সংসদ অভিযোগ তদন্ত করবেনা : আইনমন্ত্রী

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বাংলাদেশ সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন অভিশংসনের ক্ষমতা পেলেও সংসদ বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের সুযোগ পাবেনা।
তবে বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেছেন বাংলাদেশের বাস্তবতায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সংসদকে অভিশংসনের ক্ষমতা দিলে তা অরাজক অবস্থার তৈরি করবে।
আজ ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে আরও আলোচক ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাতেমা আনোয়ার ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
সংলাপে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের কার্যক্রম আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখার, মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের মতো ইস্যুগুলোও আলোচনাও উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন ইলরা জেবিন। তিনি জানতে চান বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদকে দিতে সংবিধানের প্রস্তাবিত ১৬তম সংশোধনী কি বিচার ও শাসন বিভাগের সংঘাতকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ?
জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, “সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অযোগ্যতার অভিযোগ আসলে তা তদন্ত করে সংসদে পাঠাবে।”
তিনি আরও বলেন, “মূলত দুটি কারণে অভিশংসন হতে পারে আর তা হল অসদাচরণ ও অযোগ্যতা। তবে যেহেতু নালিশ ও বিচার সংসদ করবে তাই তদন্তের ক্ষমতা সংসদের থাকবেনা।
মিস্টার হক বলেন, “এ সংক্রান্ত আইনটি হয়ে গেলে কিছু লোকের মধ্যে এ নিয়ে যে উদ্বেগ আছে তা শেষ হয়ে যাবে।”
তবে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সংসদ অভিশংসনের ক্ষমতা পেলে তা বিচার ও শাসন বিভাগের মধ্যে সংঘাত উস্কে দেবে।”
মিস্টার আহমেদ বলেন বর্তমান সংসদের হাতে এ ধরনের ক্ষমতা দেয়া ঠিক হবেনা কারণ এ সংসদ নির্বাচিত নয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ফাতেমা আনোয়ার বলেন একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদ এ ক্ষমতা পেতে পারতো। কিন্তু সে ধরনের বৈধতা বর্তমান সংসদের আছে কি-না তা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মিস আনোয়ার বলেন, “যে প্রশ্ন এই আইন পাশ হচ্ছে যে বিচারকদের জবাবদিহিতা দরকার। তো সেই জবাবদিহিতা জনগণের কাছে। এখন আপনি কি বলবেন বর্তমান সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে?”
আনু মোহাম্মদ বলেন সব কিছু প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রিক। সে কারণেই তিনি মনে করেন সংসদ অভিশংসনের ক্ষমতা পেলেও সংসদ সদস্যরা স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেনা।
তিনি বলেন, “বিচারপতিদের উপর এ ক্ষমতা সংসদ নিজে গ্রহণ করলে বিচার বিভাগ বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব থাকবেনা। এটা খুবই বিপদজনক সংকেত দেশের জন্য। কারণ নির্বাহী বিভাগ ভুল করলে বা জনগণ অসন্তুষ্ট হলে তাদের একমাত্র ভরসা থাকে বিচার বিভাগ।”
একজন দর্শক বলেন, “জনগণের দ্বারা যারা নির্বাচিত নয় তারা কিভাবে বিচার বিভাগের দায়িত্ব নেয়?”
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গ
মেহেদী হাসান জানতে চান গুম, খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সরকারের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাহলে কি সরকার আইন শৃঙ্খলার অবনতির বিষয়টিকে হালকা ভাবে দেখছে ?
