বাংলাদেশ সংলাপে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা খুলনায় অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে খুলনার নব-নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেছেন, এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়।
তবে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হারুন অর রশীদ বলেছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হবে যৌক্তিক একটি কাজ।
শনিবার খুলনায় বিবিসির বাংলাদেশ সংলাপে এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে আলোচক ও দর্শকদের মধ্যে। সংলাপে আরও আলোচক ছিলেন শিক্ষাবিদ আনোয়ারুল কাদির ও দৈনিক পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফেরদৌসী আলী।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন জেসমিন সুলতানা লাজু। তিনি জানতে চান যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাজার সুবিধা বা জিএসপি সুবিধা স্থগিতের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে কি –না ?
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “জিএসপি স্থগিত হওয়ায় রফতানিতে ভাটা পড়বে। এর প্রভাব আরও পড়বে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দায়িত্ব সরকারেরই ছিল। তাই এখন অন্যের উপর দায় চাপালে হবেনা”।
হারুন অর রশীদ বলেন, “বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারো বিরোধিতা না করে সবাই মিলে যাতে সুবিধাটি ফেরত পেতে পারে সেজন্য কাজ করতে হবে। সরকার হয়তো সঠিকভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু এদেশে রাজনীতি আছে, ষড়যন্ত্র আছে”।
একজন দর্শক বলেন, “রানা প্লাজা, তাজরীন বা আমিনুল হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের উচিত ছিল কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা কিন্তু সরকার ব্যর্থ হয়েছে”।
আনোয়ারুল কাদির বলেন, “২০০৭ সাল থেকে এটি শুরু হয়েছে। কিন্তু সরকারের কানে পানি যায়নি। গার্মেন্ট জিএসপির আওতায় নেই। তাই এটা ক্ষতিকর হবেনা। কিন্তু এটা একটা খারাপ সিগন্যাল। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা কানাডা এটি অনুসরণ করলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো”।
ফেরদৌসী আলী বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে খুব একটা ক্ষতি হবেনা। তবে ইউরোপ তা অনুসরণ করলে সমস্যা হবে। সরকারের আগেই টনক নড়া উচিত ছিল। এ পরিস্থিতির জন্য সুশাসনের অভাব বা তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা দায়ী। সরকার মালিকদের ছাড় দিচ্ছে”।
বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক
মুকুল সরদার জানতে চান, সুন্দরবনসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রামপালের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ কি এগিয়ে নেওয়া যায়?
বাগেরহাটের রামপালে ভারতের সহায়তায় কয়লা ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক চলছে অনেক দিন ধরেই। বেশ কিছু রাজনৈতিক দল ও পরিবেশ ভিত্তিক সংগঠন বলছে, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে। তবে কর্তৃপক্ষ অবশ্য ইতোমধ্যেই এ আশংকা নাকচ করে দিয়েছে।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, রামপালের প্রকল্পটি দেশের জনগণের স্বার্থ বিরোধী একটি প্রকল্প। এটি এখনই বন্ধ করা উচিত।
তিনি বলেন, “আমাদের বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু বিকল্প পথে যেতে হবে। যেখানে জীববৈচিত্রের ঝুঁকি নেই। রামপালে এ প্রকল্প যারা নিয়েছে তাদের স্বার্থ রয়েছে।”
তবে শেখ হারুন অর রশীদ বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের কোন বিকল্প নেই। কারণ উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য।
তিনি বলেন, “তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎ ছাড়া আমরা চলতে পারিনা। বিদ্যুৎ উৎপাদন আট হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছে গেছে। রামপালে কয়লা ভিত্তিক কেন্দ্রটি নির্মাণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”
তবে অন্য দু’জন আলোচক শিক্ষাবিদ আনোয়ারুল কাদির ও দৈনিক পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফেরদৌসী আলী বলেন, কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের প্রয়োজন আছে।
মি. কাদির বলেন, সুন্দরবন আরও অনেক কারণেই ক্ষতির শিকার হচ্ছে। একটু ক্ষতি হলেও রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র না করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
তিনি বলেন, “পোর্টের কারণেও তো সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রামপালে কাজটা করা যায়। একটু ক্ষতি হতে পারে কিন্তু ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি।”
মিস. ফেরদৌসী বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে সুন্দরবনের বড় ধরনের কোন ক্ষতি হবেনা। আর পরিবেশ নয়, মূলত স্থানীয় কিছু মানুষের জমির কারণেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “ক্ষতি একটু হবে তবে সেটা ব্যাপক আকারে হবেনা। জমির কারণ ছাড়া বিরোধিতা করার আর কোন কারণ নেই।”
তবে দর্শকদের অনেকেই সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করেন।
একজন দর্শক বলেন, “আমি নির্বাক এতো ক্ষতি সত্ত্বেও সরকার কিভাবে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর একটি জায়গার কাছে কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে।”
আরেকজন দর্শক বলেন, “সুন্দরবনের ১৪ মাইলের মধ্যে এখনই প্রকল্পটি বন্ধ করা উচিত। গাছ গাছালি নষ্ট হবে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে।”
তবে অপর একজন দর্শক বলেন, “সুন্দরবন অন্য অনেক কারণে নষ্ট হচ্ছে। সেখানে উন্নয়নের স্বার্থে কেন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করবো।”
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
নাসরিন হক জানতে চান নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আবারও যেভাবে বাড়ছে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য কি সরকারের কঠোর হওয়া উচিত ?
