সংসদ বর্জন রোধে আইন চাই: বাংলাদেশ সংলাপে আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রাজশাহীতে শনিবার বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বর্জন বন্ধে আইন প্রণয়নের কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য। তিনি বলেন ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকার যে বিধান সেটি কমিয়ে ৩০ দিনে নিয়ে আসা উচিত। বিরোধী দল বিএনপির একজন নেতা বলেছেন যথাযথ সম্মান পায়না বলেই তার দল সংসদে যাচ্ছেনা।
তবে দর্শক ও আলোচকদের অনেকেই বলেছেন আইন প্রণয়ন করে হবেনা, দায়িত্ববোধ থেকেই সংসদ সদস্যদের সংসদে যেতে হবে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে ম্যাচ ফিক্সিং এর দায়ে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল ক্ষমা পেতে পারেন কি-না, এবং নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে আবাসিক গ্যাস সংযোগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দল বলছে ১৫ ই জুনের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই এখন নগরীতে গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে।
রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সংলাপের এ পর্বে প্যানেল সদস্য ছিলেন রাজশাহী-৬ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ মোঃ শাহরিয়ার আলম, রাজশাহী জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ নাদিম মোস্তফা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী ও নাগরিকদের সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জামাত খান।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে একজন দর্শকের প্রশ্ন ছিল দলীয়ভাবে সংসদ অধিবেশন বর্জনের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবি। এ ধরনের আইন কি করা যেতে পারে ?
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে অংশ নিয়ে আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোঃ শাহরিয়ার আলম বলেন এ পর্যন্ত চারটি সংসদের মধ্যে ৯১ আওয়ামী লীগ ১৩৫ দিন, ৯৬ এ বিএনপি ১৬৩ দিন, ২০০১ এর পর আবার আওয়ামী লীগ ১৫০ দিন এবং এবার সংসদের ১৮ তম অধিবেশন বসার আগ পর্যন্ত বিএনপি ২৮৩ দিন অধিবেশন বর্জন করেছে এবং এটি বেড়েই চলেছে।
শাহরিয়ার আলম বলেন, “কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হচ্ছে সংসদে না গিয়ে। সংসদ সদস্য হয়ে গাড়ি বাড়ি সুবিধা নিচ্ছি। প্লট পাচ্ছি। ৯০ দিনের যে বিধান রয়েছে সেটাকে কমিয়ে আনা উচিত”। রাজশাহী জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা বলেন, “বিএনপি সংসদে যোগ দিয়েছিলো। কিন্তু বিএনপিকে সংসদে কথা বলতে দেয়া হয়না বলেই সংসদ নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে”। তিনি বলেন, “সঠিক ভাবে নির্বাচনের ফলাফল হলে বিএনপি বয়কট করতোনা। যেহেতু বিএনপিকে কথা বলতে দেয়া হয়না। যে সম্মান পাওয়ার কথা ছিল সেটা কিন্তু দেয়া হচ্ছেনা”।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, সংসদ বর্জন গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। যখন যে-ই বিরোধী দল থাকুক মানুষ চায় তারা দায়িত্ব পালন করুক। সংসদ বর্জন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, “আইন করে কিছু হয়না। কিন্তু তারপরেও দরকার হলে আইনও বাধ্য হয়ে করতেই হবে। না হলে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা ঠিক হবেনা”।
রাজশাহী শহর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জামাত খান বলেন সংসদ বর্জন করা ঠিক নয়। নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেয় সংসদ সদস্যরা। সেগুলো বাস্তবায়নের কথা বলার জায়গা হলো সংসদ। তিনি বলেন, “ওয়াক আউট বা বর্জন করে হবেনা। সংসদে থেকেই দাবি দাওয়া তুলে ধরতে হবে।”
এ প্রসঙ্গে কয়েকজন দর্শক আইন করার কথা বললেও অনেকেই আবার বলেছেন শুধু আইন করে এ সমস্যার সমাধান হবেনা, দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে সংসদ সদস্যদের।
একজন দর্শক বলেন, “আইন করা দরকার কারণ সংসদ বর্জন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকজন বলেন, “ আমার মনে হয় নৈতিকতা থাকা দরকার”। আরেকজন বলেন, “সংসদের প্রতি মায়া বা জনগনের প্রতি দায়িত্ববোধ না হলে আইন করে কিছু হবেনা”। অপর একজন দর্শক বলেন, “পরিবেশ সৃষ্টি হলেই বিরোধী দল সংসদে গিয়ে কথা বলতে পারবে”।
ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুলকে ক্ষমা প্রসঙ্গ
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় প্রশ্নে একজন দর্শক রুকাইয়া জান্নাত বৃষ্টি জানতে চান ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল কে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধের পর অনেকেই তাকে ক্ষমা করে দেয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। এ মত কি গ্রহণযোগ্য ?
এ প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, “আশরাফুল একটা ভুল করেছেন এবং এটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তবে তার বক্তব্যের যে বাকি অংশগুলো আছে সেটাও তদন্ত হওয়া উচিত। যদি এখানে কোন মিথ্যা থাকে সেগুলোরও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা আশা করব আশরাফুলের যেন গুরুতর কোন শাস্তি না হয়”।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল স্পট ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চান। স্পট ফিক্সিংয়ের সাথে আশরাফুলেরর জড়িত থাকার এ ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।
একজন দর্শক বলেন, “আশরাফুল পুরো জাতির মাথা হেট করে দিয়েছে ম্যাচ ফিক্সিং এর মাধ্যমে। তাকে ক্ষমা করলে নতুন প্রজন্ম মনে করবে অপরাধ করলে ছাড় দেয়া যায়”। আরেকজন দর্শক বলেন, “আশরাফুলকে ক্ষমা করলে অনেকেই ছাড় পেয়ে যাবে”। অপর একজন বলেন, “অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত”।
মোহাম্মদ জামাত খান বলেন, আশরাফুলকে সম্পূর্ণ ক্ষমা তাকে করা যাবে না। যদি সম্পূর্ণ ক্ষমা করা হয় তাহলে পরবর্তীতে অন্যান্যারাও এই সুযোগটা নেবে। সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, আমি তাকে পুরোপুরি মাফ করে দেয়া হোক সেটা বলছি না। তবে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তার সাথে জড়িতদের যেন খুজে বের করা হয়।
নতুন গ্যাসের সংযোগ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কৌশল?
এদিকে শুক্রবার রাজশাহীতে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ ই জুন এ শহরে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হওয়ার কথা। একজন দর্শক জানতে চান নির্বাচনের মাত্র সাত দিন আগে গ্যাস সংযোগ কি নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কৌশল ?

শাহরিয়ার আলম বলেন, “গ্যাস সংযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক। কারণ বিরোধী দল এটি নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলো”। নাদিম মোস্তফা বলেন, “পরিকল্পিত ভাবেই নির্বাচনের আগে গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু করেছে সরকার। এটি নির্বাচনী আচরণ বিধির লঙ্ঘন”।
জামাত খান বলেন, গ্যাসের দাবি রাজশাহীর মানুষের প্রাণের দাবি। তবে এটা নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে উল্লেখ করে মি. খান হবে বলেন, এত তাড়াহুড়ো না করে পরেও গ্যাসের সংযোগ দেয়া যেত।
এ বিষয়ে একজন দর্শক বলেন, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে কয়েকটি বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ, এটা আমার মনে হচ্ছে লোক দেখানো। আরেকজন দর্শক বলেন, গ্যাস সংযোগ তো ঠিকই দেয়া হলো, কিন্তু কেন এত দেরি হলো?
