সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক হলো সংলাপে

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন গণমাধ্যমে সমালোচনার ভয়েই সরকার সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
তবে সরকারের একজন মন্ত্রী এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেছেন প্রয়োগের আগে কমিশনের মাধ্যমে নীতিমালাটি প্রয়োজনীয় সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে পরিশীলিত করা হবে।
এছাড়া সাম্প্রতিক লঞ্চ ডুবি ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়গুলোও সংলাপের এবারের পর্বে আলোচনায় উঠে এসেছে।
পাঁচ সপ্তাহের বিরতির পর ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে বাংলাদেশ সংলাপের এবারের পর্বে আলোচক ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য এম এম আকাশ এবং গণমাধ্যম বিশ্লেষক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন শাফিনা পাসমিনা।
তিনি জানতে জানতে চান আর কত মৃত্যু হলে সরকার লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন সহ বিদ্যমান অনিয়মগুলো দূর করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ?
জবাবে মতিয়া চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে এটাই প্রথম দুর্ঘটনা নয়।তবে এবার দুর্ঘটনার পর সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা চলছে এবং নৌ মন্ত্রী সার্বক্ষণিক তদারকি করেছেন।”
তবে একি সঙ্গে মন্ত্রী যাত্রীদেরকেও সচেতনতার দিকেও গুরুত্ব দেয়ার আহবান জানান।
এম এম আকাশ বলেন এসব ঘটনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতার অভাব হলো প্রধান সমস্যা।
তিনি বলেন এ ধরনের ঘটনায় এ পর্যন্ত আট শতাধিক তদন্ত কমিটি হয়েছে কিন্তু কোন কমিটিরই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।
একজন দর্শক বলেন, “দুর্ঘটনা হলেই কেবল নানা ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। সারা বছর ধরেই কেন এসব উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন হয়না।”
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “সরকারের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধ বা এসব ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশ এখনো আয়ত্ত করতে পারেনি।”
তিনি বলেন মন্ত্রণালয়কে সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিত। সাধারণত দুর্ঘটনা হলে সরকার তৎপর হয় কিন্তু পরে আর এ তৎপরতা থাকেনা।
হান্নান শাহ বলেন, “বর্তমান সরকার অতীতের ধারাবাহিকতার বাইরে আসতে পারবে বলে মনে হয়না। তদন্ত রিপোর্ট গুলো প্রকাশ করে দায়ীদের বিচারের ব্যবস্থা করা দরকার। লঞ্চ মালিকদেরও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা উচিত।”
সম্প্রচার নীতিমালা প্রসঙ্গ
মো: রুস্তম আলী জানতে চান সরকার যে সম্প্রচার নীতিমালা ঘোষণা করেছে তাকে কি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে ?
জবাবে আ স ম হান্নান শাহ বলেন সরকার গণমাধ্যমকে ভয় পায় বলেই এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।
তিনি বলেন, “সংবাদ পত্র বা টেলিভিশন দেখাবে কি? শুধু ওয়াজ মাহফিল নাকি ঈদের কেনাকাটা ? রাস্তায় যদি আন্দোলন করি সেটা দেখাবেনা ? জনগণের কি অধিকার নেই সরকার বা বিরোধী দল কি করছে সেটি দেখার।”
তিনি আরও বলেন সংবিধানে কথা বলার ও গণমাধ্যমের যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে সেটাকে খর্ব করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে কৃষিমন্ত্রী বলেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই বেসরকারি টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন সম্প্রচার নীতিমালা হলো।
তিনি বলেন, “কমিশনে কিন্তু সব স্তরের লোকই থাকবে। অনেক কিছুই সংযোজন বিয়োজন হবে। তবে কাবা শরীফের গিলাফকে সাঈদী মুক্তির দাবি হিসেবে প্রচার করা হবে আর কিছু বলা হবেনা, এ ধরনের বানোয়াট সাংবাদিকতা সবসময়ই পরিত্যাজ্য।”
আলোচনায় অংশ নিয়ে এম এম আকাশ বলেন সম্প্রচার নীতিমালা সব দেশেই থাকে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিভাবে প্রয়োগ হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “আমরা মিথ্যা প্রচার, কুৎসা রটনা, ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত বা রাষ্ট্রীয় আদর্শের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা ইতিহাস বিকৃতি চাইনা। কিন্তু পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা অন্যায় করবে আর তুলে ধরতে পারবোনা সেটা তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে সেজন্য সত্য বলা যাবেনা, তাতো হবেনা।”
অপর আলোচক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন সরকার যদি এ নীতি বাস্তবায়নে সক্রিয় হয় তাহলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকবে।
তিনি বলেন, “ নীতিমালার মধ্যে অনেক ধারা উপধারা আছে যার অপপ্রয়োগ হতে পারে। যার মাধ্যমে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়ে গেছে।”
একজন দর্শক বলেন, “সরকারের অপকর্মগুলো যাতে জনগণের কাছে না আসে সেজন্যই এ নীতিমালা হয়েছে।”
গাযায় বাংলাদেশের ভূমিকা কি হতে পারে
সুলতানা চাঁদনী জানতে চান গাযায় ইসরায়েলী অভিযানে প্রচুর সংখ্যক ফিলিস্তিনির মৃত্যুর ঘটনায় প্রভাবশালী দেশগুলোর নির্লিপ্ত থাকায় তাদের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কী ধরণের ভূমিকা রাখতে পারে?
