নির্বাচন দেয়ার ভয়ে সংলাপ চায়না সরকার : বিএনপি

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বেসরকারি সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড: আহসান মনসুর, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বেসরকারি সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড: আহসান মনসুর, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন নির্বাচন হলে পরাজয় নিশ্চিত-এ ভয়েই সংলাপে রাজী হচ্ছেনা সরকার।

তবে সরকারের একজন মন্ত্রী বলেছেন সংলাপ আয়োজনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়নি এবং এর প্রয়োজনীয়তা আরও পরে সৃষ্টি হবে।

শনিবার ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেয়ার প্রস্তাব, সমুদ্রপথে অভিবাসন এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় ভিনদেশী পতাকা উত্তোলনের বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।

সংলাপের এবারের পর্বে আলোচক ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন এবং বেসরকারি সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড: আহসান মনসুর।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন মো: ইলিয়াস মিয়া। তিনি জানতে চান সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তাঁর এই প্রস্তাব কি রাজনৈতিক সংলাপের লক্ষ্যে একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করলো?

জবাবে মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন সংলাপের কথা বলা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ বিদেশী বন্ধুদের সন্তুষ্ট করার জন্য। তার দাবি সংলাপের জন্য কার্যকর কোন ক্ষেত্র এখনো বাংলাদেশে তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, “এ মূহুর্তে এমন কোন প্রশ্ন আসেনি যা দিয়ে সংলাপ হতে পারে। এটা আসবে আরও কিছুদিন পর যখন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।”

মন্ত্রী বলেন, “ তারা আন্দোলনের কথাও বলছেন আবার নির্বাচনের কথাও বলছেন। আন্দোলনের মাধ্যমে হলে সেটা করেই তো তারা নির্বাচন মোকাবেলা করতে পারতো।”

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন বিএনপি আন্তরিকভাবেই সংলাপ চাইছে। কিন্তু সংলাপ হলে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দিতে হবে এ ভয়েই সরকার সংলাপ চাইছেনা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, “সংলাপে গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে যে নির্বাচনে সরকারের পরাজয় নিশ্চিত। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে গেছে। সে কারণে তারা নির্বাচনে যেতে চায়না।”

মিস্টার আহমেদ বলেন এখানে ট্র্যাডিশন হল রাজপথ উত্তপ্ত না হলে সরকার সংলাপে যেতে চায়না।তারা বাধ্য করছে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে যাওয়ার জন্য।”

তার দাবি সরকার সহিংসতার দিকে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে কেবল মাত্র তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মোহসিন বিএনপির সংলাপের প্রস্তাবকে ইতিবাচক আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, একটি সাজানো বিরোধী দল দিয়ে কোনভাবেই সংসদীয় গণতন্ত্র কার্যকর থাকতে পারেনা।

তিনি বলেন, “টেকসই গণতন্ত্র চাইলে সংলাপে আসতেই হবে। বিরোধী দলের শীর্ষস্থান থেকেই যেহেতু প্রস্তাব এসেছে মনে হয় একটি সুযোগ এসেছে।”

ড: আহসান মনসুর বলেন সংলাপ ছাড়া গতি নেই। কিন্তু মনে হয় সরকারি দলের কোন মনোভাব রয়েছে এ ব্যাপারে। সদিচ্ছা জনিত কারণে এটা না হলে হয়তো রাস্তায় গিয়ে ঠেকবে।

তিনি বলেন, “টেকসই গণতন্ত্রের স্বার্থে দুদলের উচিত হবে এখন পরিবেশ শান্ত থাকা অবস্থাতেই আলোচনা বসা। এ পরিবেশে সমঝোতা হলে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে।”

একজন দর্শক বলেন, সরকারি দলের উচিত সংলাপে বসে কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত আগামী দিনের জন্য। না হলে বিএনপি সহিংসতায় গেলে তার দায় সরকারের উপরও বর্তাবে।”

আরেকজন দর্শক বলেন, “দেশের পরিস্থিতি শান্ত থাকা অবস্থাতেই সংলাপ হোক।”

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি প্রসঙ্গ

মাকসুদুর রহমান জানতে চান ঋণ জালিয়াতিতে জর্জরিত রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে বাজেটের মাধ্যম পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার। কিন্তু এই অবস্থার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে কর দাতাদের অর্থ ব্যাংকগুলোকে দেয়া কতটা যৌক্তিক ?

জবাবে ড: আহসান মনসুর বলেন ব্যাংক সেক্টরে যা হচ্ছে সেটা সাধারণ কোন দুর্নীতি নয়।

তিনি বলেন, “ দিনে দুপুরে ডাকাতি হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। বেসিক ব্যাংকের বিষয়টা সবাই জানে আরও দু বছর আগ থেকেই। সরকারও জানে। কিন্তু কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।”

তিনি বলেন, “কিছু লোককে অপসারণ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু সেটিই হচ্ছেনা। এটি সুশাসনের ব্যর্থতা।”

একজন দর্শক বলেন, “অর্থমন্ত্রী বলেন তিন চার হাজার কোটি টাকা বিষয় না। তাহলে বিচার হবে কি করে?”

