সংলাপে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' নিয়ে বিতর্ক

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বেসিস এর সাবেক সহ সভাপতি এবং তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউ ওয়াই সিস্টেমস লিমিটেড এর প্রধান নির্বাহী ফারাহানা এ রহমান, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, কলম্বো ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবু সাঈদ খান এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বেসিস এর সাবেক সহ সভাপতি এবং তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউ ওয়াই সিস্টেমস লিমিটেড এর প্রধান নির্বাহী ফারাহানা এ রহমান, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, কলম্বো ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবু সাঈদ খান এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেত্রী বলেছেন সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া মূলত শ্লোগানই রয়ে গেছে। তার দাবি এ খাতে যেটুকু অগ্রগতি এসেছে তাতে বিশেষ কোন সরকারের অবদান নেই।

তবে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে।

তার দাবি সরকারের উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যেই অনেক অগ্রগতি হয়েছে।

ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ বিশেষ পর্বটির বিষয়বস্তু ছিল তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

এবারের পর্বে আলোচক ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ, বেসিস এর সাবেক সহ সভাপতি এবং তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউ ওয়াই সিস্টেমস লিমিটেড এর প্রধান নির্বাহী ফারাহানা এ রহমান এবং কলম্বো ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবু সাঈদ খান।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন নূরুল আমীন। তিনি জানতে চান ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য সরকার ঠিক করেছিলো সে লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে নাকি তা একটি শ্লোগান হিসেবে রয়ে গেছে ?

জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, “ধাপে ধাপে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ২০০৯ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। এ নীতিমালায় বলা হয়েছে ২০২১ সাল নাগাদ ডিজিটাল বাংলাদেশ করবো।”

তিনি বলেন, “এখন প্রতি মাসে ৪০ লাখ মানুষ ইউনিয়ন সেবা কেন্দ্র থেকে সেবা নিচ্ছেন। চার বছরের মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেয়া হবে।”

আবু সাঈদ খান বলেন, “ গ্রামাঞ্চলকে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। তবে ব্রডব্যান্ড কতদিনের মধ্যে কত শতাংশ লোক ব্যবহার করবে সে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়নি। সে হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগানই রয়ে গেছে।"

তবে তিনি মনে করেন তথ্য প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে এক করা সরকারের একটি অর্জন কারণ এজন্য এ খাতে কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিলো।

তিনি বলেন, “মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে কথা বলার সুযোগ ও টেলিযোগাযোগ সংযোগ এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে”।

ফারহানা এ রহমান বলেন, “ডিজিটাল বাংলাদেশ শ্লোগান আইটি সেক্টরকে মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এর ভিতরে আমরা এখনো ঢুকতে পারিনি”।

তিনি বলেন, “কানেটিভিটির মধ্যে অনেকটাই সফল হয়েছি ও ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করতে পেরেছি যেমন লোকাল সফটওয়্যার, আউটসোর্সিং, ই কমার্স, সরকারি প্রতিষ্ঠান অটোমাইজেশন”।

একজন দর্শক বলেন, “জনপ্রশাসন ছাড়া অন্য কোন মন্ত্রণালয় ই-ফাইল পদ্ধতি চালু করতে পারেনি সরকার।”

শামা ওবায়েদ বলেন, “কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে তবে এটা সময়ের চাহিদা কারণ এখন বিশ্বায়নের সুযোগ। এখানে কোন বিশেষ সরকারের কোন অবদান নেই। সরকারের দায়িত্ব প্রসেসগুলো সুগম করা।”

তিনি বলেন, “১৯২৮টি কলেজে ৫লাখের বেশি শিক্ষার্থী আছে। কিন্তু মাত্র ১৫৭টি কলেজে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবস্থা আছে।”

অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তি

মো: আতিকুর রহমান আহাদ জানতে চান এশিয়ার অনেক দেশ বিশেষ করে ভারত তার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বেশ সাফল্যের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কি সেই তুলনায় ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে ?

ফারহানা এ রহমান বলেন পলিসি করেছে সরকার কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি বলেই এ খাতে প্রত্যাশিত সফলতা আসেনি।

তিনি বলেন, “ভারতের মতো পারছিনা। কিন্তু আমরা ভালো কানেকটিভিটির মধ্যে রয়েছে। কিছু ট্রেনিং সরকার দিচ্ছে কিন্তু সেটিও যতটুকু প্রয়োজন সেটুকু আছে। আবার সরকারের ভেতরেও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার না করার কিছুটা প্রবণতা রয়ে গেছে।”

আবু সাঈদ খান বলেন, “ডিজিটাল সাফল্যের পূর্বশর্ত অবকাঠামো। ভারতে অবকাঠামোর জন্য যে বিনিয়োগ বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তেমনটি করা গেলে আমাদের সাফল্য কেউ ঠেকাতে পারবেনা।”

তিনি বলেন, “দেশব্যাপী ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার কেন যেতে পারবেনা ? প্রতিবন্ধকতা গুলো সরকার দুর করলে আমরা অবশ্যই উন্নত হবো।”

একজন দর্শক বলেন, “ভারত এগিয়েছে ই-কমার্সে। আমাদের দেশেও চেষ্টা হচ্ছে। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের চার্জ কমাতে সরকার কি ব্যবস্থা নিচ্ছে?”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রতিটি জেলা ও ১৯৭ উপজেলায় ফাইবার অপটিক কেবল লাইন পৌঁছিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি উচ্চ গতিসম্পন্ন। সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য যে মেরুদণ্ড দরকার সেটি সরকার করেছে। ২০১৫ সালের মধ্যে ৪৮৭ টি উপজেলায় উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হবে।”

