বাংলাদেশ সংলাপে অভিশংসন নিয়ে বিতর্ক

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেতা বর্তমান সংসদকে অনির্বাচিত আখ্যায়িত করে বলেছেন এ সংসদের হাতে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দিলে তার পরিণতি ভালো হবেনা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছেন এ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে সংসদ রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে পারলে বিচারপতিদের করতে পারবে না কেন বলেও প্রশ্ন তুলেন তিনি।
ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে জাতীয় শোক দিবসে জন্মদিন উদযাপন নিয়ে বিতর্ক, সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ইস্যু ও দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।
সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিঞা, অভিনেতা ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন এবং
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এলায়েন্স ফর উইমেন লিডারশীপ এর নির্বাহী পরিচালক নাসিম ফেরদৌস।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন ফারহানা আফরিন।
তিনি জানতে চান ১৫ই আগস্টের জাতীয় শোক দিবসে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদযাপন কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন তিক্ততার সৃষ্টি করছে?
জবাবে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “সহনশীল রাজনীতি থাকলে এ বিষয়টি নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি হতোনা। খালেদা জিয়ার এটি ছাড়াও আরও দুটি জন্মদিনের রেকর্ড বা প্রমাণ আছে।"
তিনি বলেন, "মনে হয় নিছক বিতর্কের জন্য এটি জিইয়ে রাখা হয়েছ। এটি সঠিক তারিখ হলেও এতো ঘটা করে পালনের কিছু নেই।”
নাসিম ফেরদৌস বলেন, “ব্যক্তিগত ভাবে তিনি জন্মদিন পালন করতে পারবেন। কিন্তু জনগণের মনে কেন আঘাত দিবেন। কিছু লোক তো আঘাত পাচ্ছে, এ বিতর্কে তিনি কেন যাবেন। ”
একজন দর্শক বলেন, “তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন। ওনার মতো একজন বড় মানুষ কি করে জাতীয় শোক দিবসে জন্মদিনে পালন করে। এটা রাজনৈতিক কারণ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
রফিকুল ইসলাম মিঞা বলেন, “১৫ই আগস্টের দু:খজনক ঘটনার সাথে জন্মদিন পালনের বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করার কোন সুযোগ নেই। এটাকে এতো ঘটা করে দেখার কিছু নেই।এটা বড় কোন বিষয় নয়।”
এইচ টি ইমাম বলেন, “জাতির পিতা সব কিছুর ঊর্ধ্বে। আমাদের হাতে প্রমাণ রয়েছে যে এটি খালেদা জিয়ার সত্যিকারের জন্মদিন নয়।"
তিনি বলেন, "অকারণে কাউকে খোঁচা দেয়ার জন্য এ ধরনের জন্মদিন পালন না করলে রাজনৈতিক তিক্ততা কমতো।”
বিচারপতিদের অভিশংসন বিতর্ক
পারভীন সুলতানা জানতে চান উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসন করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে দেয়ার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা কতটুকু বাস্তবসম্মত ?
রফিকুল ইসলাম মিঞা বলেন স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারই এ ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দিয়েছিল। এখন তারাই আবার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সংসদের হাতে এ ক্ষমতা দিতে চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “দলের লোক নয় সেসব ব্যক্তি বিচারপতি হচ্ছেনা। এটা মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করছে। আর এখনকার সংসদ নির্বাচিত নয়। যে অবস্থা এখন বিরাজমান আছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে এটা যথেষ্ট কার্যকর বলেই আমি মনে করি।”
তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এইচ টি ইমাম বলেন সংসদ রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে পারলে বিচারপতিদের পারবেনা কেন। তবে এ বিষয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “জনপ্রতিনিধিদের হাতেই সব ক্ষমতা। তাহলে তারা কেন অভিশংসন করতে পারবেনা। আবার বিচারক হয়ে গেলেই সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাতো নন। সবার মতামত নেয়া হচ্ছে। দেখা যাক মতামত কি আসে।”
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর নেই বলেই মানুষ সুশাসন ও ন্যায় বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত যারা সরকার পরিচালনা করেন তাদের ইচ্ছা যদি না থেকে, গণতন্ত্র বিচার ব্যবস্থা জনগণের জন্য ন্যায় ভাবে ব্যবহারের ইচ্ছে না থাকলে, সংসদেই নেন আর বাইরে নেন তাতে কিছু যায় আসেনা।”
নাসিম ফেরদৌস বলেন বর্তমান সংসদ সঠিকভাবে নির্বাচিত হলে হয়তো সংসদের হাতে এ ধরনের ক্ষমতা দেয়ার বিষয়ে কারও কোন আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকতোনা।
তিনি বলেন, “শুধু বিচার বিভাগ না সবকিছুকেই দলীয় করণ করা হয়েছে। এটা না সরালে তো বিচার বিভাগ চলতে পারবেনা। সরকারও চলতে পারবেনা।
সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতার প্রসঙ্গ
হাসনাইন হাফিজ জানতে চান খসড়া সিভিল সার্ভিস আইনে সরকারের অনুমতি ছাড়া ফৌজদারি অপরাধে সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতার না করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ধরণের একটি আইন কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ?
