রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণে কতটা এগুলো ইউক্রেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার
- Role, বিবিসি ভেরিফাই
ইউক্রেনের জেনারেলরা বলেছেন যে তাদের সৈন্যরা দক্ষিণে রাশিয়ার প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা 'ভেঙে দিয়েছে'। বিবিসি জানার চেষ্টা করেছে যে ইউক্রেনীয় বাহিনী এক্ষেত্রে সত্যিই কতটা অগ্রসর হয়েছে এবং ফ্রন্ট লাইনে বা সম্মুখ সারিতে তাদের এগিয়ে থাকার কী ধরণের প্রমাণ রয়েছে।
রুশ বাহিনীকে তাদের দখলকৃত ভূমি থেকে সরিয়ে দিতে জুনের শুরুতে ইউক্রেন বড় পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।
প্রায় ৬০০ মাইল বা ৯৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্টলাইন বরাবর তিনটি পয়েন্টে তারা আক্রমণ চালিয়েছে।
জাপোরিঝিয়া শহরের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকাটি কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আজভ সাগরের এই দিকটায় সফলভাবে হামলা চালানো হলে, রাশিয়ার সরবরাহ রুট বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কেননা এই অংশটি রুশ শহর রোস্তভ-অন-ডনকে ক্রাইমিয়ার সাথে সংযুক্ত করেছে।
জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের রোবোটাইন এবং ভারবোভ গ্রামের আশেপাশের এলাকা ছাড়া এই ফ্রন্টে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি।
ইউক্রেন যদি এই প্রধান সরবরাহ রুটটি বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে, তবে ক্রাইমিয়াতে রাশিয়ার বিশাল সৈন্যবাহিনীকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। ক্রাইমিয়া ২০১৪ সালে রাশিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছিল।
তবে উল্লেখযোগ্য বাধা সত্ত্বেও, ইউক্রেনীয় সৈন্যদের দক্ষিণ ফ্রন্ট বরাবর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার নিশ্চিত কিছু প্রমাণ রয়েছে।
বিবিসি ভারবোভের কাছাকাছি ফ্রন্টলাইন বরাবর ধারণ করা নয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও যাচাই করেছে।
ভিডিওগুলোয়, ইউক্রেনীয় বাহিনীকে ভারবোভের উত্তরে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লঙ্ঘন করতে দেখা গিয়েছে।
তবে, ভিডিওতে ধারণ করা এসব দৃশ্য দেখেই বলা যাবে না যে ইউক্রেন এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে।
এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের শুধুমাত্র পদাতিক বাহিনী রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে পেরেছে।
ইউক্রেনীয় সাঁজোয়া যানের বহরকে এই ফাঁক গলে দখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করতে দেখা যায়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
ইউক্রেনের দ্রুত অগ্রসর হতে বাধা কোথায়?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মস্কো এই পাল্টা আক্রমণের বিষয়টি অনেক আগেই অনুমান করতে পেরেছিল এবং এজন্য দেশটি গত কয়েক মাস ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েক স্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, ইন্টার-লকিং বাধার সারি, পরিখা, বাঙ্কার এবং স্থল মাইন পোঁতা এলাকাসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় যুদ্ধাস্ত্র, সাথে পদাতিক বাহিনী মোতায়েন করে প্রস্তুত রাশিয়া।
স্থল মাইন পোঁতা বিশাল এলাকা প্রাথমিকভাবে ইউক্রেনের অগ্রযাত্রার গতি কমিয়ে দিয়েছে।
এই মাইনফিল্ডগুলো গোলাবারুদে পরিপূর্ণ, কিছু কিছু জায়গায় এক বর্গ মিটার এলাকায় পাঁচটি পর্যন্ত মাইন পোঁতা হয়েছে।
জুন মাসে ইউক্রেনের প্রথম প্রচেষ্টা দ্রুত ব্যর্থতার মুখে পড়েছিল।
তখন তাদের কাছে থাকা আধুনিক, পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর সরবরাহ করা যুদ্ধাস্ত্র বিকল হয়ে যায় এবং পুড়ে যায়।
ইউক্রেনের পদাতিক বাহিনী একইভাবে অচল হয়ে পড়ে, সেসময় ভয়ঙ্কর হতাহতের ঘটনা ঘটে।
কিয়েভকে তখন থেকে প্রায়ই রাতে পায়ে হেঁটে না হলে গোলাগুলি চলা অবস্থায় এই মাইনগুলো পরিষ্কার করতে হয়েছে।
তাই এখন পর্যন্ত ইউক্রেন খুব ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়ার মাইন, ড্রোন এবং ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্রের সামনে ইউক্রেনের সাঁজোয়া যান এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, ব্রিটেনের দেয়া একটি চ্যালেঞ্জার-টু সজোঁয়া যান রোবটাইনের হামলা মুখে পড়েছে।
তবে, স্থল মাইন পোঁতা বিশাল এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশ পরিষ্কার হয়ে গেলে এবং সেখানে রুশ বাহিনীকে দমন করা গেলে ইউক্রেনের পক্ষে সংখ্যায় এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

ছবির উৎস, Reuters
ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের পরবর্তী টার্গেট কী?
