ভারতের কাদিয়ান থেকে যেভাবে পাকিস্তানকে আবাসভূমি করেছিল আহমদিয়া সম্প্রদায়

আহমদিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯ শতকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ভারতের উত্তরাঞ্চলে আহমদিয়া মতবাদের সূচনা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর যারা এক দেশে ছেড়ে অন্য দেশ বেছে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রয়েছে ভারতের আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনও। ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন কাদিয়ানের বাসিন্দাদের অনেকেই সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন।

লাহোরের উপকন্ঠে পাহাড় ঘেরা একটি শহর রবওয়া, যার বেশিরভাগ বাসিন্দাই আহমদিয়া সম্প্রদায়ের। অনেক পাকিস্তানি তাদের নাস্তিক এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলে মনে করে। গত এক দশকেই উগ্রপন্থীদের হামলায় এই সম্প্রদায়ের অন্তত একশো সদস্য মারা গেছে।

কিন্তু ভারত ভাগের সময় এই আহমদিয়ারা তাদের দেশ হিসাবে নিজেরাই পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিলেন।

"সবাই যখন পাকিস্তানে চলে আসে, তখন তাদের সবকিছুই সেখানে, ভারতে রেখে আসতে বাধ্য হয়। কখনোই তারা সে বিষয়টি তাদের মন থেকে মুছতে পারেনি।"

নিজের সম্প্রদায়ের আরো অনেকের সঙ্গে, ছোট বেলায় ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত লাগোয়া শহর কাদিয়ান থেকে পাকিস্তানে চলে আসেন সাবেক পাইলট মাহমুদ খান।

তিনি বলছিলেন, কিভাবে আহমদিয়া বিরোধী দাঙ্গায় তাদের নতুন পাকিস্তানের স্বপ্নভঙ্গ হয়।

"আমার বাবা, আমার চাচারা খুবই উত্তেজিত ছিল যে, আমরা নিজেদের জন্য একটি আলাদা দেশ পেতে যাচ্ছি। যেখানে আমরা আমাদের ধর্মের চর্চা করতে পারবো। প্রথমদিকে অবশ্য তাই ছিল। কিন্তু ১৯৫৩ সালে লাহোরে যখন দাঙ্গা শুরু হলো, তখন তারা ভীত হয়ে পড়লো। আসলেই সেটা ছিল এরকম ঘটনার সূচনা মাত্র।"

ভারত ছাড়ার পর রবওয়া আহমদিয়াদের জন্য একটি নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা ছিল। হয়তো পুরো পাকিস্তানে এটাই এখনো তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, কিন্তু সহিংসতার হুমকি সবসময়েই তাদের মাথার উপর থেকেছে।

আহমদিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিভিন্ন হামলায় নিহত আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের ছবি ঝুলছে পাঞ্জাবের আহমদি জাদুঘরে।

শহরের প্রবেশমুখে কংক্রিটের দেয়াল আর কবরস্থানে অসংখ্য আহমদিয়ার কবর রয়েছে, যাদের মৃত্যু হয়েছে সন্ত্রাসী হামলায়। তবে এই সম্প্রদায় শুধুমাত্র উগ্রপন্থীদের হামলারই শিকার হয়েছে তা নয়, তারা লক্ষ্য হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রেরও। ১৯৭৪ সালে তাদের অমুসলিম বলে আইনত ঘোষণা দেয়া হয়। এখনো তারা প্রকাশ্যে কোন প্রার্থনা করতে পারে না।

"এখন আমার মনে হয়, আমরা যদি তখন ভারতে থেকে যেতাম, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য বেশি ভালো হতো। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের আইনের পর আমার পরিবারের লোকজন কতটা কষ্ট পেয়েছে, সেটা আপনাকে বোঝাতে পারবো না।"

তবে এই সম্প্রদায়ের বয়োজেষ্ঠ্যরা ইতিবাচকভাবে ভাবতে চান। তারা বলছেন, সবার আগ্রহেই এখানেও জাকজমকভাবে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাকালীন অন্যতম নেতা ও প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান ছিলেন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের। স্বাধীন দেশ হিসাবে দেশটির লক্ষ্য তুলে ধরার বিবৃতি লিখতেও তিনি সহায়তা করেন। লেখক ওসমান আহমদ বলছেন, পাকিস্তানে এখন অনেকেই তার নামও জানে না।

আব্দুস সালাম
ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানের নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ছিলেন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের।

"পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় আহমদিয়া নেতাদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা এখানে খুবই বাস্তব এবং শক্তিশালী প্রচেষ্টা। জাফরুল্লাহ খানকে নিজের রাজনৈতিক পুত্র বলে আখ্যায়িত করেছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এতেই বোঝা যায়, আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা কত বেশি ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আহমদিয়া সম্পদায়ের এই মানুষগুলোকে ভুলে যাওয়া হয়েছে এবং এরকম ব্যাপার এখানে অসহিঞ্চুতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।"

তাদের অভিযোগ, এই সম্প্রদায়ের অন্য গুনী ব্যক্তিরা, যেমন পাকিস্তানের প্রথম নোবেল বিজয়ী আবদুস সালামও দেশে তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি পাননি।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার বার্ষিকীতে রবওয়াতেও অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু তাদের অনেকের মধ্যে স্বীকৃতির জন্য ব্যাকুল আবেদনও রয়েছে।

আরও পড়ুন: