সিটি নির্বাচনের ফল সরকারের প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন : বিএনপি

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ এবং খান ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা খন্দকার।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহ এবং খান ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা খন্দকার।

বিবিসির বাংলাদেশ সংলাপে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসম হান্নান শাহ্‌ বলেছেন চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটাররা সরকারের ব্যর্থতার জবাব দিয়ে সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেছে। এতে চলমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন আরও জোরদার হবে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে আওয়ামী লীগ-নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অংশীদার দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, এই পরাজয় অনাস্থা নয়, এটি একটি সতর্কবাণী। তবে এ নির্বাচনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকায় বাংলা একাডেমী মিলনায়তনে রোববার এ অনুষ্ঠানে আরও আলোচনায় অংশ নেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন এবং বেসরকারি সংস্থা খান ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রোকসানা খন্দকার।

অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন শারমিন ফাতেমা। তিনি প্রশ্ন করেন গতকাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয় কী সরকারের প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন কি-না।

গত শনিবার বাংলাদেশের রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিরোধী দল বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নটি আলোচনায় আসে।

হান্নান শাহ বলেন, “ভোটাররা সরকারের ব্যর্থতার এবং জাতীয় সমস্যা সমাধান না করতে পারার কারণেই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলকে ভোট দিয়েছে। এটি স্থানীয় নির্বাচন হলেও কোথাও স্থানীয় ইস্যু নিয়ে কথাবার্তা হয়নি। আমরা চেষ্টা করেছি সরকারের ব্যর্থতা দেখিয়ে জনগণের ভোট আদায়ের জন্য এবং আমরা তাতে সফল হয়েছি”।

রাশেদ খান মেনন বলেন, “নির্বাচনের ফল অনাস্থা নয়, এটি সতর্কবাণী সরকারের প্রতি। সরকারের এটা বিবেচনায় নিতেই হবে। এখানে দেখা গেছে উন্নয়নই প্রধান বিষয় নয়, রাজনীতিও অন্যতম বিষয় হিসেবে এখানে এসেছে। তবে সরকার এটা ভালো নির্বাচন করতে পেরেছে এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, যেটা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”।

তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি এ নির্বাচনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কারণ একটি সরকারের অধীনে কত ভালো নির্বাচন হতে পারে সেটিও প্রমাণ হয়েছে।”

একজন দর্শক বলেন, “নির্বাচনে অনাস্থার প্রতিফলন ঘটেনি। কারণ এটি স্থানীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বেনা”।

আরেকজন দর্শক বলেন, “অনাস্থার প্রতিফলনই ঘটেছে। তবে এটি প্রাথমিক অনাস্থা। পরে জাতীয় নির্বাচনে আরও বড় অনাস্থা জ্ঞাপন করবে”।

একজন দর্শক বলেন, “মহাজোটের মহা ভরাডুবি হল। এটি সরকারের প্রতি মহা সংকেত দিয়ে দিল”।

রোকসানা খন্দকার বলেন, “এবারের নির্বাচনে একটি ভিন্নতা ছিল। জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটেছে। জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চয়ই তারা সেভাবেই চিন্তা করেছে”।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “অতি দলীয়করণ হয়েছে নির্বাচনগুলো। দলীয়করণের খেসারত মহাজোট সরকার দিয়েছে। জাতীয় রাজনৈতিক সংকটের আঁচড় পড়েছে এ নির্বাচনের উপর। অত্যন্ত প্রকটভাবে দলের বিষয়গুলো চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রার্থীরা লিলিপুট হয়ে গেছে। দলের যারা ছিলেন তারাই বড় হয়ে গেছে। ভোটাররাও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছে। স্থানীয় ইস্যুগুলো গুরুত্ব পায়নি”।

তত্ত্বাবধায়কের দাবি দুর্বল হবে ?

সাইরাজ কামরুল জানতে চান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে দুর্বল করবে না ?

হান্নান শাহ বলেন, “আমরা জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে চাই। এটি কেউ অন্তর্বর্তীকালীন বললেও আমাদের আপত্তি নেই। সিটি নির্বাচনের ফল জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আমাদের যে দাবি তাতে কোন প্রভাব ফেলবেনা বরং আরও জোরদার হবে। জাতীয় নির্বাচন অনেক ব্যাপক বিষয়। সেখানে আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মানিনা এমনকি খালেদা জিয়াকেও মেনে নিবোনা। নিরপেক্ষ হতে হবে”।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “জাতীয় সংসদ নির্বাচন সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন। সেখানে নয় কোটি ভোটার ভোট দেবে। সেই নির্বাচনের জন্য এমন একটি সরকার দরকার যারা জনগণের কাছে নিরপেক্ষ বলে বিবেচিত হবেন”।

