বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে কিন্তু নিহত হচ্ছে সন্ত্রাসীরাই: ফারুক খান

প্যানল সদস্য বাঁ থেকে: আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, জাতিসংঘ সিডো কমিটির সাবেক চেয়ারপার্সন সালমা খান এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শাজাহান ওমর বীর উত্তম।
ছবির ক্যাপশান, প্যানল সদস্য বাঁ থেকে: আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, জাতিসংঘ সিডো কমিটির সাবেক চেয়ারপার্সন সালমা খান এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শাজাহান ওমর বীর উত্তম।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বিরোধী দল বিএনপির একজন নেতা বলেছেন যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে এবং তার দল বিএনপির নেতাকর্মীরা এসব হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে এটি ঠিক কিন্তু শুধুমাত্র সন্ত্রাসীরাই এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

সংলাপের এ পর্বে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য রাষ্ট্রপতির আহবান, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ঢাকা শহরের উন্নতির জন্য করণীয় কি –এসব বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।

ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাজাহান ওমর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল এবং জাতিসংঘ সিডো কমিটির সাবেক চেয়ারপার্সন সালমা খান।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন মুহা: রবিউল ইসলাম। তিনি জানতে চান যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় তাদের গুলিতে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে কি বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা যায়।

বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। এ প্রেক্ষিতেই এ প্রশ্নটি আলোচনায় আসে।

জবাবে আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন এগুলো অবশ্যই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। তবে যারা নিহত হয়েছেন তারা সবাই সন্ত্রাসী। যদিও সব মানুষেরই বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। তিনি বলেন অভিযান সেসব জায়গায় চলছে যেখানে বিএনপি ও জামায়াত বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

তিনি বলেন, “যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে সব বিষয়েই। তবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড গণতন্ত্রের বা কোন সরকারের ব্যবস্থা হতে পারেনা। তবে সরকারের প্রধান দায়িত্ব সাধারণ মানুষের জান মাল রক্ষা করা”।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাজাহান ওমর বলেন লুট খুন গুম এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রসফায়ারে হত্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন এগুলো টার্গেট করে করা হচ্ছে কারণ কেউ তো একটা দুটো অস্ত্র নিয়ে সরকারের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়না।

তিনি বলেন, “বিরোধী দলকে দমন করার জন্যই। আমাদের ভয় এখান থেকে বাসায় যেতে পারবো কি-না। একটা গাছ কাটলাম সেজন্য আমার জীবন নিয়ে নিবেন ? পুলিশ আত্মরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে পারে কিন্তু সেটি হবে চূড়ান্ত অবস্থা”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল বলেন যে সহিংসতার কথা বলে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে এগুলো আগেও হয়েছে। ক্রসফায়ার বা বিনা বিচারে হত্যার ঘটনাও আগে ঘটেছে। তবে এ সরকারের আমলে এর মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, “এটা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। সরকার যদি বলতে না পারে নিহতরা কাদের গুলিতে মারা গেছে তাহলে বুঝবো সরকারই করেছে। যতো সহিংসতাই হোক না কেন কোন কিছুই মানুষকে বিনা বিচারে হত্যার অধিকার দেয়না”।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইমেন ফর উইমেন এর সাবেক সভাপতি সালমা খান বলেন আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী পুলিশকে প্রয়োজন হলে নিজের দেশের নাগরিকদের এমনভাবে গুলি করতে হবে যাতে তার মৃত্যু না ঘটে। তিনি বলেন এখানে যা হচ্ছে সেটি অবশ্যই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

তিনি বলেন, “আপাতত যা দেখছি যেহেতু সঠিক তদন্ত হচ্ছেন অধিকাংশই দেখি বিরোধী দল যারা করছে তারাই হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে”।

একজন দর্শক বলেন, “নাশকতা কমাতে গিয়ে যৌথ বাহিনী কি বিরোধী কর্মীদের হত্যা করে আরও অস্থিরতা বাড়াচ্ছেনা” ?

সমঝোতার শুরু হবে কিভাবে ?

তানভীর হাসান জানতে চান দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য যে আহবান জানিয়েছেন তার শুরু কিভাবে হতে পারে ?

সালমা খান বলেন, “আলোচনা শুরুর আগে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মানুষকে প্রতিবাদের সুযোগ দিতে হবে। যেসব নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মুক্তি দিয়ে সংলাপের জন্য একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে”।

আসিফ নজরুল বলেন, “বিরোধী দল এখন অহিংস রাজনীতি করছে। সরকারকেও তাদের নেতাকর্মীদের মুক্তি দেয়া উচিত। আলোচনা হতে হবে সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে যে অংশগ্রহণমূলক অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচনকালীণ সরকার গঠনের মাধ্যমে কত দ্রুত নির্বাচন হতে পারে সেটা নিয়ে”।

একজন দর্শক বলেন, “আওয়ামী লীগ যে প্রক্রিয়ায় এসেছে একি প্রক্রিয়ায় বিএনপি দুবার ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সফল হয়েছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তাদেরই ক্ষমতায় থাকা উচিত”। আরেকজন দর্শক বলেন, “যে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে তার আগে রাষ্ট্রপতি আলোচনার কথা বললে এতো প্রাণহানি ঘটতোনা”।

আলোচনায় অংশ নিয়ে শাজাহান ওমর বলেন, “আলোচনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আসতে হবে সরকারের কাছ থেকেই। কখন কোথায় আলোচনা হবে এগুলো স্পষ্ট করে না বলে এসব আহবানের মানে কি”।

অন্যদিকে ফারুক খান বলেন, “আলোচনার আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে রাজনীতির নামে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশে এ রাজনীতি চলবেনা”।

প্রসঙ্গ: অস্ত্র মামলায় রায়

তানজিয়া আফরিণ নীরা জানতে জান বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাড়াতে কি বিশেষ কোন ভূমিকা রাখবে ?

