দেড় বছরেও উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া হাজারের বেশি অস্ত্র, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

পুরস্কার ঘোষণা করেও লুটের সব অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুরস্কার ঘোষণা করেও লুটের সব অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল, দেড় বছরেও সেগুলো পুরোপুরিভাবে উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের এখনও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্রপাতি উদ্ধার না হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

যদিও খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে গত ১৭ মাসে দফায় দফায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে সেনা-পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। এমনকি লুণ্ঠিত অস্ত্রের সন্ধান পেতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারও ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

কিন্তু এতসব তোড়জোড়ের পরও অস্ত্র উদ্ধারে আশানুরূপ সফলতা পাওয়া যায়নি। হাতবদল হয়ে অনেক অস্ত্র অপরাধীদের কাছে চলে গেছে বলেও জানা যাচ্ছে।

"লুট হওয়া অস্ত্রগুলো গত দেড় বছরে পুরোপুরি উদ্ধার হওয়া উচিৎ ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটের আগে অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন হতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।

জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরেও পুরোপুরিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ বাহিনী। এ অবস্থায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এর মধ্যেই নির্বাচনের আগে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটছে, যা ভোটারদেরকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

"এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে কীভাবে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, সরকারের উচিৎ সেটা ভোটারদের সামনে তুলে ধরা। কারণ নিরাপত্তা ইস্যুতে আশ্বস্ত করা না গেলে তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে আনা কঠিন হয়ে উঠবে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম।

২০২৪ সালের ছয়ই অগাস্টে তোলা ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার ছবি
ছবির ক্যাপশান, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর দেশের অনেক থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে

কী কী অস্ত্র লুট হয়েছিল, কত উদ্ধার হল?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষোভ জন্ম নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চারশ'র বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

একইসঙ্গে, গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অস্ত্রপাতিও লুট হয়।

হামলাকারীরা তখন সবমিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখের মতো গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল পুলিশ।

তবে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, গণ অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৬১৯টি।

সেইসঙ্গে, লুটকারীরা চার লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গোলাবারুদ নিয়ে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি।

লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে চায়নিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দুক, সাব মেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগানসহ আরও নানান ধরনের অস্ত্র ছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ অভিযান শুরু করে সেনা-পুলিশের সময়ন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী।

গত দেড় বছরে দুই হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান সেনাপ্রধান, যা লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৬২ দশমিক চার শতাংশ।

এছাড়া প্রায় দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুটকৃত গোলাবারুদের প্রায় ৫২ শতাংশ।

বাকি অস্ত্র উদ্ধারে গত জানুয়ারিতে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে সরকার।

এর মধ্যে এলএমজি'র সন্ধান দেওয়ার জন্য পাঁচ লাখ, এসএমজি'র জন্য দেড় লাখ এবং চায়নিজ রাইফেলের জন্য এক লাখ টাকা করে পুরষ্কার দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।

এছাড়া পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতি রাউন্ড গুলির সন্ধানের জন্য ৫০০ টাকা করে দিতে চেয়েছে সরকার।

নিরাপত্তাকর্মীরা ব্যালটবক্স নিয়ে যাচ্ছেন

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে

লুটের অস্ত্র অপরাধীদের হাতে

থানা থেকে পুলিশের যেসব অস্ত্র ও গুলি লুট হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক অস্ত্র ও গুলি গত দেড় বছরে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, এমনকি মানুষ হত্যার মতো অপরাধ কাজেও ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর মধ্যে গত বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে খুলনা থেকে আটক দুই ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশের ব্যবহৃত দু'টি পিস্তল, একটি শটগান এবং বেশকিছু গুলি উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, আটক ব্যক্তিরা লুটের ওইসব অস্ত্র ও গুলি চাঁদাবাজিসহ নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছিল।

এ ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে চট্টগ্রামে থেকেও লুটের বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। সেগুলোরও ছিনতাই ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে জানানো হয়।

এছাড়া ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় শাহিদা আক্তার নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি এলাকার এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে মরদেহ উদ্ধার কর পুলিশ।

তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট করা পিস্তল দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে।

পরে হত্যাকারীকে গ্রেফতার করে সেই পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ।

"লুটের যেসব অস্ত্র সাধারণ অপরাধীদের হাতে পড়েছে, তারাই ছিনতাই-ডাকাতির মতো ঘটনায় সেগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক অস্ত্র হাত বদল হয়ে উগ্র গোষ্ঠীগুলোর কাছেও চলে যেতে পারে। সেটি ঘটে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে," বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।

একই কথা বলছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা।

"খোয়া যাওয়া অস্ত্র সব সময়ই নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকে। কারণে সেগুলো কাদের হাতে পড়েছে এবং তারা কী উদ্দেশ্যে সেটার ব্যবহার করতে চাচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. হুদা।

২০২৪ সালের আটই অগাস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০২৪ সালের আটই অগাস্ট ক্ষমতাগ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার

নির্বাচন ঘিরে 'বাড়তি উদ্বেগ'

অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলানায় এবারের সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

