মোদির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আস্থা বাড়িয়েছে: গওহর রিজভী

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছেন ভারতে নতুন সরকার আসায় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আসবেনা।
বরং নরেন্দ্র মোদী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশ সরকারের আস্থা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে বিএনপির একজন নেতা বলেন দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হলে বাংলাদেশেও ভারতের মতো নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন।
ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে ভারতের নির্বাচন ও নতুন সরকার প্রসঙ্গ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার ও লঞ্চ ডুবিতে প্রাণহানির বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।
এবারের পর্বে আলোচক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মোবিন চৌধুরী, ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ এর প্রকাশক শহীদুল্লাহ খান বাদল এবং মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন আররাহমা বিনতে আকরাম।
তিনি জানতে চান ভারতের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যেসব কথা বলেছেন, সেই প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্বে বিজেপির জয়লাভকে বাংলাদেশে কীভাবে দেখা যেতে পারে ?
জবাবে শমসের মোবিন চৌধুরী বলেন, “নরেন্দ্র মোদি যা বলেছেন অন্যরাও সেটি আগে অনেকবার বলেছে। কিন্তু কেউ প্রমাণ দিতে পারেননি। আশা করি ভারত সরকার সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কথা বলবেন”।
তিনি বলেন, “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বড় সমস্যা হল আস্থার ঘাটতি। আস্থার ঘাটতি কমাতে নতুন সরকার কি পদক্ষেপ নেয় সেটির দিকে বাংলাদেশের মানুষ তাকিয়ে আছে। অনেক সমস্যার সহজেই সমাধান করা যায়”।
গওহর রিজভী বলেন, “সরকার পরিবর্তন হলেই বিদেশনীতি পরিবর্তন হয়না। নরেন্দ্র মোদিও বিশেষ কোন পরিবর্তন আনবেন বলে মনে করিনা”।
তিনি বলেন, “ভারতে শক্তিশালী সরকার আসায় অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান সহজ হবে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসায় আমাদের আস্থা বেড়েছে। কারণ মনমোহন সিং অনেক সমস্যার সমাধান চেয়েছেন কিন্তু তাকে নির্ভর করতে হচ্ছিলো তাদের জোটের উপর”।
মিস্টার রিজভী বলেন, "বিজেপি হোক আর কংগ্রেস হোক আমরা আমাদের স্বার্থ নিয়ে এগুবো। বাংলাদেশ তার ন্যায্য দাবি থেকে সরবেনা ও কোন চাপের কাছেও নতি স্বীকার করবেনা"।
তিনি বলেন, "কংগ্রেস সরকারের মতো বিজেপিও বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন দিয়ে একযোগে কাজ করবে"।
একজন দর্শক বলেন, “কেমন চাপ আসবে তা নির্ভর করবে রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের উপর। সচেতন না থাকলে চাপ আসবেই”।
শহীদুল্লাহ খান বাদল বলেন, “সরকার পরিবর্তন হলেই সব পরিবর্তন হবে আশা করা ঠিক না। তবে বিজেপির সাথে যারা আছে শিবসেনার মতো তারা তো বিজেপির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে কিছুটা আশংকা আছে”।
সালমা আলী আশা করেন দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হবে।
তবে তিনি বলেন, “উভয় দেশের নারীরা প্রায় একি ধরনের পরিস্থিতির শিকার হন। ভারতের কিছু ঘটলে এখানে তার প্রভাব পড়ে। এ বিষয়টিও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনে রাখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি”।
বিজেপি একি সমর্থন দিবে !!
মোস্তাকিম আহমেদ জানতে চান ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভারতের কংগ্রেস সরকার আওয়ামী লীগকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। ভারতে বিজেপির নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার সরকার সব ক্ষেত্রে কি একই রকম সমর্থন পাবে ?
গওহর রিজভী বলেন, “যেভাবে কংগ্রেস সমর্থন দিয়েছে সেভাবেই বিজেপি দিবে। আমরা তাদের স্বাগত জানিয়েছি। তাদের সাথে কাজ করতে রাজি আছি আমরা। এর মধ্যে ভিন্নতার কিছু নেই”।
তিনি বলেন, “দেশের নির্বাচন দেশের ব্যাপার। বাইরের চাপে কোন কাজ হবেনা। আমাদের নির্বাচন আমাদের। এটা নিয়ে বিদেশীদের চিন্তার সুযোগ নেই”।
শহীদুল্লাহ খান বাদল বলেন, “শেখ হাসিনার সাথে কংগ্রেস নেতৃত্বের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। তাই যে সমর্থন কংগ্রেস থেকে পেয়েছেন সেটি বিজেপির কাছ থেকে নাও আসতে পারে। আবার বিতর্কিত নির্বাচনের বিষয়ে বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতেই পারে”।
একজন দর্শক বলেন, “ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের কথা নয়। কিন্তু বিজেপির নীতিনির্ধারকরা সংঘের সাথে জড়িত”।
শমসের মোবিন চৌধুরী বলেন, “ভারতের একটি সরকার শক্ত ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারের ম্যান্ডেট নেই। এ বৈষম্যের ভিত্তিকে সম্পর্ক কতটা টেকসই হবে সেটা প্রশ্ন। এ বৈষম্য কমাতে বাংলাদেশেও নির্বাচিত সরকার হতে হবে”।
তিনি বলেন, “৫ই জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের পর ভারত সরকার যে অবস্থান নিয়েছিলো তাতে ভারতেই প্রশ্ন উঠেছিলো যে ভারত বাংলাদেশের জনগণ থেকে দুরে সরে গেলো কি-না”।
একজন দর্শক বলেন, “আমাদের কতকাল তাকিয়ে থাকতে হবে ভারতের রাজনীতির দিকে”।
সালমা আলী বলেন, “সমর্থন পাবেনা সেটি মনে হয়না। তবে গণতন্ত্র সহ অনেক বিষয়ে শেখার আছে এবং আশা করি সরকার তা শিখবে”।
নারায়ণগঞ্জের খুনের বিচার
নাহিদা মুসাররাত জানতে চান র্যাবের কর্মকর্তাদের গ্রেফতারে যেভাবে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে, তাতে করে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের সুষ্ঠু বিচার কি শেষ পর্যন্ত হবে ?
