সাবমেরিনে করে যেভাবে ইউরোপে কোকেন পাচার হচ্ছে

আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে নানা বিচিত্র উপায়ে মাদক পাচার করে থাকে – এ নিয়ে নানা খবর অনেকেই পড়েছেন । কিন্তু এজন্য পাচারকারীরা নিজস্ব সাবমেরিন বানিয়ে হাজার হাজার মাইল সাগর পাড়ি দিচ্ছে – এমনটা খুব একটা শোনা যায় না। ইউরোপে এমনই একটি কোকেন-বহনকারী সাবমেরিন প্রথম ধরা পড়ে ২০১৯ সালে। বিবিসির সংবাদদাতা নিক বীক সেই সাবমেরিনের ভেতরে-বাইরে দেখে এসে বিস্তারিত জানাচ্ছেন এই প্রতিবেদনে।

স্পেনের পুলিশ ২০১৯ সালে এই সাবমেরিনটি আটক করে
ছবির ক্যাপশান, স্পেনের পুলিশ ২০১৯ সালে এই মাদক-বহনকারী সাবমেরিনটি আটক করে

আমি এখন সেই সাবমেরিনটার ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছি – যেটা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপে কোকেনের চালান নিয়ে এসেছিল।

সাবমেরিনটা ২০ মিটার বা ৬৫ ফুট লম্বা, বানানো হয়েছে ফাইবারগ্লাস দিয়ে। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য যে ব্যাপারটা তা হলো এটা হোম-মেড অর্থাৎ চোরাচালানিরা নিজেরাই এটি বানিয়েছে।

সাবমেরিনটার ওপরে উঠে আমি কোনমতে ম্যানহোলের মত ঢাকনাটা তুলে ভেতরে ঢুকলাম।

ভেতরটা খুবই সংকীর্ণ, দম বন্ধ হয়ে আসে। আর যে প্রযুক্তিতে এটা বানানো হয়েছে তা একেবারেই আদিম।

কিন্তু এরই ভেতরে বসে তিনজন লোক ২৭টি দীর্ঘ দিন ও রাত কাটিয়েছে, পাড়ি দিয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর ।

সাবমেরিনটার ভেতরের দিকে দেয়ালে ফাটল ধরেছে। সেখান দিয়ে রোদ ঢোকার চেষ্টা করছে।

সামনে একটা স্টিয়ারিং হুইল, প্রাথমিক স্তরের দু'চারটে ডায়াল, আর একটা মরচে-পড়া চাবি – এখনো ইগনিশন-হোলে ঢোকানো।

দেখেই বোঝা যায়, এই সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন হবার জন্য আসা একজনের কেন এটাকে একটা 'মৃত্যু ফাঁদ' বলে মনে হয়েছিল।

সাবমেরিনের ভেতরে বিবিসির নিক বীক
ছবির ক্যাপশান, সাবমেরিনের ভেতরে বিবিসির নিক বীক

এনার্জি বার, ক্যানভর্তি মাছ - আর টয়লেট বলতে প্লাস্টিক ব্যাগ

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সাবমেরিনটার ইঞ্জিন বসানো হয়েছে পেছন দিকে । পুরো যাত্রার জন্য এতে ভরা হয়েছিল ২০,০০০ লিটার জ্বালানি। নিশ্চিতভাবেই এটা চলার সময় ভেতরে থাকা লোকদের প্রচণ্ড তাপ ও শব্দ সহ্য করতে হতো।

এর তিনজন ক্রুর মধ্যে ছিল ইকুয়েডরের দুজন – যারা পরস্পরের সম্পর্কীয় ভাই। আরেক জন একজন সাবেক স্প্যানিশ মুষ্টিযোদ্ধা।

তারা যাত্রা শুরু করে ব্রাজিলের দুর্গম নিরক্ষীয় বনাঞ্চলের ভেতর থেকে, তার পর আমাজন নদী ধরে এগুতে থাকে।