"এই বাড়তি উদ্বেগের একটা বড় কারণ হলো পুলিশ বাহিনীর দুর্বল অবস্থান। সাধারণ মানুষ এখনও তাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

জুলাই গণ অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের সদস্যরা অনেক জায়গায় হামলা ও হত্যার শিকার হন। এ অবস্থায় একদিকে বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সেইসঙ্গে পুলিশের সদস্যরাও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর পুলিশকে মাঠে ফেরানো গেলেও গত দেড় বছরে বাহিনীটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

"পুলিশের এই দুর্বল অবস্থানের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, কিন্তু পুলিশের সদস্যরা সেখানে কতটা শক্ত ভূমিকা পালন করতে পারবেন, সেটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ঠ অবকাশ রয়েছে," বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবার ৫১টি দল ভোটে অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ।

"একটা বড় দল হওয়ার পরও নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ফলে তারা নির্বাচন পণ্ড করার চেষ্টা করতে পারেন। এটা এবারের নির্বাচনের আরেকটা বড় ঝুঁকি করতে পারে," বলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

পুলিশ বাহিনীর ছবি

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দেড় বছরেও পুরোপুরিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ বাহিনী

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে 'নতুন মাত্রা'

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার মধ্যে লুটের সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

"সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানোর পরও লুটের অস্ত্র ও গুলির বড় একটা অংশ জমা পড়েনি। কাজেই এটা পরিষ্কার যে, যাদের কাছে অস্ত্রগুলো রয়েছে, তারা সেগুলো ভালো কোনো উদ্দেশ্যে রাখেনি," বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

"সুযোগ পেলেই তারা অস্ত্রগুলোকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের মৌসুমকে তারা সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে," যোগ করেন মি. ইসলাম।

ইতোমধ্যেই একাধিক প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্যপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে।

"প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপরেও হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনগণকে নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রার্থীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহু প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র রাখার লাইসেন্স।

'অপারেশন ডেভিল হান্টের ছবি

ছবির উৎস, RAZIB

ছবির ক্যাপশান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অব্যাহত অবনতির মুখে 'অপারেশন ডেভিল হান্ট' নামে দু'দফায় বিশেষ অভিযান চালিয়েছে সেনা-পুলিশের যৌথ বাহিনী

"কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যারা লাইসেন্স পাচ্ছেন তাদের অনেকেই অস্ত্র ঠিকমত ব্যবহারও করতে জানেন না। ফলে সেটা অন্য কারো হাতে চলে যেতে পারে। সেটার চেয়ে বড় কথা, নির্বাচনের সময় একজন প্রার্থীর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার অর্থ হলো প্রতিপক্ষের ওপর তাকে এক ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া। এটাও ভালো কোনো আলামত নয়," বলছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মি. ইসলাম।

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরের শাসনামলে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, গত ১৭ মাসে গোলাগুলির বিভিন্ন ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত এবং ১৩৭ জন আহত হয়েছেন।

এসব ঘটনায় নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

"নির্বাচনের সময়েও যদি মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়, তাহলে তারা ভোটকেন্দ্র যাওয়ার ব্যাপারে কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটা একটা বড় প্রশ্ন," বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী
ছবির ক্যাপশান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (ফাইল ছবি)

সরকার কী বলছে?

থানা থেকে লুট হওয়া এক তৃতীয়াংশেরও বেশি অস্ত্র এবং প্রায় অর্ধেক গোলাবারুদের সন্ধান এখনও পায়নি পুলিশ।

এতে নিরাপত্তা প্রশ্নে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় নির্বাচনের আগেই অস্ত্রগুলো উদ্ধারের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও বিবিসি বাংলাকে জানানো হয়েছে যে, লুটের অস্ত্রসহ অবৈধ সকল অস্ত্র উদ্ধারে তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

"কিন্তু নির্বাচনের আর মাত্র অল্প কয়েকদিন বাকি রয়েছে। সেজন্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, গত দেড় বছরে যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি, এই অল্প কয়েক দিনের মধ্যে কি সেটা সম্ভব হবে?" বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম।

তবে উদ্ধার করা না গেলেও নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রাখা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

"সেক্ষেত্রে অস্ত্রগুলো যেন ব্যবহার হতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাটা জরুরি। বিশেষ করে, নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের এ বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে এবং তৎপরতা দেখাতে হবে," বলছিলেন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা।

বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে লুটের অস্ত্র যাতে নির্বাচনকালে ব্যবহার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

"যে অস্ত্রগুলি লুট হয়ে গেছে আমাদের থানা থেকে, ওই অস্ত্র কিছু আছে যা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই। বাট (কিন্তু) এই অস্ত্রগুলি ইলেকশনের (নির্বাচনের) সময় এরা ব্যবহার করতে পারবে না। এই প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি," গত ১৮ই জানুয়ারি রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেন মি. চৌধুরী।

এবার নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সেনা, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় নয় লাখ সদস্য মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছে সরকার।

"তারা সবাই সতর্ক অবস্থানে থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। কিন্তু কোনো কারণে যদি সেটার ব্যত্যয় ঘটে, সেক্ষেত্রে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান।