বাংলাদেশ সংলাপে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক

প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড: মসিউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক।
ছবির ক্যাপশান, প্যানেল সদস্য বাঁ থেকে: প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড: মসিউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান, অনুষ্ঠান সঞ্চালক আকবর হোসেন, মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক।

বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারি কর্তৃত্ব বাড়ানোর উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করে বিরোধী দল বিএনপি বলেছে, স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই সরকার এ কাজ করছে এবং এতে দেশের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জবাবে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছেন গ্রামীণ ব্যাংক কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

শনিবার বিবিসির বাংলাদেশ সংলাপ অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড: মসিউর রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান।

বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় একটি কমিশন গঠন করেছিলো সরকার। সম্প্রতি এ কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ব্যাংকের বর্তমান কাঠামো বদলে শিল্প ব্যাংক বা পল্লী বিদ্যুতের আদলে গ্রামীণ ব্যাংককে সাজানোর সুপারিশ করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে বিবিসির বাংলাদেশ সংলাপ অনুষ্ঠানে জহিরুল ইসলাম নামে একজন দর্শক জানতে চান গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামো পাল্টানোর যে সুপারিশ করা হয়েছে তা কি এই প্রতিষ্ঠানটির কল্যাণে নাকি এটি এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের প্রতি প্রতিহিংসার বহি:প্রকাশ ?

জবাবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডঃ মসিউর রহমান বলেন গ্রামীণ ব্যাংকের শাখা প্রশাখা কত সে সম্পর্কে কারোই স্পষ্ট কোন ধারণা নেই। তাই আইন অনুযায়ী কমিশন হয়েছে। তারা এগুলো দেখছে। এর মধ্যে অন্য কোন উদ্দেশ্য খোঁজ করা ঠিক হবে না। কারও ভিন্নমত থাকলে কমিশনের কাছে দিতে পারে।

তিনি বলেন, “গ্রামীণ ব্যাংক কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ড. ইউনুসের প্রতি আমাদের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা আছে। তার সাথে প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবেনা।”

ড. ওসমান ফারুক বলেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দুর্নীতি হচ্ছে, সেগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে সেগুলো নিয়ে সরকার কোন তদন্ত করছে না। অথচ গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে যা করছে সেটা অনেকাংশেই প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ- যা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।

তিনি বলেন, “এখনই সব বন্ধ করে গ্রামীণ ব্যাংক যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। এতে শুধু সরকারের ভাবমূর্তি নয়, দেশের ভাবমূর্তিও বাইরে নষ্ট হচ্ছে। অধ্যাপক ইউনুস ফেলে দেওয়ার মতো লোক নন।”

দর্শকদের মধ্যে অধিকাংশই গ্রামীণ ব্যাংক এবং অধ্যাপক ইউনুসকে নিয়ে সরকারি উদ্যোগের সমালোচনা করেন।

একজন দর্শক বলেন, “সরকারি সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানই অলাভজনক। গ্রামীণ ব্যাংককে সরকারি করে এটাকেও কি অলাভজনক করা হবে?”

আরেকজন দর্শক বলেন, “দেশে এখন হাজারো সমস্যা। জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরাতে এটি সরকারের একটি নাটক।”

ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন এখানে গ্রাস করা ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। আর যা হচ্ছে সেটা হল একজনকে সারা পৃথিবীর কাছে খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “সোনালী ব্যাংক নিয়ে কোন কমিশন গঠনের চেষ্টা কি করা হয়েছে ?”

অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান বলেন হঠাৎ করে অধ্যাপক ইউনুসকে বিব্রত করার হয়তো সুদূরপ্রসারী কোন উদ্দেশ্য রয়েছে। সরকারের পক্ষে মুখ রক্ষার উদ্যোগ হতে পারতো যদি তারা সসন্মানে গ্রামীণ ব্যাংককে আবার ড. ইউনুসের কর্তৃত্বে নিয়ে আসতেন।

কিন্তু সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য কি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “শুনতে পাই পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তার একটা ভূমিকা থাকতে পারে। বা এমনও হতে পারে যে তার অধ্যাপক ইউনুসের চরিত্র হননের একটি নতুন ষড়যন্ত্র হচ্ছে”।

প্রধানমন্ত্রীর আশংকার ভিত্তি আছে কি ?

ইমাম হোসাইন সোহেল জানতে চান তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলে নির্বাচন নাও হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী যে আশংকা প্রকাশ করেছেন তার কোন ভিত্তি আছে কি ?

