রাস্তার খাবার কতটা নিরাপদ ঢাকায় ?

- Author, শায়লা রুখসানা
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় শহরগুলোর মত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকর বিভিন্ন সড়কের পাশে কিংবা ফুটপাথেও গড়ে উঠেছে অসংখ্য খাবারের দোকান। স্ট্রীটফুড বা পথ-খাবার হিসেবে একদিকে সহজলভ্য অন্যদিকে সস্তা হওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় এসব খাবার। রকম ভেদে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষই খাচ্ছেন । কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণার পর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ পথ-খাবারেই নানা ধরনের জীবাণু রয়েছে।
দিনের শুরুতে
ঢাকার ব্যস্ততম একটি বাণিজ্যিক এলাকার গলির মুখের চায়ের দোকানি অভ্যস্ত হাতে চা বানাচ্ছেন। দোকানি গফুর মিয়া বলছিলেন প্রতিদিন ৪/৫ শো লোকের চা বানাতে হয়। এত লোক শুধু একটি দোকানেই চা পান করছেন রোজ? তাহলে মোড়ে মোড়ে, ফুটপাথে অসংখ্য চায়ের দোকানে প্রতিদিন কত লোক আসেন?

দোকানিরা বলছেন, কর্মজীবীরা অফিসর কাজের ফাকে কিংবা শিক্ষার্থীরা ক্লাসের ফাঁকে একাধিকবারও আসছেন চা খেতে। কাপে চা বানাতে বানাতে হয়তো পলিথিনের ভেতর ঝুলিয়ে রাখা বিস্কুট বা কেক বাড়িয়ে দিচ্ছেন দোকানি। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কতটা সচেতন ক্রেতারা?
“আমরা যেহেতু ব্যাংকে কাজ করি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। ফলে এসব ফুটপাথের দোকানেই খেতে হয়। যদিও এটা খাওয়া ঠিক না। কারণ অনেক ধুলোবালি থাকে। অনেকসময় ঠিকমত কাপও ধুতে পারে না। আমরা হয়তো জেনেশুনেই ময়লা খাচ্ছি। কারণ কম টাকায় চা-বিস্কুট পেতে চাইলে ফুটপাথের দোকানই ভরসা”। বলছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক।
দুপুরবেলায় সালাদিয়া হোটেল
গুলশান এলাকার একটি গলিতে ফুটপাথের ওপর বসা একটি খাবার দোকানে আশেপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এমন কর্মজীবী মানুষেরা দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন।
ফুটপাথের ওপর একটি ভবনের দেয়ালকে একপাশে রেখে অন্যপাশে কাপড় ঝুলিয়ে বেষ্টনী দিয়ে তৈরি করা হয়েছ দোকানটি। এক সাথে ১৪/ ১৫ জন খাবার খেতে পারেন ।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাসের মাইনে পাওযার প্রথম দিকে হয়তো সহকর্মী বা বন্ধুদের সাথে ফখরুদ্দিন বা আশেপাশের অন্য কোনও রেস্তোরাঁয় খেতে যান । কিন্তু আয় আর ব্যয়ের লাগাম টানতে ফুটপাথের খাবারের কাছেই আবার ফিরতে হয় । কম খরচে খেতে হলে এই সালাদিয়া হোটেল ছাড়া আর কোনও উপায় নেই”।
কতটা নিরাপদ?
হোটেলটির কর্মীরা বলছেন, যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেন। ফিল্টার পানি দেয়ার ব্যবস্থা করেন। তবে গবেষকরা বলছেন, রাজধানী ঢাকার ৫৫ শতাংশ পথ-খাবারে নানা ধরনের জীবাণু রয়েছে। বিক্রেতাদের ৮৮ শতাংশের হাতেই থাকে নানান জীবাণু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন একজন বিক্রেতা গড়ে প্রায় দেড়শো জনের কাছে পথ-খাবার বিক্রি করেন। এসব খাবারের মধ্যে আরও রয়েছে চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ি, পিঠা, রুটি পরোটা, শরবত, ডিম-সেদ্ধসহ নানান খাবার।
আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআরবির গবেষকরা বিক্রেতা কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেখেছেন অধিকাংশ খাবারে প্রচুর জীবাণু রয়েছে। এর প্রধান কারণ বিক্রেতাদের অসচেতনতা।
আইসিডিডিআরবির সহযোগী বৈজ্ঞানিক ড আলেয়া নাহিদ জানান, “পথ-খাবার যারা বিক্রি করেন তাদের বসার কোনও নির্দিষ্ট জায়গা নাই। তারা ফুটপাথেই বসছে। ফলে ধুলোবালি জীবাণু সহজেই মিশে যাচ্ছে। তারা পানি বহন করছে না। খাবার বানাচ্ছে হাত দিয়ে। কিন্তু হাত ধুতে পারছে না। ফলে তাদের হাত থেকে রোগজীবাণু মিশে যাচ্ছে খাবারে”।
পথের ধারে চটপটি-ফুচকা
অন্যদিকে আরেকদল শখের কারণে প্রতিনিয়ত খাচ্ছেন এসব খাবার। রাস্তার পাশে শীতের বিভিন্ন পিঠা থেকে শুরু করে চটপটি ফুচকার জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ দেয়। রাস্তার পাশে বসা চেয়ারে বসে ফুচকা চটপটি খেতে খেতে অনেকেই বলছিলেন রাস্তার ধারের এই খাবার ঘরে তৈরি করলেও এমন স্বাদ মেলে না।
স্ব্যাস্থ্যঝূঁকি