আনোয়ারুল হক বলেন, “মূল্য বাড়ে মজুতদারির জন্য। সরকারের ভূমিকা খুব একটা শক্ত নয়। সরকারের কঠোর হওয়ার অনেক সুযোগ আছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ গুলো সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া দরকার”।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “সরকার কোন ব্যবস্থাই তো নিচ্ছেনা। সরকারের উচিত কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু সরকার সেটা নিচ্ছেন। রোজা আসছে আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট দ্রব্যগুলোর দাম বাড়ছে। তাই ব্যবস্থা নেয়ার এখনি সময়”।
একজন দর্শক বলেন, “রমজান আসলেই দ্রব্যমূল্য বাড়ে। আশা করি শেষ বছরে সরকার কঠোরতম ব্যবস্থা নিবে এবং টিসিবি কে ব্যবহার করে মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখবে”।
ফেরদৌসী আলী বলেন, “ব্যবসায়ীরা সব দলের মানুষ। রমজান আসলেই হুলস্থূল পড়ে যায়। সরকারের উচিত শক্ত ব্যবস্থা নেয়া”।
শেখ হারুন অর রশীদ বলেন, “যেসব ব্যবসায়ী এসব করে তারা সবসময় সরকারি দলের সঙ্গে থাকে। সব রাজনৈতিক দলগুলোকে এদের বিষয়ে কঠোর হতে হবে। টিসিবিকে কার্যকর করতে হবে”।
শিল্প নগরী খুলনার পুনরুজ্জীবন
সোনিয়া পারভীন জানতে চান খুলনা এক সময় পরিচিতি ছিল শিল্প নগরী হিসেবে। খুলনাকে আবারো শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য কি করা উচিত ?
ফেরদৌসী আলী বলেন, “কোন সরকারই বন্ধ কারখানা চালুর জন্য পদক্ষেপ নেয়নি। এগুলো চালু করতে সবার সদিচ্ছা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা হচ্ছেনা। কারখানা বন্ধের পেছনে যারা আছেন তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া দরকার”।
আনোয়ারুল কাদির বলেন, “বন্দরের কারণে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছিলো। শিল্প নগরীর জন্য দরকার অবকাঠামো। কিন্তু এখানে গ্যাস নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ অবকাঠামো যথেষ্ট ভালো নয়। কোন সরকারই এসব বিষয়ে খুলনার প্রতি সদয় ছিলেননা”।
একজন দর্শক বলেন, “বন্দর বন্ধ হওয়ার কারণ কি ? সে কারণগুলো এড়ানো যেতো কি-না যাতে শিল্প নগরী টিকে থাকতে পারতো ?”
শেখ হারুন অর রশীদ বলেন, “বিগত সরকারের আমলে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছিলো। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকগুলো চালু করেছে”।

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “চট্টগ্রামে যে সুবিধাগুলো আছে খুলনায় সেগুলো নেই। তাই আমরা পিছিয়ে পড়ছি। অবিলম্বে গ্যাস আনতে হবে। বিদ্যুৎ সহজলভ্য করতে হবে। মংলা বন্দর আরও গুরুত্ব দিতে হবে। রেল ও সড়ক যোগাযোগ বাড়াতে হবে”।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
Actually all political parties are in Business, some are playing with business some are playing with lives. What is the result if not implement rules & regulations. rise of daily commodities. It never controlled till stop expending & investing money for election. We the peoples are Ginue pig.
Azmal Hossain, Chittagong