হান্নান শাহ বলেন, “বাংলাদেশ থেকে করার অনেক কিছু আছে। এসব ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে।”
তিনি বলেন গাজা উপত্যকার মানুষের জন্য ত্রাণসামগ্রী পাঠানো যেতে পারে।জাতিসংঘের মাধ্যমে চিকিৎসক দল পাঠাতে পারে।
এম এম আকাশ বলেন, “সরকার ও বিএনপি এক সঙ্গে মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে প্যালেস্টাইন নীতির পক্ষে সংহতি সমাবেশ করতে পারেন।”
একজন দর্শক বলেন, “ওআইসিকে সক্রিয় করতে বাংলাদেশ উদ্যোগ নিতে পারে কিনা।”
মুহম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “বাংলাদেশে সব সংগঠন পথে নামেনি। একটা সুযোগ ছিল রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানানোর। প্রবাসী বাংলাদেশীরা একটা ভূমিকা পালন করতে পারে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে ভবনের সামনে।”
মতিয়া চৌধুরী বলেন, “সংসদীয় দল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা সেখানে যাওয়ার উদ্যোগ নিবেন। তবে এজন্য কিছু প্রক্রিয়া আছে। প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া প্রতিবাদ করেছেন। ওআইসিকে সক্রিয় করতে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। তবে এ ঘটনায় আরব বিশ্বের যে ঐক্য আশা করেছিলাম সেটা নেই। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে কিছু দ্বিধা আছে। এ দ্বিধা কাটিয়ে উঠার আহবান জানাবো।”
মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গ
সেলিম আহমেদ জনি জানতে চান সরকারের অনেক মন্ত্রী ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে নিয়মরক্ষার নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কি আদৌ মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রয়োজন আছে?
এম এম আকাশ বলেন নির্বাচনের রাজনৈতিক কৌশলের খেলায় বিএনপি হেরে গেছে কিন্তু আওয়ামী লীগের নৈতিক পরাজয় হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন হবেনা কারণ আন্দোলন করে তা আদায়ের ক্ষমতা বিএনপির নেই।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “ দেশের অস্বস্তিকর রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের প্রয়োজন রয়েছে।”
হান্নান শাহ বলেন ৫ই জানুয়ারি বেশির ভাগ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তাই একটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে সঠিক করার জন্যই একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রয়োজন।
তবে কৃষিমন্ত্রী বলেন এ ধরনের কোন নির্বাচনের সুযোগ এখন নেই। তিনি বলেন সংবিধান অনুযায়ী সময়মত পরবর্তী নির্বাচন হবে।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর বক্তব্যে সেদিন এটা পরিস্কার ছিল যে গণমাধ্যমের অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্যেই এই নীতি প্রণয়ন হচ্ছে। তারপরেও সরকার কি করে এই কথা অস্বীকার করে। সংক্ষেপে এর অর্থ দাড়ায় বাকশাল নীতি। কারন সরকার গণমাধ্যমকে অত্যন্ত ভয় পায়,যেহেতু গণমাধ্যমের কারনে সরকারের অনেক অপকর্ম জনগণ জানতে পেরেছে।








