সংলাপে ভারতের নির্বাচন, লং মার্চ ও গুম-খুন প্রসঙ্গ

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছেন ভারতে সাম্প্রদায়িকতা উস্কানি পেলে তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে পড়তে পারে। তবে তার আশা নিজের স্বার্থেই ভারত এমন কিছু করবেনা।
বিরোধী দল বিএনপির একজন নেতা বলেছেন ভারতে চলমান নির্বাচনী প্রচারে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণার কিছু প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক, তিস্তা ইস্যুতে রাজনৈতিক কর্মসূচির আদৌ গুরুত্ব আছে কিনা এবং অব্যাহত গুম –খুনের বিষয়ে সরকারের অবস্থানের বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।
সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অভিনয় শিল্পী ত্রপা মজুমদার।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন সৈয়দা রওশন আখতার। তিনি জানতে চান অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখনো স্বস্তিকর নয়, এ নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ রয়েছে?
আসিফ নজরুল বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সাথে মার্কিন সরকারের কতগুলো বিষয়ে মতদ্বৈধতা রয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন, ড: ইউনুস এবং ক্রসফায়ার ও গুমের বিষয়ে মার্কিন সরকার ভালোভাবে দেখছেনা। এগুলো যদি মতবিরোধের কারণ হয় তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে”।
তবে তিনি মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র যদি অন্য কোন স্বার্থ হাসিল করতে চায় তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
ত্রপা মজুমদার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণ অস্বচ্ছ। সম্পর্কটা হয়তো ভারতের নির্বাচন পরবর্তী সময়ের উপরও নির্ভর করবে। তাই এ মূহুর্তেই উদ্বিগ্ন হতে হবে এটা বলা যাবেনা। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন দু’দেশের জন্যই জরুরি”।
একজন দর্শক বলেন, “সরকার যদি চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো সম্পর্কের তাহলে বাংলাদেশই লাভবান হবে”।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র হীনতার কারণেই আমেরিকা আতঙ্কিত। কারণ গণতন্ত্র না থাকলে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হবে এবং তাদের এ উদ্বেগ যৌক্তিক। কারণ বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই”।
তিনি বলেন, “অধ্যাপক ইউনুস সারা বিশ্বে নন্দিত। অথচ বর্তমান সরকারের কাছে তিনি কোন সন্মান পাননি। তাকে আরও সন্মান দেয়া উচিত”।
মসিউর রহমান বলেন, “৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে যারা নির্বাচনে বিশ্বাস করে তারা অংশ নিয়েছে। সম্ভবত জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ার মতো নীতি বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেতৃত্ব না থাকায় তারা নির্বাচনে যায়নি”।
তিনি বলেন, “ইউরোপ ও ব্রিটেন বলেছে নির্বাচন যেটা হয়েছে সেটা তারা গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও নির্বাচন সম্পর্কে আর কোন কথা বলেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও সহায়তা বেড়েছে। এ মূহুর্তে তাদের সাথে টেনশন আছে বলে মনে করিনা”।
ড: ইউনুস সম্পর্কে তিনি বলেন কোন দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর কোন প্রভাব আছে বলে তিনি মনে করেননা।
ভারতের নির্বাচনের প্রচারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
মো: হিরক সরকার জানতে চান ভারতের নির্বাচনের প্রচারে যেভাবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আসছে, তাতে কি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে ভবিষ্যতে কোন বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ?
প্রতিবেশী ভারতে লোকসভা নির্বাচন চলছে। সেখানকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারে উঠে আসছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও। এ কারণেই বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
জবাবে ড. মসিউর রহমান বলেন এসব প্রচারণা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। কারণ তার ধারণা ভারত তার নিজের স্বার্থেই এমন কিছু করবেনা যেটি বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক হতে পারে। তবে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়ে আশংকার বিষয়টিও উঠে আসে তার মন্তব্যে।
তিনি বলেন, “ ভারতে সাম্প্রদায়িকতা উস্কানি পেলে ভারতের অভ্যন্তরে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তাই ভারত তার নিজের স্বার্থেই সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিবে”।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন অভিন্ন নদীর পানি সহ কিছু বিষয় ভারতের একটি দলের নেতাদের বক্তব্যে আসছে সেটি আশংকাজনক।
তিনি অবশ্য মনে করেন একি ধরনের ক্ষতিকর কাজ প্রতিবেশী এ দেশটি বাংলাদেশের জন্য এখনো করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “বিজেপি বলেছেন তারা আন্ত-নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। তো বাংলাদেশের প্রধান নদীর পানি প্রত্যাহার করলে সেটি হবে আশংকার”।
বিএনপি নেতা আরও বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে ও আসামে গিয়ে বিজেপি নেতারা বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা করছে। এর একটা প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে যা ক্ষতি এখন ভারত করছে তার চেয়ে আর বেশি কি করবে”।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন বিজেপি যদি সস্তা রাজনীতির জন্য বাংলাদেশ বিরোধী মন্তব্য করে থাকে সেটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
তিনি মনে করেন জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে এবং দলগুলো জাতীয় ইস্যুতে এক জায়গায় আসতে পারলে কেউই বাংলাদেশের ক্ষতি করতে পারবেনা।
তিনি বলেন, “তারা যদি সেখান থেকে বাংলাদেশী বলে লোকজন ধরে ধরে বাংলাদেশের সীমান্তে পুশ ইন করে সেটা বিপর্যয়কর হবে। তারা যদি ধর্মীয় উস্কানি দেয় তাহলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে”।
মিস্টার নজরুল বলেন তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে কথা বলছে তাহলে এখানেও কারও কারও ৪৭ সালে মুর্শিদাবাদ মালদহ ও আসামের কিছু অংশ বাংলাদেশের ছিল সেটা বলা উচিত।
রাজনৈতিক কর্মসূচি কি পানি আদায়ে সহায়ক হবে ?