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি হচ্ছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের কারণেই এসব দুর্নীতি হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সরকার ব্যবস্থা নিতে পারছেনা কারণ সরকার নির্বাচিত নয় এবং তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই।”

মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে অর্থনৈতিক খাতে একটি চক্র গড়ে উঠেছে সেখানে সব দলের লোকজন রয়েছে। এটা হচ্ছে মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলাফল।”

তিনি বলেন, “হল মার্ক ডেসটিনি সহ সব কেলেঙ্কারির বিষয়েই সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। অনেককেই জেলে নেয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে।”

আমেনা মোহসিন বলেন, “একটা চক্র গড়ে উঠেছে রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। রাজনীতি একটা লাভজনক ব্যবসা হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর পর্ষদগুলো হয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক।”

সমুদ্রপথে অভিবাসন

বনশ্রী সরকার জানতে চান অবৈধপন্থায় সমুদ্রপথে অভিবাসন বন্ধে কি যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ?

আমেনা মোহসিন বলেন, “যারা যাচ্ছে, যে এজেন্সিগুলো পাঠাচ্ছে তাদেরও এগুলো দেখতে হবে। সরকার যে ব্যর্থ হচ্ছে সেটি তো বলা যায়। কিন্তু এজেন্সিগুলোকে মনিটর করার একটা বিষয় আছে।”

আহসান মনসুর বলেন, “লোকজন যেতে চায় কিন্তু যেতে পারছেনা বিদেশে। মধ্যপ্রাচ্যে নিয়মিত অভিবাসন প্রায় বন্ধ। মালয়েশিয়ায় কেউ যেতে পারছেনা। এ কারণেই সমুদ্রপথে ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছে

লোকজন। সরকার চাইছে নিয়ন্ত্রণ করতে। মালয়েশিয়ায় বেসরকারি উপায়ে অভিবাসন হচ্ছেনা।”

একজন দর্শক বলেন, “দালালরা ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় ভুক্তভোগীদের প্রভাবিত করে।”

মন্ত্রী বলেন, “বিভিন্ন দেশে অভিবাসন আইনের পরিবর্তন এনে অভিবাসন সংকুচিত করছে। দুবাইতে বন্ধ আছে। কাতারে সীমিত আকারে চলছে। এখন আমাদের অন্য দেশে বাজার খুঁজতে হবে। আফ্রিকায় বাজার পাওয়া গেছে। লোকজন যাচ্ছে সেখানে।”

তিনি বলেন, “বায়রা সরকারকে অসহযোগিতা করছে। সে কারণেই অবৈধ অভিবাসনের বিষয়গুলো আসছে। দায়িত্ব শুধু সরকার বা এজেন্সির নয়। সেটাও দেখতে হবে।”

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ ভালো ছিল কিন্তু সরকার ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যাতে বেশি মানুষ যেতে পারে সেটি সরকারকে দেখতে হবে।”

তিনি বলেন, “সরকারকে যত্নবান হয়ে অব্যবস্থা ও দুর্নীতি দুর করলে এ খাতে সুফল আসবে।”

বাংলাদেশে ভিনদেশী পতাকা

ফাতেমা আক্তার জানতে চান বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষও যখন মাতোয়ারা, তখন ভিনদেশী পতাকা নামিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়ার মধ্যে যৌক্তিকতা কতটুকু ?

হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে বিদেশী পতাকা নিয়ে মাতামাতি একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়। যখন বাংলাদেশ খেলে তখন তো এতো পতাকা উড়েনা।“

আমেনা মোহসিন বলেন, “এটা গণতান্ত্রিক অধিকার। একটা টীমকে সাপোর্ট করলে তার পতাকা উড়াতেই পারি।”

আহসান মনসুর বলেন, “এটা ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপার। সবাই যেন পতাকা উড়াতে পারে সে অধিকার দেয়া উচিত।”

রাশেদ খান মেনন বলেন, “বাংলাদেশের খেলার দিন পতাকা ও জার্সি নিয়ে অনেক মাতামাতি হয়। পতাকা আইন আছে কিন্তু সেটি যে খুব মানা হয় তা নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের পতাকার অবমাননা হচ্ছে বলে মনে করিনা।”

একজন দর্শক
ছবির ক্যাপশান, একজন দর্শক

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

সংলাপে গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে যে নির্বাচনে সরকারের পরাজয় নিশ্চিত। সে কারণে তারা নির্বাচনে যেতে চায়না।" আমি এ কথার সাথে একমত, কারন আওয়ামী লীগ নিজেরাই বলছে ওরা অবৈধ। এজন্য ওদের এ ভয় টা থাকা স্বাভাবিক।

মোত্তাকিন, ময়মনসিংহ।