আন্দোলনের শক্তি বা দক্ষতা বিএনপির নেই: মেনন

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জিনাত হুদা ওয়াহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসম হান্নান শাহ।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জিনাত হুদা ওয়াহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসম হান্নান শাহ।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিরোধী দল বিএনপির একজন নেতা বলেছেন বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি। তাই এ সরকারকে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে দেয়া যাবেনা।

তবে সরকারের একজন মন্ত্রী বলেছেন আন্দোলন করার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও দক্ষতা বিএনপির নেই।

ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংলাপের এ পর্বে যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা, গুম ও হত্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বেতন কাঠামোর মতো বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।

সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসম হান্নান শাহ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জিনাত হুদা ওয়াহিদ।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন মমতাজ বেগম। তিনি জানতে চান পাঁচ বছরের আগে পরবর্তী নির্বাচন নয় বলে মন্ত্রীরা যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা কি আগাম নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিএনপিকে আবারো আন্দোলনের পথে ঠেলে দিতে পারে ?

রাশেদ খান মেনন বলেন আন্দোলনের জন্য বিএনপি নির্ভর করেছিলো জামায়াতের উপর এবং তারা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও সফল হয়নি।

তিনি বলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন নিজেই দল গুছানোর কথা বলেছেন এবং আন্দোলন করার মতো সাংগঠনিক দক্ষতা বিএনপির নেই।

মন্ত্রী বলেন, “বিএনপি চাইলে আন্দোলন করতে পারে। কিন্তু সেটা পারবে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। জনগণের যে সমর্থনের কথা তারা বলছে তার প্রকাশ ঘটেনি। একটি সরকার এসেছে সেটা পাঁচ বছরের জন্যই এসেছে। তবে পরবর্তী নির্বাচন কোন ভিত্তিতে হতে পারে সেটি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে”।

আসম হান্নান শাহ বলেন সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ হয়েছে তাই জনগণ ভোট দেয়নি। সুতরাং বিএনপি সফল হয়েছে কারণ প্রমাণ হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারেনা। তবে বিএনপি আবার আন্দোলনে যাবে কি-না সে প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে হান্নান শাহ আলোচনার কথা বলেন।

তিনি বলেন সরকারকে শুধু আমরাই নই, বিএনপির বাইরে যারা আছেন অনেকেই সরকারকে বৈধ মনে করেননা। কারণ এরা কত শতাংশ জনগণের ভোট পেয়েছে। সরকারের মন্ত্রীদের কথা শুনলে দেশবাসী মনে করে যেহেতু এরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন তাই এদেরকে বেশিদিন ক্ষমতায় রাখা যাবেনা”।

মইনুল হোসেন বলেন সরকারই বলেছে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ছিল একটি শাসন তান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা। তাই এখন দ্রুত একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচন না হলে জনগণই রাস্তায় নামবে কারণ দশম সংসদ নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি।

তিনি বলেন, “ভোটের অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। শাসনতন্ত্র ভোট বিহীন নির্বাচনের কথা বলেনি। বিএনপি আন্দোলন করবে কি-না সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু জনগণের ভোট না পেয়ে কেউ তাকে নির্বাচিত দাবি করতে পারবেনা বা বলতে পারবেনা জনগণের বৈধতা পেয়েছে”।

জিনাত হুদা ওয়াহিদ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি আদৌ আন্দোলন করতে পেরেছিল কি-না তা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন জনগণের সমর্থন ছিল বলেই দশম সংসদ নির্বাচনের পর জনগণ এর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি।

তিনি বলেন, “বিএনপি আন্দোলন করতে পারলে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন এভাবে হলো কেন? জনগণের সমর্থন যদি নাই থাকে তাহলে নির্বাচনের পর তো কাউকে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে দেখলাম না”।

গুম আর হত্যা বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ

সৈয়দা মরিয়ম বেগম জানতে চান গুম আর হত্যা বন্ধে সরকারের কার্যকর কোন পদক্ষেপ কি দেখা যাচ্ছে ?

জিনাত হুদা ওয়াহিদ বলেন, “গুম কিলিং এর সাথে অনেক ইস্যু জড়িত। মৌলবাদ জঙ্গিবাদ আক্রমণ করলে সরকার সেখানে কি পদক্ষেপ নিতে পারে সেটিই প্রশ্ন”।

হান্নান শাহ বলেন, “কোন সভ্য দেশে এভাবে গুম হত্যা হয়না। দেশে যে হারে এগুলো হচ্ছে মানুষ সেটা মেনে নিতে পারছেনা। জঙ্গিবাদ দমনের আরও অনেক রাস্তা আছে। ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছে।”