একজন দর্শক বলেন, “সিটি নির্বাচনের ফল বিএনপির দাবি দুর্বল করবে”।

আরেকজন দর্শক মন্তব্য করেন, “আমার মনে হয়না এটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি দুর্বল করবে”।

রোকসানা খন্দকার বলেন, “স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা। রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় না নিয়ে নির্বাচন না হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবেনা। এবারের নির্বাচনের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি দুর্বল হওয়ার কথা নয়। দুর্বল না হয়ে বরং দাবিটিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে”।

রাশেদ খান মেনন বলেন, “বিএনপির দাবি যদি নির্বাচনের জন্য হয় তাহলে এ নির্বাচনের পর সে যুক্তির ধার তো কমে যাবে এতে তো সন্দেহ নাই। বিএনপি এ নির্বাচনে এসেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেও নির্বাচনে আসবে। কারণ নির্বাচনের তো কোন বিকল্প নেই আর সরকার চাইলেও এখন আর নির্বাচন ম্যানিপুলেট করতে পারবেনা”।

সন্ত্রাস দমন আইনের সমালোচনা

জান্নাতুল মরিয়ম মিশু জানতে চান সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া সংশোধিত সন্ত্রাস বিরোধী আইন কি নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করতে পারে কি-না ?

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে। আমি আশা করি সংসদ সদস্যরা বিষয়টি আবার দেখবেন। কারণ সব ক্ষমতা পোশাকধারীদের দেয়া ঠিক নয়। এতে আইনের অপব্যবহার হতে পারে”।

রোকসানা খন্দকার বলেন, “অবশ্যই এ আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি সরকারের সময়েই আইনের অপপ্রয়োগ হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। তারপর এ ধরনের আইন হলে তা হবে সাধারণ মানুষের জন্য হয়রানিমূলক”।

একজন দর্শক বলেন, “এখানে যে সরকারই ক্ষমতায় আসে পুলিশকে তারা নিজেদের জন্য ব্যবহার করে। আবার আইনও করে নিজেদের স্বার্থে”।

আরেকজন দর্শক বলেন, “আইনটি তড়িঘড়ি করে হয়েছে বলে জনগন কিছুই জানি না। তবে আমি জানি এ আইনে এমন কিছু রয়েছে তাতে মানবাধিকার জনগণ হতে পারে”।

হান্নান শাহ বলেন, “যে আইনটি করা হয়েছে এর মতো কালো আইন অতীতে আর কখনো হয়েছে বলে জানিনা। পুলিশকে এতো ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যে পুলিশ অন্যায় করলে জবাবদিহিতার কোন সুযোগ নেই। জনগণ জানে আমাদের পুলিশ কতটুকু দক্ষতা বা সততার সাথে কাজ করে”।

রাশেদ খান মেনন বলেন, “অতীতে বিএনপির সময়ে জননিরাপত্তা আইন করা হয়েছিলো এবং সেটি এমন ছিল যে রাষ্ট্রপতিকে তা আবার ফেরত পাঠাতে হয়েছিলো”।

তিনি বলেন, “এবার জনগণ এবং সংসদকে সদ্য পাশ হওয়া এ আইন সম্পর্কে জানানোর প্রয়োজন ছিল। এ আইনটির পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। আইনটি আবার পর্যালোচনা করা উচিত”।

নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস

রওশনা আমিন রুমি জানতে চান গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিকার কি ? সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় এ বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

রোকসানা খন্দকার, “সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণেই এগুলো হচ্ছে। যে সরকারই আসুক তাদের সদিচ্ছার অভাবেই এগুলো হয়”।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সুশাসনের অভাব এবং এটি একটি বড় দুর্নীতি। সদিচ্ছার অভাব আছে সরকারের। নাহলে না বন্ধ হওয়ার কোন কারণ নেই”।

একজন দর্শক বলেন, “৪২বছর ধরে এটি চলছে। যারা সুবিধাভোগ করে তারাই এটি বন্ধ করতে দেয়না”।

হান্নান শাহ বলেন, “প্রশ্ন ফাঁস একটি গুরুতর অপরাধ। প্রশাসনে যারা থাকুক যে সরকারই থাকুক তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে”।

দর্শকদের একাংশ
ছবির ক্যাপশান, দর্শকদের একাংশ

রাশেদ খান মেনন বলেন, “আগের চেয়ে এটা একটু কমেছে। তবে যারা দোষী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। একটা চক্র দাঁড়িয়ে গেছে”।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

All the panel members and participants have talked nicely and the point of discussions were signinificant. Brgd. Shakhawat's presence was delightful. Thanks. Ratan Jyoti, Bangkok.