খাবার হিসেবে তাদের সাথে ছিল এনার্জি বার, ক্যান ভর্তি সার্ডিন মাছ। টয়লেট বলতে ছিল প্লাস্টিক ব্যাগ।

তবে তাদের সাথে আসল মালপত্র বলতে ছিল প্রায় তিন টন কোকেন – যার মূল্য ১৫ কোটি ডলারেরও বেশি। গন্তব্য ছিল আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে – ইউরোপ।

কিন্তু এই লাভজনক গোপন মিশন তারা সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি।

যাত্রা শুরু করেছিল তারা ২০১৯ সালের শেষ দিকে। কিন্তু তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল কয়েকটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা -যার মধ্যে ছিল যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ এজেন্সিও (এনসিএ)।

গ্যালিসিয়ার উপকুলের কাছে তাদের সাবমেরিনটিতে সমস্যা দেখা দেয়। সেখানেই তাদের গ্রেফতার করা হয় এবং কারাদণ্ড দেয়া হয়।

সাবমেরিনের ভেতরের অংশ
ছবির ক্যাপশান, সাবমেরিনের ভেতরের অংশ

সাবমেরিনে করে মাদক পাচার এখনো চলছে

আটক করা এই সাবমেরিনটিকে এখন স্পেনের পুলিশের একটি ‘ট্রফি’ হিসেবে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত স্থানে রাখা হয়েছে।

আভিলা শহরে স্প্যানিশ পুলিশ একাডেমির কার পার্কে সাধারণ লোকের দেখার জন্য এটিকে স্থাপন করা হয়েছে।

কিন্তু কেউ যদি মনে করেন যে এই সাবমেরিনটি একটি অতীত যুগের স্মৃতিচিহ্ন – তা মোটেও নয়।

বরং এটি আসলে এক বাস্তবতারই প্রতীক। কারণ মাদক চোরাচালানিরা এখনো এ কাজে সাবমেরিন ব্যবহার করছে, এবং এ প্রবণতা ক্রমশই বাড়ছে।

গত মাসেই স্পেনের উপকুলে সেই গ্যালিসিয়া অঞ্চলেই আরেকটি মাদকবাহী সাবমেরিন ধরা পড়েছে।

টিকটক ভিডিওর ছবি : কলম্বিয়ার একজন কোকা উৎপাদনকারী
ছবির ক্যাপশান, টিকটক ভিডিও থেকে নেয়া ছবি : কলম্বিয়ার একজন কোকা উৎপাদনকারী

“মাদক পাচারকারীরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য গত ২০ বছর ধরে সাবমেরিন ব্যবহার করছে। কিন্তু এই মাত্র দুটি ক্ষেত্রেই আমরা তাদের ধরতে পেরেছি” – বলছিলেন আন্তোনিও মার্তিনেজ দুয়ার্তে, যিনি স্প্যানিশ ন্যাশনাল পুলিশের মাদক-দমন সংক্রান্ত ব্রিগেডের চিফ কমিশনার।

“এগুলোকে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন” – স্বীকার করেন তিনি।

মনে করা হয়, ইউরোপ লক্ষ্য করে এরকম শত শত সাবমেরিন ছাড়া হয়েছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরে ইউরোপ হচ্ছে কোকেনের সবচেয়ে বড় বাজার, এবং কোভিড মহামারির সময়কার মন্দা পার হয়ে এখন এই ব্যবসা হুহু করে বাড়ছে।

অনেকে বলেন, আটলান্টিক মহাসাগরের ঠিক মাঝ বরাবর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ এবং অ্যাজোরেসের আশপাশে নাকি কোকেনবাহী সাবমেরিনের একটি গণ কবরখানা তৈরি হয়েছে। কারণ সাবমেরিন থেকে কোকেন খালাস করার পর এ জায়গাটিতে তাদেরকে ইচ্ছে করেই সাগরে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

কোথায় কীভাবে তৈরি হয় এই চোরাই সাবমেরিন

মাদকবাহী সাবমেরিনের চালকের আসন
ছবির ক্যাপশান, মাদকবাহী সাবমেরিনের স্টিয়ারিং হুইল