একজন দর্শক বলেন, “সরকার তো ভূমিকা নিচ্ছে। নাহলে তো এগুলো আরও ঘটতো”। আরেকজন দর্শক বলেন, “আওয়ামী লীগের কেউ তো গুম হচ্ছেনা। শুধু তো বিরোধী দলের লোকজন গুম হচ্ছে”।

রাশেদ খান মেনন বলেন গুম-হত্যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অসম্ভব রকম বিপজ্জনক। সমগ্র জাতির জন্যই এটা অস্বস্তিকর বিষয়। যারা এগুলোর জন্য দায়ী তাদের বিচারের ব্যবস্থা করে শাস্তি দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু দায়মুক্তির সংস্কৃতির জন্যই সেটা হচ্ছেনা”।

মইনুল হোসেন বলেন, “দোষ তো সরকারের এজেন্সির উপরই হচ্ছে। পুলিশ র‍্যাবের লোকজন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। গুম খুন হচ্ছে সরকারের প্রশ্রয়ে”।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ও জিএসপি

আইরিন আক্তার জানতে চান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতির কারণে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে কি বাংলাদেশের অসুবিধা হতে পারে ?

রাশেদ খান মেনন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের পিছনে বাণিজ্যিক যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক যুক্তি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে এটা প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তবে দেশের ভাবমূর্তির ক্ষুণ্ণ হয়েছে”।

তিনি বলেন, “১৬টির মধ্যে ১৩টি শর্ত পরিপূর্ণ পূরণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন যখন নির্বাচন বা গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টি যুক্ত হয় তখন সেটা রাজনীতিই হয়”।

হান্নান শাহ বলেন, “সব শর্ত পূরণের পর যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক কিছু বললে সরকার তা নিয়ে কথা বলতে পারে। জিএসপি যদি উপকারে নাই আসে তাহলে তেরটি পূরণ করতে গেলাম কেন”?

একজন দর্শক বলেন, “বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর টাকা দিলনা সেটাও ব্যাপার না। এখন জিএসপি গেছে সেটাও ব্যাপার না। তাহলে কত ক্ষতি হলে ব্যাপার হবে” ?

মইনুল হোসেন বলেন, “পশ্চিমা দেশের সাথে আমাদের অনেক ব্যবসা। ভারতের সাথে কতটা ব্যবসা ? তাই এটার অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে”।

জিনাত হুদা ওয়াহিদ বলেন, “বিশ্বের বড় মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র। তবে বিশ্বায়নের যুগের যুক্তরাষ্ট্রের যেমন বাংলাদেশকে দরকার আবার বাংলাদেশেরও যুক্তরাষ্ট্রকে দরকার। কারণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। তবে আমেরিকা যদি মনে করে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে চলবে সেটাও হবেনা”।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন কাঠামো

ইসমত ফারজানা জানতে চান বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্র বেতনের কাঠামো নিয়ে কি নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে ?

জিনাত হুদা বলেন, “ফি বাড়াতে হবে। গবেষণার সুযোগ, অবকাঠামো সুযোগ বাড়াতে হবে। বেতন না বাড়ালে এগুলো কিভাবে হবে”?

মইনুল হোসেন বলেন, “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলেই অবহেলিত। বেতন অবশ্যই বাড়ানো উচিত। কিছু বাড়ালে ছাত্রদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবে বলে মনে হয়না।

একজন দর্শক বলেন, “বেতন বাড়ানো উচিত যৌক্তিক পর্যায়ে। তবে সে টাকা গবেষণায় ব্যয় করা উচিত”।

হান্নান শাহ বলেন, “ভালো ভাবে লেখাপড়ার পরিবেশ দরকার। এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পরিবেশ নেই। এখন যে বেতন তা যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি সরকারি অনুদান বাড়াতে হবে”।

প্রশ্ন করছেন একজন দর্শক
ছবির ক্যাপশান, প্রশ্ন করছেন একজন দর্শক

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধাদের'কে আর ছোট করবেননা। আমাদের নেতারা যখন কথা বলেন, তখন তারা মনে করেন যে তারা যা বলেন তাই ঠিক আছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে নির্লজ্জের মতো কথা না বলে, দেশের মঙ্গলের জন্য একটি নতুন নির্বাচন দেওয়া উচিত। ক্ষমতার মোহ থেকে বের হয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। অবশ্য আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকের মনে করা নিয়ে আমাদের নেতাদের কিছু আসে যায় না। কারন তারা অনেক বড় মাপের দেশপ্রেমিক। শুধু মাত্র ছোট অনুরোধ, জ্বালাও পোড়াও আর ক্ষমতার মোহ থেকে আমাদের মু্ক্তি দিন। শুধু জনগনের কথা বলে "জনগণ" কথাটাকে আর অপমান করবেননা।

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, ঢাকা।

মইনুল হোসেন ঠিক কথা বলেছেন।

siam, detroit