গবেষকরা বলছেন, প্রায় নব্বই ভাগ বিক্রেতার হাতেই জীবাণু থাকে। আলেয়া নাহিদ বলেন, টাইফয়েড, আমাশয়, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে খাদ্য এবং পানি-বাহিত যেকোনো রোগের কারণ হতে পারে এইসব খাবার। । তিনি বলেন, “ লাখ লাখ বিক্রেতার আচরণ পাল্টানো সহজ নয়। তবে পাইলট পদ্ধতিতে তাদের সচেতন করে এবং নিরাপদ খাদ্য আইনের সংস্কার করে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। তাদের কোনোভাবে নিবন্ধিত করে মান তদারকি করা যায় কি-না ভাবতে হবে”।
সচেতনতা দরকার আগে:ডিসিসি
আইসিডিডিআরবির গবেষকরা বলছেন পরীক্ষামূলকভাবে পানি এবং হাত বিশুদ্ধ রাখার বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করে তারা দেখেছেন জীবাণু সংক্রমণ অনেক কমে গেছে। বিক্রেতাদের সচেতন করতে পারলে এই জীবাণুর সংক্রমণ কমানো যায় । তাই দ্রুত এসব পথ-খাবার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা।

তবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের উত্তর ও দক্ষিণ সিটি অঞ্চলের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকা এই স্ট্রিটফুড বা পথ-খাবারের মান তদারকিতে একটি বড় সমস্যা এগুলো ভ্রাম্যমান । হোল্ডিং নম্বর না থাকায় তাদের ট্রেড লাইসেন্স দেয়া সম্ভব নয়।
ডিসিসি উত্তরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, ফুডকার্ট তৈরির মাধ্যমে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এ ধরনের দোকান বসানোর চিন্তাভাবনা করছেন তারা। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগ দরকার বলে জানান ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আনছার আলী। তবে তারা মূলত সচেতনতা বাড়ানোর দিকেই এখন মনোযোগ দিচ্ছেন বলে জানান মি আলী।
তিনি বলেন, “বিক্রেতাদের উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত খাবার নিরাপদ রাখার বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ শুরু করছি আমরা। সেইসাথে যারা খায় যেমন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং ক্রেতাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। তবে বেসরকারি কোম্পানি ফুডকার্ট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে আমরা রেজিস্ট্রেশন দিতে পারি”।