এরকম একটি সাবমেরিন যদি সফলভাবে কোথাও কোকেনের একটি চালান পৌঁছে দিতে পারে – তাহলে চোরাচালানিদের জন্য তো বটেই, তা ছাড়া যে কারিগররা এই সাবমেরিনটি বানিয়েছে তাদের জন্যও এটি এক বিরাট সাফল্য।

এগুলো তৈরি হয় অত্যন্ত গোপনে, দক্ষিণ আমেরিকার কোন গভীর জঙ্গলের ভেতরে কোন কারখানায় ।

অধিকাংশ কারখানাই গায়ানা বা সুরিনামে অবস্থিত।

স্পেনের পুলিশের জন্য এসব সাবমেরিনের বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে বিশ্বব্যাপি মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ।

দুটি সাবমেরিন আটক করাকে তারা বড় বিজয় হিসেবেই তুলে ধরছেন।

“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন” বলছেন চিফ কমিশনার দুয়ার্তে – “ইউরোপে এই প্রথমবারের মত আমরা দেড় টন কোকেন পেস্ট উদ্ধার করতে পেরেছি। “

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরোপের মাটিতে কাঁচা কোকা পেস্ট থেকে কোকেন তৈরির যে ল্যাব তারা আবিষ্কার করেছেন সেটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড়।

কিন্তু যে কোকেন তারা উদ্ধার করেছেন - তার তাৎপর্য শুধু এর বিরাট পরিমাণের মধ্যেই নিহিত নয়।

“এই অপারেশনে আরো নিশ্চিত হয়েছে যে কলম্বিয়া আর মেক্সিকোর অপরাধীরা এখন স্পেনে সক্রিয় স্প্যানিশ অপরাধীচক্রগুলোর সাথে মিলে একযোগে কাজ করছে” – বলেন চিফ কমিশনার দুয়ার্তে।

কোকেনের প্যাকেট
ছবির ক্যাপশান, কোকেনের প্যাকেট

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনের সময় ল্যাবে পাওয়া সামগ্রী স্থানীয় সাংবাদিকদের স্বচক্ষে দেখানোর ব্যবস্থা করে পুলিশ ।

সংবাদ সম্মেলনের কক্ষটি কাঁচা কোকার গন্ধে ভরে যায় – যে গন্ধ অনেকটা ভিনেগারের মত।

সেখানে আরো ছিল রাসায়নিক পদার্থের ব্যারেল, মাইক্রোওয়েভ, হাইড্রলিক প্রেস ও ওজন মাপার যস্ত্র – এবং কোকা থেকে কোকেন তৈরির প্রক্রিয়াটিও দেখানো হয়।

কক্ষটির আরেক কোণায় ছিল কয়েক ডজন বাদামি প্যাকেট। একেকটার আকৃতি একটা ইঁটের সমান -তার ওপর সিল দেয়া সুপারম্যানের লোগো। চোরাচালানিরা এই প্রতীকটি ব্যবহার করে সম্ভবত তারা নিজেদের ‘অপরাজেয়’ মনে করে বলেই।

একজন অফিসার আমাকে বললেন, কোকেন আমদানিকারকরা এক একটি প্যাকেটের জন্য ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ডলার দাম দেয়। তার পর তারা এগুলো রাস্তায় বিক্রি করে কমপক্ষে দ্বিগুণ দামে।

গ্যালিসিয়া এলাকায় পন্টেভেডরা শহরে পুলিশ যে ল্যাবটি শনাক্ত করেছে – তারা প্রতিদিন ২০০ কিলো পরিমাণ ৯৫% বিশুদ্ধ কোকেন উৎপাদন করতে পারতো।