কিংস কলেজ লন্ডন ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের ড. মেরিনা মিরন বলেন, "ইউক্রেনীয়দের এখন যে সমস্যাটি আছে, তা হল, তাদের সৈন্য সংখ্যা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে।”
ইতোমধ্যে রাশিয়া নিজেদের শক্তি অনেকটাই পুনরুদ্ধার করেছে, এবং তাদের অবস্থান এখন এতটাই দৃঢ় ও শক্তিশালী যে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দখল করা এলাকা পুনর্দখল নিতে পারে।
বিবিসি ড্রোন দিয়ে করা একটি রুশ ভিডিওর ভৌগলিক অবস্থান চিহ্নিত করেছে, যা দেখে অনুমান করা যায়, ভিডিভি নামে রাশিয়ার এলিট বিমান বহর এখন ভার্বোভ শহরের কাছাকাছি মোতায়েন করা হয়েছে।
যার মাধ্যমে ইউক্রেনের যেকোন পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি সাথে সাথে মোকাবেলা করা যায়।
লন্ডন-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আরইউএসআইয়ের রাশিয়া বিশ্লেষক কাতেরিনা স্টেপানেঙ্কো বলেছেন, "যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ বাহিনীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে।"
"গোলাগুলির পাশাপাশি, ড্রোন হামলা এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর পাশাপাশি - রুশ বাহিনী ব্যাপকভাবে ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে বলে জানা যায়। যার লক্ষ্য ইউক্রেনের সংকেত পাঠানো ব্যবস্থা এবং ড্রোন ব্যবহারে বাধা দেওয়া।"
ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী তারা হয়ত উপকূলের দশ শতাংশের কিছু বেশি এলাকায় এগিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সফলতার হার আরো কম।
এদিকে, টানা তিন মাস কঠিন আক্রমণের মুখে এখন ক্লান্ত এবং সম্ভবত কিছুটা নিরাশ হয়ে পড়েছে রুশ বাহিনী। সেই সাথে রাশিয়ার সরবরাহ পথ লক্ষ্য করেও বেশিরভাগ দূরপাল্লার হামলা চালানো হয়েছে।
এখন ইউক্রেন যদি রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে টোকমাক শহর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তাহলে তারা ক্রাইমিয়া সাথে রাশিয়ার রেল ও সড়ক সরবরাহ রুটগুলোকে তাদের সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে পারবে।
যদি তারা তা করতে পারে, তাহলে এই পাল্টা আক্রমণ একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের দিকে যেতে পারে।

ছবির উৎস, Reuters
এর মাধ্যমে, এই যুদ্ধ হয়ত শেষ হবে না, কিন্তু তার ফলে হয়ত ২০২৪ সালটা কিছুটা ভালো অবস্থানে শুরু করতে পারবে ইউক্রেন।
আর এ যুদ্ধ হয়ত দীর্ঘতর হতে পারে, কিন্তু এই মূহুর্তে ইউক্রেনের এই অগ্রগতি হয়ত মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে, এবং যখন শান্তি আলোচনা শুরু হবে তখন ইউক্রেনকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।
কিন্তু কিয়েভের হাতে সময় খুব কম। কেননা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বর্ষাকাল চলে আসবে। রাস্তাঘাট কাদায় মাখামাখি হয়ে যাবে, সৈন্যদের অগ্রগতিকে যা বাধাগ্রস্ত করবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাথেও ইউক্রেনের অগ্রগতির ঘনিষ্ট যোগ আছে।
দেশটিতে যদি রিপাবলিকানরা জিতে যায়, তাহলে ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন জানেন যে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে।
আর ইউক্রেনীয়রা জানে যে তাদের এই পাল্টা আক্রমণ সফল করতে হবে।