এম শাহীদুজ্জামান বলেন, “ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে তাকে ও বিরোধী দলীয় নেত্রীকে জেলে যেতে হবে। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা স্বীকারোক্তি যে তিনি হয়তো এমন কিছু করেছেন যার কারণে উনি নিজেই বলছেন জেলে যাওয়ার কথা। এসব কথা মানায়না তাকে”।

সারা হোসেন বলেন, “অধিকাংশ জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইছে। এটা প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করা উচিত। আমরা একটা নির্বাচন দেখতে চাই যেখানে আমরা আমাদের ইচ্ছা মতো ভোট দিয়ে আসতে পারবো”।

একজন দর্শক বলেন, “মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী জেলে যাবেন সেটা তো আমাদের দেখার বিষয় নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু নির্বাচন না, দুর্নীতির বিষয়টাও দেখা উচিত”।

ওসমান ফারুক বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আশংকার কোন ভিত্তি নেই। এ প্রধানমন্ত্রীই ১৭৩ দিন হরতাল করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য। যে কারণে এটি চাওয়া হয়েছিলো যে রাজনীতিকদের মধ্যে আস্থাহীনতার জন্য, সে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেনি”।

মসিউর রহমান বলেন, “সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি ব্যবস্থা আছে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো। বিরোধী দলের কোন প্রস্তাব থাকলে তারা সংসদে সংশোধনী প্রস্তাব আনতে পারে। আমার সন্দেহ হয় বিরোধী দলের আসলে কোন সুচিন্তিত প্রস্তাব নেই”।

টিকফা চুক্তি নিয়ে বিতর্ক

অরুণা চৌধুরী জানতে চান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত টিকফা চুক্তি কি বাণিজ্য বিনিয়োগ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ হানির কারণ হতে পারে ?

এম শাহীদুজ্জামান বলেন, “ এ চুক্তি দুদেশকেই সমান সুবিধা দেবে। চুক্তিটি হলে যুক্তরাষ্ট্র একতরফা ভাবে কোন পদক্ষেপ নিতে পারবেনা। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাগুলো কার্যকর ভাবে বৃদ্ধি পাবে। যদি দেখা যায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাহলে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারবে।”

ওসমান ফারুক বলেন, “ চুক্তিটি বাণিজ্যের জন্য হলে আমার আপত্তি নেই। তবে এ চুক্তিটি নিয়ে কোথাও কোন আলোচনা হয়নি। সংসদেও আলোচনা হয়নি। এ মূহুর্তে রাজনৈতিক ফায়দা বা সুবিধা আদায়ের জন্য এ সময়ে এ চুক্তিটি করা হচ্ছে”।

একজন দর্শক বলেন, “গার্মেন্টে জিএসপি পাওয়ার জন্যই হয়তো এটি করা হতে পারে?”

মসিউর রহমান বলেন, “এ চুক্তির কারণে বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। দুদেশের অর্থনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনার জন্য একটা ফোরাম দরকার ছিল”।

সারা হোসেন বলেন, “ সবচেয়ে ভালো হবে চুক্তির মধ্যে কি আছে সেগুলো প্রকাশ করা। চুক্তির বিষয়বস্তু জনগণকে জানানো উচিত”।

সংসদে আপত্তিকর শব্দ প্রতিরোধে আইন

ঈপ্সিতা কনক শ্যামলী জানতে চান জাতীয় সংসদে কিছু শব্দ ব্যবহার বন্ধে আইন করা যায় কি-না ?

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন সংসদ সদস্য আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করে সমালোচিত হয়েছেন। ঐ শব্দগুলো সংসদে কার্যবিবরণী থেকেও বাদ দেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন স্পিকার। এ প্রেক্ষিতেই বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

এম শাহীদুজ্জামান বলেন, “গত কয়েকদিন সংসদের কথা শুনে লজ্জাজনক মনে হয়েছে। আসলে দীর্ঘসময় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ছিলনা। সংসদে নিয়মিত ভালো আলোচনা হলে এমনটি হতোনা”।

সারা হোসেন, “কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা তো সংসদের বিষয় হতে পারেনা। সংসদের বিষয়গুলো হবে টিকফা, তত্ত্বাবধায়ক বা জনগণের সঙ্গে জড়িত সেগুলো”।

ওসমান ফারুক বলেন, “নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্পিকারের ক্ষমতা রয়েছে। আইনের প্রয়োজন নেই”।

দর্শকদের একাংশ
ছবির ক্যাপশান, দর্শকদের একাংশ

মসিউর রহমান বলেন, “সংসদে অসৌজন্যমূলক শব্দ ব্যবহার করা যায়না। সংসদ বা স্পিকারই এটা নিয়ন্ত্রণ করবেন”।

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:

আমি মনে করি ড: ইউনুস কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা না করলে উনারই সমস্যা হবে কারন আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি হেফাজতকে নিয়ে সরাকর গঠন করে তা হলে গ্রামীণ ব্যাংকের যে ৮৫ লাখ সদস্য রয়েছেন তারা তো ঘর থেকে বাহির হতে পারবেনা।

অরুন ঘোষ, মালদ্বীপ