সুস্মিতা চক্রবর্তী এ প্রসঙ্গে বলেন দীর্ঘ সময় ধরে রাজশাহীর মানুষ গ্যাস সংযোগ পাবার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করছে। এটা এখন নির্বাচনের আগে গ্যাস সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে যেটি ইতিবাচক একটি দিক।
বাজেটে কৃষিখাতে ভর্তুকি কমানোর যুক্তি কতটা
এবারের বাজেটে কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব পাশ হলে কি কৃষিখাত আরো বেশী সমস্যার মুখোমুখি হবে?
সম্প্রতি সময়ে সংসদে উত্থাপিত বাজেটে যাতে কৃষিখাতে গতবারের তুলনায় পাঁচশ কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে যার প্রেক্ষিতে এ প্রশ্ন করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জামাত খান বলেন, “উত্তরবঙ্গ হচ্ছে কৃষিনির্ভর এলাকা। বাজেটে যে এই ভর্তুকি কমানো হয়েছে এটা আমাদের এ অঞ্চলের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসবে”। তিনি বলেন কৃষকদেরকে বাঁচানোর স্বার্থে আরও ভর্তুকি দিতে হবে।
এ নিয়ে নাদিম মোস্তফা বলেন, “বর্তমান সরকারের শাসনামলে সারের দাম বেড়েছে বলে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। হঠাত করে পাঁচশ কোটি টাকা এই ভর্তুকি থেকে কমে গেল। এতে করে কৃষক তো শেষ হয়ে গেল”। সুস্মিতা চক্রবর্তীও মনে করেন এ ভর্তুকি কমানো ঠিক হয়নি।
বাজেটের এই কৃষি প্রসঙ্গে দর্শকরাও মনে করেন এতে করে কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে। একজন দর্শক বলেন “মূলত পদ্মা সেতু খাতে দুর্নীতির কারণেই কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে”। একজন বলেন, “পত্রিকায় দেখলাম কৃষক ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ১৬ টাকা, অথচ সেটা বিক্রি হচ্ছে ৮ টাকায়। এটা নিয়ে সরকারি দল বা বিরোধী দল কেউই কোন আলোচনা করেনি”। আরেকজন দর্শক বলেন, “এটা সরকারের কৃষিবিমুখ নীতির বহিঃপ্রকাশ। একজন কৃষকের সন্তান হিসেবে আমি মনে করি এটা কৃষকের পেটে লাথি মারার সমান”। অপর এক দর্শক ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, “বাংলার কৃষককে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও দক্ষ করতে আমরা কৃষিতে ভর্তুকি কমানোকে সমর্থন করছি যাতে জাতি উন্নততর কৃষিসেবা নিজে থেকেই করতে পারে”
এ নিয়ে জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন বর্তমান সরকারের আমলে কৃষিখাতে উন্নতি হয়েছে, সারের দামও সেই অর্থে বাড়েনি। কৃষিকে স্বাবলম্বী করতেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “প্রতিটা ক্ষেত্রে বরাদ্ধ বেড়েছে, পাঁচশ কোটি যেটা কম যেটা কৃষিতে দেখছেন সেটা প্রয়োজনে বাড়িয়ে দেয়া হবে”।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
কোনো জনপ্রতিনিধিকে যদি আইন করেই তার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হয় তাহলে জনপ্রতিনিধিত্বের মৌলিক মুল্যবোধ কোথায়? পরিবর্তনই যেহেতু উন্নয়নের চালিকাশক্তি সেহেতু সর্বস্তরে সেই জনপ্রতিনিধিত্বেরই উত্তরনের(Succession)লক্ষে একটি আইনগত বিধান থাকা অতি আবশ্যক। একই ব্যক্তি বা পরিবার আজীবন ক্রমাগত একটি দলের,এলাকার বা দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব করবেন,এটি যোগ্য নেতৃত্বের উন্মষের প্রশ্নে এক বিশাল বাধা এবং যাবতীয় হানাহানি,খুনোখুনি, হরতাল, আজেবাজে বাক-বিতন্ডার সময ও সুযোগ হারাবার মুল কারন। এ বিষয়ে আমাদের করণীয় কি ?