এইচ টি ইমাম বলেন, “সিভিল সার্ভিস কে দলীয়করণের যে প্রবণতা অতীতে দেখা গেছে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। ২০০১ সালে ৭৩ ব্যাচের সবাইকে একযোগে বিদায় করা হয়েছে। এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমরা রিফর্মটা চেয়েছি যাতে করে সিভিল সার্ভিস দলীয় কাজে ব্যবহার করা না হয়।”
তিনি বলেন, “কিছু অপরাধ আছে যেগুলোতে যে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাই ঢালাও কোন স্বাধীনতার প্রশ্নই আসেনা। কিছু অপরাধ আছে যেগুলো সরকারকে অবহিত করা দরকার। ক্রিমিনাল অফেন্স হলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
নাসিম ফেরদৌস বলেন, “সিভিল সার্ভিসের আইনটি সঠিক ছিল। কিন্তু দলীয় করনের কারণে এমন হয়েছে যে সিভিল সার্ভেন্টরা আগে যে স্বাধীনতা পেয়েছে এখন তা হচ্ছেনা। সাহস করে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা। এ কারণেই সে তার প্রটেকশন চায়।”
রফিকুল ইসলাম বলেন, “জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমতি দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন। সিভিল সার্ভেন্টরা দুর্নীতি করলে সরকারের অনুমতি লাগবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা কমানো হচ্ছে কারণ সিভিল সার্ভিসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সরকার।”
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “এটা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকা উচিত। সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়া উচিত না। বাড়তি সুবিধা দেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা।"
তিনি বলেন, "এমনি আমলারা সাধারণ মানুষকে কামলা ভাবে। এ ধরনের ভাবনা বাড়বে যদি অন্যায় করলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক ভাবে ব্যবস্থা না নেয়া হয়।”
যানবাহন চালকদের লাইসেন্স
নূরুন নাহার ভুঁইয়া জানতে চান সব ধরনের দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার একটি উপায় হিসেবে যে কোন যানবাহন চালকের লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতা শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত কি না ?
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “ন্যূনতম এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সঠিক প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত। এসএসসি পাশ না হলে একজন মানুষের তো সেন্স ডেভেলপ করেনা।”
নাসিম ফেরদৌস বলেন, “ন্যূনতা শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে সাইনগুলো বোঝার জন্যও দরকার।”
রফিকুল ইসলাম বলেন এসএসসি না হলেও একটা শিক্ষা থাকতে হবে, সাইন বুঝতে হবে। কারণ তার হাতে অনেকের জীবন নির্ভর করছে।
এইচ টি ইমাম ন্যূনতা শিক্ষার বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন যাতে সাইনগুলো বুঝতে পারে। নিয়ম কানুন মেনে রাস্তায় চলতে পারে।
একজন দর্শক বলেন, “ আইনের প্রয়োগ না থাকার কারণেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
আওয়ামী লীগকে এটা প্রমাণ করতে হবে যে তাদের পাশ করা আইনটি জনকল্যাণকর এবং এটি ক্ষমতাকে আরও মজবুত করার জন্য নয়, কারণ তাদের অনেক কর্মকান্ড এবং কথাবার্তা জনসম্মুখে বহূল বির্তকিত হয়ে গেছে, যা সামনের দিনগুলোর জন্য চরম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে বলে আমি মনে করি।
একেএম শফিকুল আজম, দৌলতপুর, খুলনা।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলেনি কিন্তু নির্বাচিত হয়ে পরিবর্তন করেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণ অংশ নেয়নি। জনগণের ভোটের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।