এইচ এম হানিফ জানতে চান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কর্মসূচি কি ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা পেতে সহায়ক হতে পারে ?
সম্প্রতি বিএনপি সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে তিস্তা অভিমুখে লং মার্চের কর্মসূচি পালন করেছে। এ প্রেক্ষাপটেই এ প্রশ্নটি উঠে আসে।
ড মসিউর রহমান বলেন, “তিস্তা অঞ্চলে এ সময়ে পানি কম থাকে। চাষাবাদ বেড়েছে বলে পানির অভাব বেশি বোধ হচ্ছে। দু’দফায় দশ বছরে বিএনপি এ বিষয়ে কোন চুক্তির চেষ্টা করেনি। ভারতের সাথে চুক্তির যে ড্রাফট আছে তাতে ১০/১২ বছরে পানি প্রবাহে বাধা দেয়া হবেনা। সেটি দেখে স্থায়ী চুক্তি করার কথা”।
তিনি বলেন, “বিএনপি আসলে নিজেদের সময় তিস্তার বিষয়ে যে ব্যর্থ হয়েছে সেটা ঢাকতেই লংমার্চ করেছে”।
অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন বিএনপি সবসময় জোরালো ভাবে এসব বিষয় ভারতের কাছে তুলে ধরেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগই তার আগের আমলে এগুলো তুলে ধরেনি।
তিনি বলেন, “চুক্তির জন্য আমরা সবসময় চাপ দিয়েছি কিন্তু ভারত সময়ক্ষেপণ করে। পানি সম্পদে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে ভারত কোন আলোচনা করতে চায়না। আওয়ামী লীগ আমলে যেসব সভা হয়েছে সেখান আন্ত:নদী সংযোগ বা টিপাই-মুখ শব্দগুলো পর্যন্ত নেই”।
একজন দর্শক বলেন, “তিস্তা পাড়ের কৃষকরা চাষ করতে পারছেনা সেচের অভাবে। ন্যায্য হিস্যার জন্য কি করণীয় আছে”।
আসিফ নজরুল বলেন, “ভারত পানি নিয়ে যে আচরণ বাংলাদেশের সাথে করে সেটা পৃথিবীতে বিরল। পানি দিচ্ছেনা আর আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে। যৌথ নদী কমিশনের সভায় আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি বেশি সোচ্চার থাকে। কিন্তু অর্জন কি”।
তিনি বলেন, “ভারতকে চাপ দিতে হবে। মাথা নত করে চাইলে হবেনা। সর্বাত্মক চাপ দিতে হবে। আওয়ামী লীগেরও লং মার্চ করা উচিত”।
জবাবে অপর প্যানেল আলোচক অভিনয় শিল্পী ত্রপা মজুমদার বলেন এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে বাংলাদেশে যে কোন জাতীয় ইস্যু দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বলেন, “তিস্তার পানির মতো বিষয়গুলোতে যে কোন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা উচিত। লং মার্চ হোক আর যাই হোক এটি সরকারের উপর যেমন চাপ তৈরি করে তেমনি বহির্বিশ্বকেও দেখানোর প্রয়োজন আছে যে সাধারণ মানুষ কি চায়”।
গুম হত্যা প্রসঙ্গ
ফয়জুল আল আমীন জানতে চান বাংলাদেশে অব্যাহত গুম আর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হলেও সরকার তা বন্ধ করতে পারছেনা কেন?
মসিউর রহমান বলেন, “গুম একটি অপরাধ। এর সাথে রাজনীতিকে সম্পৃক্ত করার অর্থ নেই। সরকার সব অপরাধ দমনের চেষ্টা করবে”।
আসিফ নজরুল বলেন, “চার বছরে প্রায় তিনশ লোক গুম হয়েছে। এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হলে দেশ নিয়েই নতুন করে ভাবতে হবে। এতো গুম হয়তো সরকার করেছে বা করেনি। না করলে ধরার দায়িত্ব সরকারের। বা যারা করছে তাদের ধরার সামর্থ্য সরকারের নেই”।
ত্রপা মজুমদার বলেন, “নিজের উপর আঘাত না আসলে আমরা নড়িনা। যেহেতু সরকারের কারও কিছু হয়নি এখনো সেজন্য সরকার সচেতন নয়।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকার গুম খুনের রেকর্ড করেছে। সরকারের প্রশ্রয় এসব ঘটনায় আছে। ছাত্রলীগ যুবলীগ অত্যাচারকে সীমাহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে”।
তার অভিযোগ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমকে সরকারি বাহিনীই তুলে নিয়ে গেছে।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
Excellent
Md. Nazmul Hoque Sabuj, Dhaka
জগৎ শেঠ আর মীর জাফর মার্কা লোক যতদিন বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন বাংলাদেশ তার কোনো অধিকারই আদায় করতে পারবেনা ।
Kollol , London
এত নামী-দামীদের মন্তব্যে ড:মসিউর রহমানের মত লোক একটুও উদ্বিগ্ন নয়, আর আমার মন্তব্যে কিইবা হবে? তবুও বলতে চাই, তাঁরা বাংলাদেশ থাকলেও সুখী না থাকলেও সুখী, কারণ তাদের সুখের মূল উৎস হলো ভারত।








