৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করতেই হবে : বিএনপি

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান।

বাংলাদেশ সংলাপে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান বলেছেন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন অবশ্যই বাতিল করতে হবে এবং তারপর সংলাপের মাধ্যমে নূতন নির্বাচন দিতে হবে।

তবে নির্বাচন কালীন সরকারের তথ্যমন্ত্রী এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে সংলাপ হতে পারে। তবে জঙ্গিবাদ চালু রেখে কোন কার্যকর সংলাপ হতে পারেনা।

সোমবার ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে সংলাপের এ পর্বে একতরফা নির্বাচনের কারণে বাংলাদেশ একঘরে হতে পারে কি-না, মধ্যবর্তী নির্বাচনর সম্ভাবনা কতটুকু এবং নির্বাচনী সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।

সংলাপের এ পর্বে আলোচক ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল।

অনুষ্ঠান প্রথম প্রশ্ন করেন নার্গিস জাহান মুন্নি। তিনি জানতে চান ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কি একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার দাবিকে আরও জোরদার করেছে?

জবাবে প্যানেল আলোচক বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে জে (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ নির্বাচনে দেশের মানুষ ছাড়াও আন্তর্জাতিক মহলও হতাশ হয়েছে।

তিনি বলেন, “ সমস্যা সমাধানে এখনো সুযোগ আছে। কারণ ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সংসদের মেয়াদ আছে। এর মধ্যে আরেকটা সংশোধনী আনাই যায়। এজন্য ৫ ই জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করতেই হবে। এ নির্বাচন দেশের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করেছে”।

মেজবাহ কামাল বলেন, “যেভাবে নির্বাচন হওয়ার কথা সেটি হয়নি। কিন্তু তাতে নির্দলীয় সরকারের দাবি যৌক্তিক প্রমাণিত হয়নি। আর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর প্রতিবারই সহিংসতা হচ্ছে”।

তিনি বলেন, “৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করার দরকার নেই। কিন্তু বিএনপি সহ সবাইকে নিয়ে কাজ করার জন্য আলোচনার দরজা উন্মুক্ত করা দরকার”।

একজন দর্শক বলেন, “নির্বাচন তো জনগণ এমনি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাহলে সন্ত্রাস করে ভোট কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়ার কোন দরকার ছিল” ? আরেকজন দর্শক বলেন, “এটা তো নির্বাচনই ছিলনা কারণ এখানে ছিল একপক্ষ”।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নির্বাচনের পদ্ধতিতে মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর কোন গ্রহণযোগ্যতা জনগণের কাছে নেই। তাই আলোচনা করে সমঝোতায় আসা উচিত”।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন , “অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে চারবার এবং একবারও যারা হেরেছে তারা নির্বাচনের ফল মেনে নেয়নি। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এর ত্রুটির উপর। ১৮ হাজার কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়েছে। কটি কেন্দ্রে সীল মারা হয়েছে” ?

তিনি বলেন, “৪১টি কেন্দ্রে মানুষ যায়নি। তাই বলে ১৮ হাজার ভোটকেন্দ্রের ভোট বাতিল হয়ে যাবে”?

বাংলাদেশ একঘরে হবে ?

আরিফুল ইসলাম জানতে চান একতরফা যে নির্বাচনটি হয়ে গেলো তা কি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে ফেরতে পারে ?

অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, “এ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশকে একঘরে করে ফেলার কোন সুযোগ নেই। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আসেনি। তাই বলে কিছু যায় আসেনা”।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন শক্তিশালী। আমাদের দেশ আমরা চালাবো। হয়তো বিদেশীরা আসলে নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে সেগুলো কম হতো”।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে এ নির্বাচন বাংলাদেশকে একঘরে না করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিপাকে ফেলতে পারে। বাংলাদেশ একঘরে হবে তা মনে করিনা। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক হোঁচট খাবে কিন্তু একঘরে হবেনা। তবে বড় ধরনের চাপ আসবে।”

হাসানুল হক ইনু বলেন, “একটি বিরূপ পরিস্থিতিতে এবার নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি অংশ নেয়নি। তারা থাকলে উৎসবমুখর পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হতো। বাংলাদেশকে একঘরে কেন করবে ? আমরা কোন আইন ভঙ্গ করেছি ?

তিনি বলেন, “নির্বাচনের কোন বিকল্প ছিলনা। নির্বাচন না হলে দেশ সাংবিধানিক সংকটের শিকার হতো”।

মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা চাইনা বাংলাদেশের উপর অবরোধ আসুক। কিন্তু নির্বাচনের কারণে গোটা বিশ্ববাসী হতাশ। জোর করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা হচ্ছে। এ কারণে দেশ অস্থিতিশীল হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অবরোধের কথা ভাবতেই পারে”।

মেজবাহ কামাল বলেন, “নির্বাচনের কারণে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হবে বলে আমরা মনে করিনা”।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা আছে ?

রুচিতা ভৌমিক জানতে চান ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠার পর খুব তাড়াতাড়ি একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ?

জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “বিএনপি সহ যারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে তাদের নিয়ে নির্বাচনের জন্য যে কোন সময় সংলাপ শুরু করতে পারি। কিন্তু জঙ্গিবাদ যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে কারা জড়িত সেটা দেখতে হবে। জঙ্গিবাদ, সহিংসতা অব্যাহত রেখে সংলাপ হতে পারেনা”।

তিনি বলেন, “সংলাপ কাল থেকে হতে পারে কিন্তু জঙ্গিবাদ ত্যাগ করতে হবে”।

মাহবুবুর রহমান বলেন, “দশম সংসদ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে সবাই। নতুন নির্বাচন হতে হবে এবং সেজন্য সংলাপ হতে হবে। আমরা সহিংসতায় বিশ্বাস করিনা”।

একজন দর্শক বলেন, “মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা আপাতত নেই। কারণ সরকার যেকোনো ভাবে ক্ষমতায় থাকতে চায়”।

অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, “মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়াটাই বাস্তবতা। নির্বাচনটি যেন হতে পারে সেজন্য আলোচনা শুরু দরকার। এজন্য সরকার ও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তবে এবারের সহিংসতার দায় বিএনপি ও জামায়াতকে নিতে হবে”।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “নির্বাচনের জন্য বেশি অপেক্ষা করতে পারিনা। কারণ আমি ভোট দিতে পারিনা। সব দলকে নিয়ে নির্বাচন জাতির চাহিদা। একটা সমঝোতা হতে হবে। জনমত ও আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে”।

রাজনৈতিক সংস্কার কেমন হওয়া দরকার ?

এস এস আসাদুজ্জামান নূর জানতে চান নির্বাচনী সংকটের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশে কি ধরণের রাজনৈতিক সংস্কার হাতে নেয়া প্রয়োজন?

মেজবাহ কামাল বলেন, “নির্বাচনী ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলা দরকার। ভোটের সংখ্যানুপাতে প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। ছায়া সরকার এবং সংসদের দ্বি-কক্ষ পদ্ধতি হওয়া দরকার”।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “সংসদকে কার্যকর করারই প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোন দল ঠিকমতো কাজ করতে দেয়না। হরতাল অবরোধ এর মতো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইন চাই”।

একজন দর্শক বলেন, “এমন পদ্ধতি চাই যাতে পাঁচ বছর পর পর এ অবস্থার সৃষ্টি না হয়”।

মাহবুবুর রহমান বলেন, “দেশের রাজনীতি এখন অসুস্থ। রাজনীতিকরাই দেশকে এ ধ্বংসের কাছে নিয়ে এসেছেন। এজন্য জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। সবাই মিলে সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে হবে”।

প্রশ্ন করছেন একজন দর্শক
ছবির ক্যাপশান, প্রশ্ন করছেন একজন দর্শক

হাসানুল হক ইনু বলেন, “অনেক সংস্কার দরকার। একটা স্থায়ী সমাধান করতে হবে। এজন্য নির্বাচন কালীন সরকারের করনীয় নির্ধারণ করতে হবে। সরাসরি ভোটের পাশাপাশি সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করা দরকার”।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

“নির্বাচন তো জনগণ এমনি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাহলে সন্ত্রাস করে ভোট কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়ার কোন দরকার ছিল” ? আরেকজন দর্শক বলেন, “এটা তো নির্বাচনই ছিলনা কারণ এখানে ছিল একপক্ষ”।

জামাল শেখ, ফরিদপুর

Mr Hasanul haq inu Don't Forget BNP soon will come to power then what you will do ?

shahin ahmed , sylhet

চমৎকার ! খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এবারের সংলাপে সুন্দর আলোচনা হয়েছে। বিবিসিকে ধন্যবাদ । হাসানুল হক ইনুকে ধন্যবাদ সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রতিনিধিত্ব এবং দ্বিস্তর বিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রয়োজনীয়তার কথা বলার জন্য । রাজনীতিবিদরাই যে রাজনীতি এবং দেশটাকে ধংস করছে তা স্বীকার করার জন্য মাহবুবুর রহমানকে ধন্যবাদ । তবে মেজবাহ কামাল স্যারের বিভিন্ন একপেশে বক্তব্য মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মত একপেশে বক্তব্যের কারনেই এমন বিশিষ্ট সুশিল নাগরিকদেরকে মানুষ ‘জ্ঞান পাপী’ বলে গাল দেয় ।

হাবিবুর রহমান হারুন , শেরপুর

অনেক বিদেশি বন্ধু দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনার তাগিদ দেয়ার পর ও আমাদের দেশের দুই নেত্রী সেভাবে আলোচনার তাগিদ দেয়নি। এতে জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাঁরা ত জনগনের ভালোর জন্য কাজ করে বলে দাবি করে তাহলে তাঁরা কি অচিরেই সমঝোতায় এসে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে আমাদের মত সাধারন জনগণকে রক্ষা করবে ?

মোকতাজুল, দিনাজপুর।

আজকের বিবিসির সংলাপে নির্বাচন নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পর্কে উত্তম প্রস্তাব কেউই দিতে পারেনি। আমার প্রস্তাব হলো এক সাথে একটি জেলার আসন গুলিতে প্রতি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে খন্ড খন্ড আকারে নির্বাচন করলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতো।

শাফিউল্লাহ, কুস্টিয়া

৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করতেই হবে

Siam, detroit

ভোটের বাক্স বুকে আগলিয়ে রাখলেও নিরাপদ না, যতদিন নীতিতে সদিচ্ছা না আসবে ততদিন পর্যন্ত।

এম জাহেদুল ইসলাম, ঢাকা।