তিনি বলেন, “যে পরিকল্পনা রয়েছে তাতে আগামী পাঁচ বছরে এক বিলিয়ন ডলার হবে আইটি খাতে রপ্তানি আয়। এখন যেটি দুশ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে। আগামী ৫ বছরে ৫৫ হাজার ফ্রি ল্যান্সার তৈরি করবো ও ৩৪ হাজার উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তিবিদকে প্রশিক্ষণ দিবো।

তিনি আরও জানান সারাদেশে এক লাখ হটস্পট করবে সরকার যাতে সাধারণ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে বিনা পয়সায়।

তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য শামা ওবায়েদ বলেন, “অবকাঠামো আর শিক্ষা মূল বিষয়। জনশক্তিকে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ তো নিতে হবে। সবসময় বিদেশ থেকে লোক এনে কাজ করা যাবেনা। ইন্টারনেট ফাইবার অপটিক কেবলের কাজ কেন মাত্র তিনটি কোম্পানি করছে।

আবু সাঈদ খান বলেন, “বাংলাদেশে সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দিতে মূল বাধা সরকার নিজেই। বেসরকারি উদ্যোগে সাবমেরিন কেবল আনার প্রক্রিয়ায় সরকারই বাধা দিয়েছে। সরকারি কোম্পানিকে কৃত্রিম ভাবে বাঁচিয়ে রাখতে সরকার বেসরকারি খাতকে বাধা দিচ্ছে”।

তার অভিযোগ কৃত্রিমভাবে আভ্যন্তরীণ ভাবে ব্যান্ডউইথ এর দাম বাড়িয়ে রাখা হয়েছে যে কারণে জেলা বা উপজেলায় ইন্টারনেট সেবা দাতাদের দেখা যাচ্ছেনা।

শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল মাইন্ডেড করা

শামা ওবায়েদ বলেন, “এটি হচ্ছেনা কারণ একদিকে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ নেই অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং এর নামে কি শিখছে সেগুলোর কোন

মনিটরিং হচ্ছেনা। শিক্ষকদেরই যদি প্রশিক্ষণ না থাকে তাহলে কি হবে।শিক্ষার বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিতে হবে।”

আবু সাঈদ খান বলেন, “শিক্ষক তৈরি করতে হবে প্রথমে। ডিজিটাল বিনিয়োগ করা উচিত শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনায়”।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “২০০৯ এ শুরু না করলে এখন কোথায় থাকতাম। অনেক ফ্রি ল্যান্সার এখন জেলায় গেছেন কারণ সেখানে ইন্টারনেট সংযোগ পাচ্ছেন। গত ৫ বছরে স্কুল কলেজে সাড়ে তিন হাজার কম্পিউটার ল্যাব এবং ২৩ হাজারের বেশি মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম করা হয়েছে”।

ফারহানা এ রহমান বলেন, “ইউজার তৈরি করতে হবে। ফেসবুক ইউজার বাড়ছে। কনটেন্ট ডেভেলপ করার বিষয়ে কোন বিনিয়োগ নেই। দক্ষ জনশক্তি খুবই সীমিত”।

প্রযুক্তি-বান্ধব প্রশাসন

নাজমুস শাকিব জানতে চান প্রযুক্তি-বান্ধব একটি প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন। সরকারের কি উচিত তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষতা নেই এমন জনশক্তি নিয়োগ বন্ধ করে দেয়া ?

আবু সাঈদ খান বলেন, “তথ্য প্রযুক্তিতে আরও শিক্ষিত করার ব্যবস্থা জনপ্রশাসনে যেন হয় সেটা করতে হবে।”

শামা ওবায়েদ বলেন, “প্রশিক্ষণ শুরু করতে হবে।”

ফারহানা রহমান বলেন, “দক্ষতা না থাকলে তো কাজ করা যাবেনা। সবাইকে তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে হবেনা তবে ইউজার হিসেবে দক্ষ হতে হবে।”

একজন দর্শক
ছবির ক্যাপশান, একজন দর্শক

প্রতিমন্ত্রী বলেন প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। পিএসসির সাথে আলোচনা চলছে যাতে আইসিটির বিষয়ে নূন্যতম জ্ঞান থাকার বিষয়টি দেখা যায়”।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

সবকিছু ডিজিটাল গতিতে চলছে তো।

ইউসুফ জাহিদ, ঢাকা।

বাংলাদেশের পলিসি ঠিক নাই। আইসিটিতে বিনিয়োগ নেই। ফ্রি ল্যান্সারদের জন্য সরকারের কোন বিনিয়োগ বা অর্থায়ন নেই। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের নীতি বন্ধুভাবাপন্ন নয়। ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর ঝামেলা, লােইসেন্স ঝামেলা।

হোসেন মো শাহিন, ঢাকা।

বিশ্বের যেসব দেশ তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের তুলনায় হাজার গুন এগিয়ে আছে তাদের মূখে ডিজিটাল শব্দটি উচ্চারিত হয়না। তাই বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষ গুলির মূখে ডিজিটাল শব্দ শুনে মনে হয় উনারা এই প্রযুক্তি বিষয়ে প্রথমই শুনলেন।

উন্নত তথ্য প্রযুক্তিতে সব কিছুই ভাল তা নয়, এখানে এমন অনেক কিছু আছে যাহা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক, ধ্বংস করে দিচ্ছে তরুন প্রজন্মকে সূতরাং প্রযুক্তিকে গ্রামগঞ্জে ছড়িয় দেয়ার বাহাদুরি নয় বরং নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজ ব্যবস্থাকে অটুট রেখে প্রজন্মকে কূসংস্কৃতি, কুচরিত্র থেকে রক্ষা করে প্রযুক্তিকে ব্যবহারে আনতে পেরেছেন সেটিই দেখার বিষয়।

সাজিদ,চট্রগ্রাম।