রাষ্ট্রপতির মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক হলো সংলাপে

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক ড: হাছান মাহমুদ, খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা খন্দকার, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক ড: হাছান মাহমুদ, খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা খন্দকার, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের সাথে আলোচনার সময় রাজনৈতিক সংলাপ নিয়ে রাষ্ট্রপতি দলীয় বক্তব্য দিয়েছেন যা মোটেও উচিত হয়নি।

তবে আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন রাষ্ট্রপতি সঠিক কথাই বলেছেন কারণ নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোন প্রয়োজন এখন নেই।

ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে মিরপুর বিহারী ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড, ফরমালিন বিরোধী অভিযান এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও আলোচনায় উঠে আসে।

সংলাপের এবারের পর্বে আলোচক ছিলেন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক ড: হাছান মাহমুদ, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরী ও খান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা খন্দকার।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন মো: আল আমিন রাজু।

তিনি জানতে চান ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের মানুষ মেনে নিয়েছে এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের আগে সংলাপ নয় বলে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে যে মন্তব্য করেছেন তা কি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরও জটিল করতে পারে ?

জবাবে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ বলেন রাষ্ট্রপতি সঠিক মন্তব্যই করেছেন কারণ এ মূহুর্তে নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোন প্রয়োজনীয়তাই নেই।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী কথা বলেছেন। সংলাপ রাজনীতিতে প্রয়োজন। যে কোন জাতীয় ইস্যুতেই যুদ্ধাপরাধী বা জঙ্গি ছাড়া সবার সাথেই সংলাপ হতে পারে। দেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে পর স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।”

তবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়।

তিনি বলেন সংলাপের কোন বিকল্প নেই এবং সংলাপের প্রস্তাব পেলে বিএনপি আন্তরিকভাবেই তা গ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি হিসেবে এ ধরনের বক্তব্য সমীচীন হয়নি। তিনি দলীয় বক্তব্য দিয়েছেন।”

আফসান চৌধুরী বলেন, “নির্বাচন সরকার ও বিরোধী দলের বিষয়। এর মধ্যে জনগণের কতটা অংশগ্রহণ আছে তাতে বলা যাচ্ছেনা। বিএনপি নির্বাচনে না নিয়ে দুর্বল দলের পরিণত হয়েছে। তার মানে এই নয় যে সেটা ভালো হয়েছে।”

তিনি বলেন, “অসাংবিধানিক শাসন চলতে থাকে সেটা যে কোন দিকে মোড় নিতে পারে। দ্বন্ধ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের। মানুষ এর মধ্যে থাকতে চায়না।”

একজন দর্শক বলেন, “কাল যদি সরকার সংলাপের কথা বলে তাহলে বিএনপি কি পূর্বশর্ত ছাড়া সংলাপে অংশ নিবেন?”

রোকসানা খন্দকার বলেন, “সংলাপের প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রপতি সবার। তিনি যখন কথা বলবেন আমরা বিশ্বাস করি তিনি জনগণের কথাই বলবেন। জাতিসংঘ মহাসচিবও সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি বলেছেন নির্বাচনের সময় হবে। জানিনা সেটি পাঁচ বছর পর হবে নাকি এখনি হবে।”

ফলে ফরমালিন প্রসঙ্গ

আব্দুর রহমান ফুয়াদ জানতে চান ফরমালিনের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে, তা কি দেশীয় ফলের বাজারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে ?

আফসান চৌধুরী বলেন, “মনে হয় সরকার জানেওনা এ পরিস্থিতিতে কি করতে হবে। তারা ফরমালিন দেয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেনা। পুলিশ কি করবে সেটা সবাই জানে। ফরমালিন বিরোধী অভিযান চলতে পারে কিন্তু তাতে মৌলিক পরিবর্তন হবেনা।”

রোকসানা খন্দকার বলেন, “ফরমালিন কারা আমদানি করছে। কারা ব্যবহার করছে। যারা ব্যবহার করছে তাদের লাইসেন্স আছে ? কি কাজে ব্যবহার করছে। কতটুকু প্রয়োজন আমাদের। এগুলো না দেখে ব্যবসায়ীদের ধরলে কোন সমাধান আমরা পাবোনা।”

একজন দর্শক বলেন, “শুধু ফল কেন? মাছ সহ অনেক কিছুতেই ফরমালিন দেয়া হচ্ছে।”

