদের কাজও হবে।
সেই সময়ে এনআরসি নিয়ে প্রবল বিরোধিতা চলছিল দেশজুড়ে।
জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার যে এনআরসি তৈরির প্রথম ধাপ হতে চলেছে, সেটা বলেছিলেন আন্দোলনকারীরা।
পশ্চিমবঙ্গ আর কেরালার সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এনপিআর তৈরির কাজ বন্ধ করে দেয়।
“কেন্দ্রীয় সরকার সেই সময়ে প্রবল চাপে ছিল আসামের এনআরসি নিয়ে। ওই রাজ্যে তাদের সরকারও পূর্ণাঙ্গ এনআরসি রিপোর্ট গ্রহণ করে নি। তাই কেন্দ্র মনে করেছিল জনগণনার সময়ে এনপিআরের কাজ করতে গেলে পুরো জনগণনার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই বিক্ষোভ শুরু হয়ে যাবে। জনগণনা পিছিয়ে দেওয়ার এটাও একটা বড় কারণ,” বলছিলেন প্রসেনজিত বসু।
মি. বসু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
দাবী উঠছে জাতিগত জনগণনারও
কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দল আবার দাবী তুলেছিল জাতিগত জনগণনাও করা হোক মূল জনগণনার সময়েই, যাতে বোঝা যায় তপশীলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য পিছিয়ে থাকা শ্রেণীর মানুষের সঠিক সংখ্যা।
বিহার সরকার জাতিগত জনগণনার কাজ শুরুও করে দিয়েছে।
ওদিকে কর্ণাটক রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সরাসরিই জাতিগত জনগণনার দাবী তুলেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
তার দল সরকারে থাকার সময়ে যে জাতিগত জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে, সেই তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয় নি।
মি. গান্ধী সেই তথ্যও সামনে আনার দাবী তুলেছেন।
কেন্দ্রী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় ২০২১ সালে লোকসভায় এক বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন যে সরকার শুধুমাত্র তপশীলি জাতি এবং উপজাতির গণনাই করবে। এখনই অন্যান্য জাতির মানুষের গণনা করা হবে না।
অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিত বসু বলছেন, “তপশীলি জাতি উপজাতির মাথা গোণা হলেও অন্যান্য পিছিয়ে থাকা শ্রেণীর গণনা এখনও হয় না। জাতিগত জনগণনা হলে এই অন্যান্য পিছিয়ে থাকা শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাও বেরিয়ে আসবে। তাহলে বর্ণ হিন্দুদের সংখ্যাও স্পষ্ট হয়ে যাবে।“
মুসলমানদের একটা বড় অংশও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের মতো অনেক রাজ্যে।
মি. বসু ব্যাখ্যা করছিলেন, “উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রকৃত সংখ্যা বেরিয়ে এলেই বোঝা যাবে যে তারা সংখ্যালঘু হয়েও কীভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে – সরকারি, বেসরকারি উচ্চস্তরের পদগুলোতে তারাই থাকে, এটাও বোঝা যাবে।“








