শ্রীলঙ্কায় হেরোইন চোরাচালান: নারীদের ব্যবহার করে বায়িং হাউজের আড়ালে মাদক পাচার

গত ডিসেম্বরে বিপুল পরিমাণ হেরোইন ও কোকেন আটক করে কলম্বোর পুলিশ (ফাইল ফটো)আন্তর্জাতিক একটি মাদক পাচারকারী চক্রের ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখন এই চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছেন।
মঙ্গলবার ওই চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশের বিশেষ বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)।
সংস্থাটি বলছে, এই সিন্ডিকেটের আফগানিস্তান, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া আর শ্রীলঙ্কায় নেটওয়ার্ক রয়েছে।
র্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন চক্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের এখন তারা খুঁজছেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার অভিযান
গত ১৪ই ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার কলম্বোর মাউন্ট লাভিয়ান এলাকা থেকে বাংলাদেশের একজন নারীকে ৩২ কেজি হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এর দুই সপ্তাহ পরে, ৩১ ডিসেম্বর আরো দুইজন বাংলাদেশী পুরুষকে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছে পাওয়া যায় ৩০৪ কেজি হেরোইন আর পাঁচ কেজি কোকেন।
মাদক আটকের পরে বাংলাদেশী ও মাদক পাচারকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তারা জানতে পারেন, এই চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আরো অনেকে জড়িত রয়েছে। তখন তারা এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানান।
এরপরেই নড়েচড়ে বসেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। একটি টাস্কফোর্স গঠন করে এই চক্রটির সদস্যদের ধরতে অভিযান শুরু করা হয়।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের ছয় সদস্যের একটি তদন্ত দল শ্রীলঙ্কায় গিয়ে গ্রেপ্তারকৃত তিন বাংলাদেশীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
তাদের সাথে কথা বলে তাদের নিয়োগকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে ধারণা পান তদন্তকারীরা।
র্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথমে শ্রীলঙ্কায় গ্রেপ্তার হওয়া তিন বাংলাদেশীদের তথ্য তারা যাচাই শুরু করেন। তারা কোথায় কাজ করতো? তাদের সঙ্গী কারা ছিল? - সেসব বের করতে শুরু করেন।
এসব তথ্যে তদন্ত করতে শুরু করে একজন ব্যক্তিতে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পরে আরো কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
সেই ব্যক্তির দেয়া তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকার কাউলা থেকে এই চক্রের আরো পাঁচজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে তিনজনই নারী।
বায়িং হাউজের নামে মাদক ব্যবসা
র্যাব জানিয়েছে, একটি বায়িং হাউজের ছদ্মবেশে এই মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেটটি পরিচালিত হতো।
এই চক্রটি দেশের বাইরে যেমন হিরোইন ও কোকেন পাচারে জড়িত, তেমনি দেশের ভেতর ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত রয়েছে।
এই বায়িং হাউজে ভালো বেতনে চাকরির লোভ দেখিয়ে প্রথমে স্বল্প শিক্ষিত নারী ও পুরুষদের নিয়োগ দেয়া হতো।
তারা বিশ্বস্ততা অর্জন করলে একসময় আরো বেশি অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করা হতো। এজন্য বেছে নেয়া হতো স্মার্ট কিন্তু স্বল্প শিক্ষিত নারীদের।
এই নারীদের বিদেশ ভ্রমণে নিয়ে গিয়ে বিদেশী সংস্কৃতির সাথে পরিচয় এবং তাতে অভ্যস্ত করে তোলা হতো।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন নারীর বর্ণনা দিয়ে র্যাব বলছে, এদের একজন গ্রামের একটি স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও, ঢাকায় এসে মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
ওই নারী পরে ভারতে, চীনে, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় অনেকবার যাতায়াত করেছে।
তাদের প্রধান কাজ ছিল লাগেজে করে মাদক বহন করা। এসব স্থানে তারা বাসা ভাড়া করে বসবাস করতেন।
আরেকজন নারীর পরিচয় হিসাবে র্যাব জানায়, তিনি মিডিয়া জগতে কাজ করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এলেও পরে মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত হন।
এরপর তিনি মালয়েশিয়া গিয়ে সেখান থেকে মাদকের চালান নিয়ে শ্রীলঙ্কায় যান।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি কাজ করতে গিয়ে মাদক এই চক্রের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন এইচএসসি পাশ আরেকজন নারী।
২০১৭ সালে এই চক্রে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি চীন, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতে যাতায়াত করেছেন।
এই পাঁচজনের মধ্যে দুজন পুরুষ। তাদের একজন একটি বায়িং হাউজে কাজ করার সুবাদে চক্রের দলনেতার সঙ্গে পরিচয় হয়।
এরপর অতিরিক্ত অর্থ লাভের আশায় শ্রীলঙ্কায় গিয়ে মাদক দ্রব্য প্যাকেজিং, সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে শুরু করে।
আরেকজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে র্যাব জানিয়েছে, তিনি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে কর্মরত। একজন আত্মীয়ার মাধ্যমে তিনি চক্রের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন।
তিনিই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীদের ফাঁদে ফেলে এই চক্রে অন্তর্ভুক্ত করতেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম সিকদার জানিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় গ্রেপ্তার হওয়া নারী একসময় গৃহকর্মী, পরে পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।
সে সময় এই চক্রের একজনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাকে বায়িং হাউজে চাকরি দেয়া হয়। এরপরে তিনি মাদক ব্যবসায় বাহক হিসাবে কাজ শুরু করেন।
এ পর্যন্ত চারবার শ্রীলঙ্কায় গিয়েছেন। তখন তিনি মাদকের চালান নিয়ে যান বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কায় গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুজনের একজন একসময় কাপড় ফেরি করে বিক্রি করতেন। আরেকজন একটি কৃষক পরিবারের সন্তান।
যেভাবে মাদক চোরাচালান করা হতো
র্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান জানান, এসব মাদক আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান-মালয়েশিয়া হয়ে শ্রীলঙ্কায় যেতো।
এছাড়া মালয়েশিয়া থেকে চীনে মাদক পাঠানো হতো।
তবে এসব মাদকের রুট হিসাবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হয়নি বলে বলছেন র্যাবের কর্মকর্তারা। তবে এই গ্রুপটি দেশের ভেতরে ইয়াবার ব্যবসায় জড়িত রয়েছে।
তবে মি. সিকদার জানিয়েছেন, এই চক্রটি আফগানিস্তান থেকে করাচি বা কুয়ালালামপুর হয়ে শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশে মাদক আনা নেওয়া করতো বলে শ্রীলঙ্কার পুলিশ তাদের কাছে দাবি করেছে।
র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চক্রের সদস্যরা বেড়ানোর কথা বলে বাংলাদেশ থেকে ভারত, মালয়েশিয়া বা চীনে যেতেন।
সেখান থেকে তারা মাদকের চালান নিয়ে শ্রীলঙ্কায় যেতেন। সেখানে বিভিন্ন স্থানে তারা মাদক সরবরাহ করতেন।
চীনে মাদক চোরাচালান করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে এই চক্রের একজন কারাগারে রয়েছেন বলে র্যাব জানিয়েছে।