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘোরতর অবনতি হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোই এর প্রমাণ। রাজনীতিতে চরম দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। খুনিরা ভয় পাচ্ছেন। আরও একটা ব্যাপার আছে যে খুন করলেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দেবেন।”
তিনি বলেন, “বড় বড় গডফাদাররা একটি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এখন খুন-বান্ধব পরিবেশ এবং অপরাধ-বান্ধব সরকার রয়েছে। যে কারণেই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।”
আনু মুহাম্মদ বলেন, “আওয়ামী লীগের মধ্যকার গ্রুপগুলোই মারামারি করছে, একে অন্যকে খুন করছে। এখন প্রফেশনাল খুন একটা পেশা। সঙ্গে যোগ হয়েছে পুলিশ র্যাব।”
একজন দর্শক বলেন, “নারায়ণগঞ্জের সাত খুন ও মগবাজারের হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারের ব্যর্থতা আছে বলে সবাই মনে করে কি-না সেটা জানতে চাই।”
ফাতেমা আনোয়ার বলেন, “এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু তদন্তের কোন ফল দেখছিনা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আস্থা চলে যাচ্ছে। মানুষ গুম হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে এসব অনেক বেড়ে গেছে।”
মন্ত্রী বলেন, “হত্যা খুন হতে দেয়া উচিত না। এটা নিরসনের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। অপরাধীকে ধরার মাধ্যমে আস্থা ও সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যাবে। এখনো তদন্ত চলছে।”
তিনি বলেন, “সরকার এগুলো হালকা ভাবে নিচ্ছেনা। মানুষের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সরকার।”
বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে দায়মুক্তি
আরিফ মোল্লা জানতে চান সংকট সমাধানের কথা বলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের কার্যক্রমকে আরও চার বছর আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক?
মন্ত্রী বলেন, “একটি জরুরী পরিস্থিতিতে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের অবসানের সুবিধার্থে বা চাহিদা দ্রুত মেটানোর জন্য এ আইনটি করা হয়েছে। আদালতে প্রশ্ন তুলতে পারবেনা কারণ এটি জরুরী অবস্থা।”
মন্ত্রী অবশ্য বলেন কেউ দুর্নীতি করলে তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করা যাবে।
তিনি বলেন, “এখন লোডশেডিং নেই। সাত হাজার মেগাওয়াট সরবরাহ করা যাচ্ছে। তবে আইনে যাই বলা হোক স্বচ্ছতার ব্যত্যয় হলে কথা বলা যাবে।”
আনু মুহাম্মদ বলেন, “আমরা আগেই বলেছিলাম যে আইনটির অর্থ হচ্ছে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম ও দুর্নীতি বেড়ে যাবে।বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেনি। উঠেছে রেন্টাল প্লান্ট নিয়ে।”
তিনি বলেন, “এ আইন করে দেশী বিদেশী কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। জ্বালানী সরবরাহ আইন বলা হলেও এটা হল দ্রুত লুণ্ঠন ও দায়মুক্তি আইন।”
ফাতেমা আনোয়ার বলেন, “এসব পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতের জন্য খারাপ নজির হচ্ছে। বিদ্যুৎ বড় খাত, এখন এমন সব বড় খাতকেই যদি এভাবে দায়মুক্তি দেয়া হয় সেটি তো ভালো হবেনা।”
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও দুর্নীতি বেড়েছে অনেকগুণ। এভাবে আগে থেকে দায়মুক্তি দেয়া সঠিক পদক্ষেপ নয়। ”
দলীয় লোকদের অর্থ আয়ের সুযোগ দিতে এবং তাদেরকে দুর্নীতির সুযোগ করে দিতেই এ ধরনের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গ
মো: ফয়সাল রহমান জানতে চান মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রমে বেশ কিছু মামলার রায় দেয়া হঠাৎ করে থমকে গেছে কেন ?
ফাতেমা আনোয়ার বলেন, “সবার মনে প্রশ্ন জাগছে এতো দ্রুত করা হল নির্বাচনের আগে, আর এখন অগ্রাধিকার কমে গেল কিনা। রাজনৈতিক কারণে সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা।”
আনু মুহাম্মদ বলেন, “বিচার নিয়ে পেছনের খেলায় সংশয় অর্থাৎ কোন সমঝোতা হচ্ছে কিনা সেকারণেই গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম হয়েছিলো। কখনো দ্রুত হচ্ছে, কখনো ঝুলে যাচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হচ্ছে।”
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন রায় প্রদান বিলম্বিত হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে। অভিযুক্তরা জামায়াতের। তারা আওয়ামী লীগের সাথে থাকলে তাদের বিচার হতোনা। আন্দোলন থেকে জামায়াত দুরে থাকলে রায় প্রদান বিলম্বিত হবে।”
মন্ত্রী বলেন, “অনেক মামলার কাজ চলছে। ট্রাইব্যুনালে ৫/৬ টি মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির সাথে এ বিচারের কোন সম্পর্ক নেই।”









