পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বড় সমাবেশ কেন এবং হামলাই বা কেন?

পঞ্চগড়ে হামলার ঘটনার পরে আতংকিত আহমদিয়া জামাতের কয়েজন নারী সদস্য

ছবির উৎস, Shohidul Islam

ছবির ক্যাপশান, পঞ্চগড়ে হামলার ঘটনার পরে আতংকিত আহমদিয়া জামাতের কয়েজন নারী সদস্য

বাংলাদেশের পঞ্চগড়ে আহমদিয়া জামাত সম্প্রদায়ের বাৎসরিক ধর্মীয় জমায়েত সালানা জলসা ঘিরে সহিংসতায় দুজন হতাহত হওয়ার পর এখন সেখানে থমথমে পরিস্থিতি রয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে টহল দিচ্ছে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির সদস্যরা।

বাংলাদেশে আহমদিয়া সম্প্রদায় ‘কাদিয়ানী’ বলেও পরিচিত।

পঞ্চগড়ে কেন সহিংস পরিস্থিতি ?

পঞ্চগড়ের দুটি গ্রামে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষের বসতি রয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বকশীবাজারের পরিবর্তে পঞ্চগড়ের আহমদনগরে তাদের বাৎসরিক ধর্মীয় সমাবেশ করে আসছেন। গত বছরেও এখানে পুলিশ প্রহরায় তাদের সমাবেশ হয়েছে।

শুক্রবার থেকে তাদের তিনদিনব্যাপী সালানা জলসা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। আগে এই জলসাটি ঢাকার বকশীবাজারে হতো। এটা ছিল আহমদিয়াদের ৯৮তম জলসা, যেখানে সারা দেশে থেকে এই সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা অংশ নেন।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য মাহমুদ আহমাদ সুমন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''ঢাকায় বকশীবাজারে আমাদের জায়গাটা ছোট। জানযটে যাতায়াতে মানুষের কষ্ট হয়। এখানে আমাদের নিজস্ব একটা জায়গা কেনা হয়েছে। সেখানে আমরা জলসার জায়গা করেছি, যাতে মানুষজন একে একটু খোলামেলা পরিবেশে তিনদিন জলসা করবে। এবার আমাদের অনেক বড় আয়োজন ছিল।''

ভারতের পাঞ্জাবের কাদিয়ান থেকে এই দর্শনের জন্ম বলে অনেকে এই সম্প্রদায়ের লোকজনকে কাদিয়ানী বলেও বর্ণনা করে থাকেন। সুন্নি মুসলিমদের অনেকে আহমদিয়াদের 'অমুসলিম' মনে করেন।

হেফাজতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী বেশ কিছু সংগঠন শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে পাকিস্তান যেভাবে আহমদীয়া সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে, সাংবিধানিকভাবে অমুসলিম ঘোষণা করেছে, বাংলাদেশেও যেন সেটা করা হয়।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আহমদিয়া সম্প্রদায় তাদের কোন ধর্মীয় সমাবেশ বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে তাতে বাধা দেয়া বা হামলার অভিযোগ ওঠে। এর আগেও পঞ্চগড়ে এরকম হামলার ঘটনা ঘটেছে।

মুসলিমদের মধ্যেই একটি অংশ হলো এই আহমদিয়া সম্প্রদায়। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কিছু ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে সুন্নি মুসলিমদের প্রবল আপত্তি আছে। ফলে ইসলামের অন্য দল উপদলগুলো আহমদিয়াদের অমুসলিম মনে করে।

পঞ্চগড়ের স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, এখানে দুটি গ্রামে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করে। যদিও এমনিতে সবসময় উত্তেজনা থাকে না। কিন্তু যখন এই সম্প্রদায়ের মানুষজন বিশেষ করো ধর্মীয় আয়োজন করে, তখন সুন্নি মতাদর্শের অনেক সংগঠন আপত্তি করে। এসব কারণে উত্তেজনা দেখা দেয়।

২০২২ সালেও যখন পঞ্চগড়ে বাৎসরিক সালানা জলসা আয়োজন করা হয়েছিল, তখনো একাধিক সুন্নি মতাদর্শের সংগঠন আপত্তি তুলেছিল। তবে প্রশাসনের নিরাপত্তায় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

২০১৯ সালেও পঞ্চগড়ে বার্ষিক জলসা আয়োজনের সময় তাদের ওপর হামলা চালানো, তাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর এবং অগ্নি সংযোগের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য মাহমুদ আহমাদ সুমন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’এখানে আহমদনগর অঞ্চলে ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে সবাই বসবাস করে আসছে। আমরাও এখানে স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছি, একই সাথে খেলাধুলা করেছি। কখনো কোন বিরোধ হয়নি। গত তিন চার বছর ধরে একটা উচ্ছৃঙ্খল মহল ঢাকা থেকে বা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে মানুষজনকে উস্কে দিয়ে এই কাজগুলো করাচ্ছে। যারা মূল হোতা,তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।‘’

শুক্রবার রাতে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একাধিক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় ও ভাঙচুর করা হয়

ছবির উৎস, Shohidul Islam

ছবির ক্যাপশান, শুক্রবার রাতে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একাধিক বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় ও ভাঙচুর করা হয়

সংঘর্ষের শুরু কীভাবে?