হাছান মাহমুদ বলেন, “ফরমালিন বিরোধী অভিযান প্রশংসনীয়। এখানে অনেক ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। নানা প্রয়োজনে ফরমালিন আনা হয়। কিন্তু এখন সেটি অসৎ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযান বাজারে সীমাবদ্ধ না রেখে যেখানে প্যাকিং হয় ফল সেখান থেকে শুরু করা প্রয়োজন।”

মীর নাছির বলেন, “যেদিন পুলিশ বললো ফরমালিন বিরোধী অভিযানের কথা বললো সেদিনও বোঝা গেছে এ অভিযানের বারোটা বেজে গেছে। কারণ সে ধরনের নৈতিকতা তাদের আছে কি ? অভিযানের নামে তামাশা চলছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ নবম অবস্থানে এসেছে। এরপরেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।”

বিহারী ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গ

শ্যামা পারভীন বেবী জানতে চান মিরপুরে বিহারী ক্যাম্পে ১০জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে কি এক রকমের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ?

আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরী বলেন শুধু বিহারীদের বিষয়েই নয়, এ ধরনের যে কোন ঘটনার ক্ষেত্রেই তদন্ত বা বিচারের প্রশ্নে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “সরকার কিছুটা হলেও উদাসীন। কারণ বিহারীরা মাত্র তিন লাখ। সরকার তো সব খুন জখমের বিষয়েই উদাসীন। দশ জন মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় তার মানবাধিকারের বিষয়টাই তুলে আনা উচিত।”

একজন দর্শক বলেন, “বাংলাদেশে ১১৬ ক্যাম্পে প্রায় তিন লাখ বিহারী আছে। এবারের ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে কোন তদন্ত বা তদন্ত টীমকে কাজ করতে দেখছিনা।”

আরেকজন দর্শক বলেন, “এ ঘটনাকে রাজনীতি করণ করা হচ্ছে।”

মীর নাছির বলেন, “এ মূহুর্ত পর্যন্ত একজন আসামী গ্রেফতার হয়নি। এ সরকারের সময় খুন গুমে মানুষ আতঙ্কিত। এতো বড় একটা খুনের ঘটনা নিয়ে হাস্যাস্পদ কোন মন্তব্য করা উচিত নয়।”

রোকসানা খন্দকার বলেন, “এ ধরনের ঘটনা একটার পর একটা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।”

হাছান মাহমুদ বলেন, “মিরপুরের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। তদন্ত হচ্ছে। এখানে যেই অভিযুক্ত হবে সে যতই শক্তিশালী হোক তার বিচার হবেই।”

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গ

নূর মহল আক্তার নিশিতা জানতে চান দুটি সন্তানের বেশী নয়, একটি হলে ভালো হয় – জন্মনিয়ন্ত্রণের এই শ্লোগানের শেষ লাইনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচিকে নিরুৎসাহিত করবে কি?

আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ বলেন বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সব উন্নয়নই ভেস্তে যাবে। বিএনপি নেতা মীর নাছির বলেন প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে মাঠ পর্যায়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সাথে জড়িতদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।

রোকসানা খন্দকার বলেন, “যে নীতি রয়েছে তা থেকে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের কথা বলেছেন বলে মনে হয়না।”

আফসান চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের এতো মানুষ ধারণের ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর যদি এমন কথা বলেন তাতে মাঠ পর্যায়ে যে সিগন্যাল যায় তা হল এ নিয়ে ততো গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।

প্রধানমন্ত্রী এমন কথা না বললেই বাংলাদেশের জনসংখ্যা কর্মসূচির জন্য ভালো হতো।”

একজন দর্শক বলেন, “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা না নিলে বেকারত্ব তো আরো বাড়বে।”

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

এই সরকার কারো কোন কথার ধার ধরেনা । তাদের শুধুই ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা । দেশ নিয়ে দেশের মানুষ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই । সরকারের স্লোগান ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ । কিন্তু এখন সারা বাংলাদেশে খালে বিলে রাস্তায় লাশ আর লাশ। এই তাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ। তারা কোন ভাবে চায়না দেশে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন হোক। তারা জানে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কোন দিনই তারা ক্ষমতায় আসতে পারবেনা । তাদের পাত্তা থাকবেনা ।

মো: আলতাফ হোসেন, বরিশাল