জবাবে গওহর রিজভী বলেন, “এ ঘটনায় জড়িত কেউ রেহাই পাবেনা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কোন ছাড় দেয়া হবেনা। আইনের আওতায় যা কিছু করা প্রয়োজন তা করা হবে। এখানে সন্দেহের কোন কারণ নেই”।
তিনি বলেন, “র্যাব অসাধারণ ভূমিকা রাখছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায়। র্যাবের মধ্যে হয়তো কিছু খারাপ ব্যক্তি আছেন। এর মানে এই নয় যে র্যাব বাদ দিয়ে দিব। র্যাবকে রাজনৈতিক খেলায় নেয়া উচিত নয়”।
শমসের মোবিন চৌধুরী বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই সন্দেহ হচ্ছে মানুষের মনে। নারায়ণগঞ্জে ১১ জনকে হত্যা করা হয়েছে"।
তিনি বলেন, "র্যাবকে শুধু বিলুপ্ত করলে হবেনা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সামগ্রিক সংস্কার দরকার হয়ে পড়েছে”।
একজন দর্শক বলেন, “খালেদা জিয়া র্যাব তৈরি করেছিলেন এখন তিনিই বলছেন বিলুপ্তির কথা। র্যাবের বিষয়ে কি সরকার দীর্ঘ কোন পদক্ষেপ নিবেন?”
সালমা আলী বলেন, “এখানে বড় সমস্যা আইনের প্রয়োগ। তদন্ত স্বচ্ছ হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে বিচারের বিষয়ে আমাদের সন্দেহ আছে”।
শহীদুল্লাহ খান বাদল বলেন, “নারায়ণগঞ্জের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিকভাবে কাজ করছেনা বা করতে পারছেনা"।
তিনি বলেন, "প্রধানমন্ত্রীকে যেখানে বলতে হয় বিচারের কথা সেখানে তো সন্দেহ থাকবেই”।
লঞ্চ ডুবি প্রসঙ্গ
আফরিন রাজ্জাক জানতে চান লঞ্চ ডুবির ঘটনা বন্ধ করতে সরকার কি যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে ?
শহীদুল্লাহ খান বাদল বলেন, “এ বিষয়ে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা। সরকারকে শক্ত ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে”।
সালমা আলী বলেন, “নৌযান নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্ধার কার্যক্রমের যন্ত্রপাতি আনতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া উচিত। এসব দুর্ঘটনা সুশাসনের অভাবের ফল”।
শমসের মোবিন চৌধুরী বলেন, “দক্ষিণ কোরিয়ায় এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। খুব শক্তিশালী ভাবে বিষয়টায় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এখানে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, রেগুলেশন নেই। খুব শক্তিশালী ভাবে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে”।
গওহর রিজভী বলেন, “জীবনহানির চেয়ে সিরিয়াস কিছু হয়না। ৭০ থেকে ৭২ ভাগ নৌযান নিয়ম মেনে চলছেনা। এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। এভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটতে দেয়া যাবেনা।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান হলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো ভালো হবে। আর ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি যেমনই হোক না কেনো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রাখাটাই ভালো।
এ আর সুমন।
সমস্যা সমাধানে মোদির প্রয়োজন নাই। প্রতিবেশি রাজ্য সরকারের সাথে আলোচনা করাটাই যুক্তি যুক্ত। কারন বিজেপি রক্ষনশীল।
স্যানি খান।
এই নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে কখনই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তৌকির আহমাদ।
নতুন সরকারকে স্বাগত । বাংলাদেশকে তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
জাহিদ সরকার।
মনমোহন সিং অনেক সমস্যার সমাধান চেয়েছেন কিন্তু তাকে নির্ভর করতে হচ্ছিলো তাদের জোটের উপর — এ কথা সত্য। আশাকরি এবার তিস্তা চুক্তিও মিটবে।