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, কয়েকদিন আগে থেকেই কয়েকটি সুন্নি সংগঠনের ব্যাপারে দাবি করে আসছিল যেন তাদের জলসা করতে দেয়া না হয়।

এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পঞ্চগড় শাখা, সম্মিলিত খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ইমান-আকিসা রক্ষা কমিটি ইত্যাদি। তারা এই দাবিতে পঞ্চগড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধও করেছিল।

শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর এসব সংগঠনের ব্যানারে শত শত লোকজন মহাসড়ক অবরোধ করে এবং শহরের সড়ক গুলোয় বাঁশ ফেলে বন্ধ করে দেয়। একই সময় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়।

ইটপাটকেল নিয়ে বিক্ষোভকারীদের পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। তারা শহরের ধাক্কামারা এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের একটি কার্যালয়ও পুড়িয়ে দেয়।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য মাহমুদ আহমাদ সুমন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’আমাদের প্রায় ৮০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং ভাংচুর করা হয়েছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক আছে, যদি আবার এসে হামলা করে। বাড়িঘরে থাকতে নিরাপদ বোধ করছে না। আর বাড়িঘরে আগুন আর ভাঙচুর করার কারণে সেখান থাকার মতো পরিস্থিতিও নেই।‘’

তবে পুলিশের হিসাবে ৩০ থেকে ৪০টির মতো বাড়িঘরে আগুন দেয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকায় আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি মসজিদ: ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় আহমদীয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি মসজিদ (ফাইল ছবি)

ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, রাজশাহী, শেরপুর, নাটোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা,টাঙ্গাইল, গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের ওপর একাধিক হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন সময় বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে।

এ ধরণের একের পর এক সংঘর্ষের কারণে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা সুন্নি মতাদর্শের মুসলমান প্রধান এলাকাগুলো বা শহরের মূল সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করেন। বাংলাদেশ ও ভারতে অনেকটা একই রকম চিত্র দেখা যায়।

মাহমুদ আহমাদ সুমন বলছেন, ‘’গত বছর প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিয়েছিল। সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান হয়েছিল, কোন সমস্যা হয়নি। এই বছরেও যখন প্রশাসনের কাছে যাওয়া হয়েছিল, ওরা বলেছে, ঠিক আছে আপনারা জলসা করেন। তাদের অবগত করা এবং সহযোগিতার জন্য কয়েকবারই আমরা জানিয়েছি।‘’

‘’ গতকালের ঘটনায় যারা প্রধান ইন্ধন দাতা ছিল, তাদের সাথেও প্রশাসন কয়েকবার বসেছে। কিন্তু একদল উৎশৃঙ্খল সেখানে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে। আর এখানেও প্রশাসন আসার পরে দ্রুত অ্যাকশনে যাওয়ার মতো কাজ আমরা লক্ষ্য করিনি। তারা আগে থেকে এখানে পুলিশ মোতায়েন করে রাখলে এই সমস্যা হতো না।‘’

প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং পুলিশের সদস্যসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন, পঞ্চগড়ের একজন নেতা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘’হামলা ভাঙচুরের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। শুক্রবারের মিছিল বের করার ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনাও ছিল না। কারা মিছিল বের করেছেন, তা আমাদের জানা নেই।‘’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সন্ধ্যায় সেখানে পুলিশ ও র‍্যাবের পাশাপাশি কয়েক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

সংঘর্ষের ঘটনার পরে শুক্রবার রাতেই জলসাটি বাতিল করা হয়েছে। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা কাজ করছে। আবার হামলার ভয়ে অনেকে বাড়িতে যাচ্ছেন না। তাছাড়া বাড়িঘর ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেয়ার কারণে অনেকের যাবার জায়গাও নেই।

পুলিশ জানিয়েছে, সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এখনো উত্তেজনা রয়েছে।

তবে সুন্নি মুসলিমদের একজন নিহত হওয়ায় তার জানাজা নিয়ে খানিকটা উত্তেজনা রয়েছে।

অন্যদিকে সালানা জলসায় অংশ নিতে সারা দেশ থেকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের যারা পঞ্চগড়ে এসেছিলেন, তারা চলে যেতে শুরু করেছেন।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বসত বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন।

ঢাকায় খতমে নবুওতের একটি সভা (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় খতমে নবুওতের একটি সভা (ফাইল ছবি)

পুলিশ কী বলছে?

পঞ্চগড়ের জেলা পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের জলসা গতকাল থেকেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং সেখানে আসা বেশিরভাগ মানুষ চলে গেছে।

‘’খতমে নবুওয়তের ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী এবং জামায়াত শিবিরের সমর্থক একটা ছেলে গতকাল ইটপাটকেলের আঘাতে মারা গেছে। তার জানাজা পরবর্তী একটা টেনশন রয়ে গেছে। আমাদের এখানে পর্যাপ্ত ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবো,‘’তিনি বলছেন।

এসব ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তিনি জানান।

কিন্তু আগে থেকেই উত্তেজনা থাকার পরেও পুলিশ কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলো না, জানতে চাওয়া হলে সিরাজুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’এখানে যারা খতমে নবুওয়ত ও অন্যান্য ইসলামী সংগঠন- তাদের সঙ্গে আমরা বারবার বসেছি। তাদের অনুরোধ করেছি, তারাও বলেছে তাদের কর্মসূচী শান্তিপূর্ণভাবে করবে।‘’

‘’কিন্তু ঘটনা যেটা হয়েছে, কালকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের যে বাড়িঘরে মোতায়েন করা হয়েছে, সেখানেও আমাদের পর্যাপ্ত ফোর্স ছিল। কিন্তু যেখানে তাদের মূল স্থাপনাগুলো, সেখানে আঘাত করতে পারেনি। যখন আমরা তাদের নিউট্রাল করার চেষ্টা করেছি, তখন তারা বিচ্ছিন্ন বাড়িঘরগুলো, পানি না থাকায় নদী পার হয়ে এপার-ওপারের বাড়িগুলোয় গিয়ে তারা হামলা করেছে। সেটা নিয়ন্ত্রণ করা আসলেই দুঃসাধ্য ছিল,‘’ তিনি বলছেন।