মাদক ব্যবসা বেড়েই চলেছে

কোকেন
ছবির ক্যাপশান, কোকেন

সাবমেরিন এবং ল্যাব থেকে মাদক-চোরাচালানের জগতের ভেতরকার একটা চিত্র পাওয়া যায়।

এটা এমন এক ব্যবসা যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

জাতিসংঘের মাদক সংক্রান্ত এজেন্সি বলছে, ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কোকেন উৎপাদন এক তৃতীয়াংশ বেড়েছে। এটা এক নতুন রেকর্ড এবং ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছরের বৃদ্ধির পরিমাণের মধ্যে সবচেয়ে বড়।

মাদকের সরবরাহ কী পরিমাণে বেড়েছে তা প্রত্যক্ষ করা যায় বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প শহরে গেলে।

এখানে ২০২২ সালে পুলিশ ১১০ টন কোকেন বাজেয়াপ্ত করেছে। এত বিপুল পরিমাণ কোকেন ধ্বংস করার মত যথেষ্টসংখ্যক ইনসিনারেটর বা চুল্লিও তাদের ছিল না।

ইউরোপে মাদক ব্যবসার কেন্দ্র বেলজিয়াম

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বন্দর
ছবির ক্যাপশান, বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বন্দর

অনেকে অনুমান করেন, এই বন্দরে প্রকৃতপক্ষে যে পরিমাণ কোকেন আসছে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। বাকিটা চলে যায় নেদারল্যান্ডসে, এবং সেখান থেকে যায় যুক্তরাজ্য সহ ইউরোপের সর্বত্র।

অ্যান্টওয়ার্প বন্দরের কাস্টমসের প্রধান আমাকে বলেছেন, একে বলা যায় কোকেনের সুনামি, এবং এই যুদ্ধে তারা কখনো জয়ী হতে পারবেন না।

এই মাদক ব্যবসার লড়াই এখন অ্যান্টওয়ার্পের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে।

জানুয়ারি মাসে কোকেন বেচাকেনার সাথে জড়িত গ্যাংগুলোর বন্দুকযুদ্ধে একটি ১১ বছরের মেযে নিহত হয়।

বেলজিয়ামের বিচার মন্ত্রী ভিনসেন্ট ভ্যান কিকেনবর্ন গত এক বছর ধরে একটি সুরক্ষিত ভবনে বাস করছেন। কারণ ডাচ অপরাধীরা তাদে অপহরণ করবে – এমন এক পরিকল্পনার কথা উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এসময় তার বাড়ির সামনে একটি গাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।

বেলজিয়ামের একজন শীর্ষ তদন্তকারী মিশেল ক্লেইজ বলছেন, কোকেন শিল্প এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

“যাদেরকে আমরা মাদক পাচারকারী বলি -তারা এখন বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছে” – ব্রাসেলসে জাস্টিস প্যালেসের কাছে আমার সাথে দেখা হবার পর বলছিলেন তিনি।

মি. ক্লেইজ বলছেন, এসব গ্যাং বা অপরাধীচক্রের সম্পদ এবং প্রভাব -যারা এদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করছেন - তাদের ছাড়িয়ে গেছে।

“অর্থ পাচার এবং দুর্নীতি এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ডক কর্মী, পুলিশ, এবং অন্য লোকদেরকে এখন অপরাধী চক্রগুলো যে পরিমাণ অর্থ অফার করতে পারে – তাতে আপনি কী করে আশা করবেন যে আমরা এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো?”

“খেলা শেষ হয়ে গেছে” – বলেন তিনি।

এশিয়া ও আফ্রিকা : কোকেন ব্যবসার পরবর্তী লক্ষ্য?

বেলজিয়ামের কোকেন সংকট মানে হচ্ছে ইউরোপের কোকেন সংকট।

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো এখন এমনভাবে একসাথে কাজ করছে যা আগে কখনো হয়নি।

জাতিসংঘ আরো বলছে, ইউরোপ মহাদেশে তাদের সাফল্যের পর তারা শিগগীরই – অসীম অর্থ আয়ের লক্ষ্যে - শাখাপ্রশাখা বিস্তার করবে এশিয়া ও আফ্রিকায় ।