সংলাপে উপজেলা, জামায়াত ও তিস্তা ইস্যুতে বিতর্ক

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম প্রমাণ করেছে কোন দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারেনা।
তবে আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টির একজন নেতা যিনি সরকারের একজন মন্ত্রী তিনি বলেছেন উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনায় তারা বিব্রত।
তবে তারা মনে করেন নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করা দরকার।
ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে তিস্তা নদীর পানি, জামায়াত নিষিদ্ধ এবং লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস এবং বেসরকারি মানারত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চৌধুরী মাহমুদ হাসান।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন মফিজুল ইসলাম। তিনি জানতে চান উপজেলা নির্বাচন যেভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবশ্যকতাকেই প্রমাণ করছে?
জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন নির্বাচনে সহিংসতা বা অনিয়মের অভিযোগ তাদের বিব্রত করেছে।
তবে সব জায়গায় নির্বাচনে এসব ঘটেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কোন সমাধান নয়, কিন্তু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা এসব না তুলে কিভাবে নির্বাচন কমিশনকে আরও কার্যকর করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা করলে জাতি হিসেবে আমরা লাভবান হবো”।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চলমান নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম ও সহিংসতার নানা ঘটনা তুলে ধরে বলেন এ নির্বাচন প্রমাণ করেছে বর্তমান সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারেনা।
তিনি বলেন এ কারণেই তার দল বিএনপি নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় রয়েছে।
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সারাজীবন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেনা। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত কমিশন শক্তিশালী ও স্বাধীন হচ্ছেনা, যতদিন পর্যন্ত দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হচ্ছেনা ততদিন পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন বিকল্প নেই”।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বেসরকারি মানারত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচায় চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন উপজেলা নির্বাচনের শেষ কয়েকটি পর্বের নির্বাচন দেখে তিনি মনে করেন একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করা কঠিন।
তিনি বলেন, “উপজেলায় প্রথম পর্বের নির্বাচন দেখে নিরপেক্ষ মনে হলেও পরের দফার নির্বাচনগুলো দেখে মনে হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক বা এ ধরনের প্রশাসন ছাড়া নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবেনা”।
অপর প্যানেল আলোচক সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস বলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো অনির্বাচিত প্রশাসনের ব্যবস্থা কোন সমাধান হতে পারেনা। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস নিশ্চিত করলেই নির্বাচন নিয়ে সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “একটি বা দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হলে সমস্যার সমাধান হবে এটি আমি বিশ্বাস করিনা”।
তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা
মো: জাকারিয়া হক জানতে চান তিস্তা নদীর ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কি উচিত হবে কোন আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়া ?
নাসিম ফেরদৌস বলেন, “কূটনীতির মাধ্যমেই অগ্রসর হওয়া উচিত। কারণ আন্তর্জাতিক ফোরামে গিয়ে কোন লাভ হবে তার নিশ্চয়তা কি? তাছাড়া আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেক সময় অনেক দীর্ঘ সময় নিয়ে নেয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে”।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “ভারতের সাথে এটি নিয়ে কোন চুক্তি করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়না”। তিনি বলেন, “ভারত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি। তাই দ্বিপাক্ষিক ভাবে যা-ই হোক ভারতের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য হলেও বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলা উচিত বাংলাদেশের”।
একজন দর্শক বলেন, “সরকারের উচিত বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করা”।
চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, “পানি সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক ভাবে আলোচনাও করতে হবে আবার আন্তর্জাতিক ফোরামেও তুলতে হবে”।
তবে তিনি বলেন বর্তমান সরকারের সাথে যেহেতু ভারত সরকারের সম্পর্ক ভালো সেহেতু সেটিকে ব্যবহার করেই এ সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
পানি সম্পদ মন্ত্রী ভারতের নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধানের আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ পানি চায়। বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা চায় এবং বাংলাদেশ ভালো থাকলে কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোও ভালো থাকবে”।
জামায়াত নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ
মহিউদ্দিন হিমেল জানতে জান উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের ইসলামীর প্রতি যে জনসমর্থন দেখা গেছে, সে কারণেই কি সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করতে চাইছে?
চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, “কোন রাজনৈতিক সংগঠন বন্ধ করা উচিত হবেনা। রাজনৈতিক ভাবে সব বিষয়কে মোকাবেলা করা উচিত। আলোচনার মাধ্যমেই দেশের জন্য যেটা ভালো সেটা করা উচিত”।
তিনি বলেন, “বর্তমানের জামায়াত আর একাত্তরের জামায়াত তো এক নয়। বর্তমান জামায়াত যদি গণতান্ত্রিক কাজ করে তাহলে নিষিদ্ধ করা উচিত হবে বলে মনে করিনা”।
মন্ত্রী বলেন, “জামায়াত যদি একাত্তরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং যদি সহিংসতা থেকে বিরত থাকে তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করতে পারলেই ভালো। কিন্তু তাকে সহিংসতা বর্জন করতে হবে”।
নাসিম ফেরদৌস বলেন, “নিষিদ্ধের কথা আছে অনেক দিন ধরেই। এ নিয়ে সরকারের মধ্যে অনেক কথা আছে। কিন্তু সহিংসতা যারা করবে তারা নির্বাচন করতে পারবে কি-না সেটা নির্বাচন কমিশনকে ঠিক করতে হবে”।
তিনি বলেন, “তাদের নিষিদ্ধ করলেই সহিংসতা বন্ধ হবে বলে আমি মনে করিনা”।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মনে করি যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে সবারই ক্ষমা যাওয়া উচিত। আমাদের সন্দেহ আপোষ করতে রাজী হলে হয়তো দলটি আর নিষিদ্ধ হবেনা”।
লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা
জাহানারা মুমু জানতে চান লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা অনুষ্ঠান হয়তো গিনেস রেকর্ড বুকে জায়গা পাবে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের কি উচিত কোন রেকর্ডের পেছনে ছোটা ?
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “কোন রেকর্ডের পেছনে ছোটা কোন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা হতে পারেনা। তবে কোটি কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত বাজুক সেটি আমি চাই। তবে এ আয়োজনে মুক্তিযোদ্ধারা উপেক্ষিত হয়েছে”।
নাসিম ফেরদৌস বলেন, “এ আয়োজন কি মানুষকে একটি নতুন উদ্যম দেয়নি। আমরা খুশি হয়েছি। গিনেস বুকে নাম উঠলে আমরা খুশি হবোনা? এ সিদ্ধান্তে ভুল নেই”।
চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, “রেকর্ডে উদ্যোগ নিবে এটা যেমন ঠিক নয় আবার সুযোগ থাকলে নিবেনা কেন। এটা নিয়ে উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর ব্যবস্থাপনা ভালো হয়নি”।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, “রেকর্ড এ আয়োজনের একটি অংশ। যেটি প্রধান ছিল সেটি হল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফিরিয়ে আনা। এটি ছিল একটি প্রতীকী আয়োজন”।