শাজাহান ওমর বলেন, “ক্ষমতায় থাকার সময় অস্ত্র আমরাই ধরেছি। সরকার না চাইলে কি এটা ধরা যেতো তখন? আমরাই তদন্ত করেছি। চার্জশীট দেয়া হয়েছে। একটা রায় হল। এটা তো চূড়ান্ত নয়। তদন্তও পরিবর্তন হতে পারে। ন্যায় বিচারের স্বার্থে যে কোন তদন্ত আমরা করতে পারি”।

ফারুক খান বলেন, “এটা শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটা বড় পদক্ষেপ। যারা বাংলাদেশকে অস্ত্র চোরাচালানের রুট মনে করে তাদের জন্য এটা বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আর যেন এগুলো না হয় এবং বাংলাদেশের কেউ যাতে এগুলোর সাথে জড়িত না হয় সেক্ষেত্রেও এটা ভূমিকা রাখবে”।

একজন দর্শক বলেন, “যেখানে একটি অস্ত্র সহ ধরা পড়লে ফাঁসি হয় তাহলে ট্রাক ভর্তি অস্ত্রের জন্য ফাঁসি হবে কি-না”।

আসিফ নজরুল বলেন, “বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্পর্শকাতর মামলায় বিচারবিভাগ কতটুকু স্বাধীন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পুরো অঞ্চলে যারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দিয়েছে তাদের সবার বিচার হলে এ অঞ্চলে তার হয়তো একটা প্রভাব পড়তো”।

সালমা খান বলেন, “আঞ্চলিক নিরাপত্তা এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে বলে মনে হয়না। তবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটু উন্নত হবে”।

ঢাকার উন্নতিতে কি করা উচিত ?

খায়রুন্নিসা মিম জানতে চান বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের অন্যতম বলে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা। এ শহরের উন্নতির জন্য সবার আগে কি করা প্রয়োজন ?

সালমা খান বলেন, “ সবার আগে যানজট নিরসন করতে হবে এবং এটি সম্ভব”।

শাজাহান ওমর বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হবে”।

একজন দর্শক বলেন, “সবার আগে রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করা দরকার”।

আসিফ নজরুল বলেন, “সব সুবিধা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সব কিছু কেন ঢাকা কেন্দ্রিক হবে। সুবিধাগুলো বিকেন্দ্রীকরণ করলে সব সমস্যার সমাধান হবে”।

প্রশ্ন করছেন একজন দর্শক
ছবির ক্যাপশান, প্রশ্ন করছেন একজন দর্শক

ফারুক খান বলেন, “পশ্চিমা বিশ্ব প্রায়ই আমাদের টার্গেট করে অনেক কিছু বলে। তবে এটি সত্যি ঢাকা জীবনযাত্রার জন্য কষ্টকর শহর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা বায়ুদূষণ। সমাধানের উপায় বিকেন্দ্রীকরণ”।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

একজন দর্শক বলেছেন যে বাংলাদেশে যতদিন জামায়াত শিবির রাজাকার থাকবে ততদিন কোন আলোচনা হবে না। আমার কথা হলো সত্যিকারে রাজাকার খুঁজে বের করবে কে? আর জামায়াত শিবির কি সবাই রাজাকার? যদি রাজাকার হয় তাহলে তাদেরকে রাজনিতি করার অনুমতি কে দিয়েছেন?এর উত্তর কি দর্শক দিতে পারবেন।

মোঃতাওহীদুল ইসলাম জসীম, ঢাকা।

দেশের মধ্যে যে অরাজক ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সেজন্য কি সরকার দায়ি নয় ?

হারুন কুতুবী, চট্রগ্রাম।

আওয়ামী লীগের কেউ দেশ ও মানুষকে সন্মান করেনা বলেই এ ভাষায় কথা বলে।

কবির, বেলজিয়াম।

বর্তমান সরকার হলো এমন একটি “ডিজিটাল ম্যাশিন”। যে এ ম্যাশিনের তোষামোদি করে সে যত বড় রাজাকার হোক না কেন?সে হবে চেতনাবাদী মুক্তিযোদ্ধা আর যে এর সমালোচনা করবে সে বঙ্গবীর কাদের ছিদ্দিকির মত ব্যক্তিও রাজাকার হয়ে যাবে,তাই এই ম্যাশিনের প্রতি আমার কোন মন্তব্য নাই। ধন্যবাদ বিবিসিকে।

নুর মোহাম্মদ মজুমদার, দোহা, কাতার।

একজন দর্শক বলেছেন যে বাংলাদেশে যতদিন জামায়াত শিবির রাজাকার থাকবে ততদিন কোন আলোচনা হবে না। আমার কথা হলো সত্যিকারে রাজাকার খুঁজে বের করবে কে? আর জামায়াত শিবিক কি সবাই রাজাকার? যদি রাজাকার হয় তাহলে তাদেরকে রাজনীতি করার অনুমতি কে দিছেন?এর উত্তর কি দর্শক দিতে পারবেন?

মোঃতাওহীদুল ইসলাম জসীম, ঢাকা।