তারেকের বিরুদ্ধে পরোয়ানা সরকারের ইঙ্গিতেই : বাংলাদেশ সংলাপে বিএনপি

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে অংশ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন অভিযোগ করেছেন দলের লন্ডন প্রবাসী নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারের ইঙ্গিতেই কাজ করেছে।
তবে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীন।
ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংলাপের এই পর্বে বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্পট ফিক্সিং, আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।
সংলাপের এ পর্বে আরও আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সদরুল আমিন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিয়া আমীর।
অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন মোহাম্মদ জসিমউদ্দীন। তিনি জানতে চান তারেক রহমানের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে নাকি সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে?
বাংলাদেশের এক আদালত সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির এক আবেদন মঞ্জুর করেছে। অর্থ পাচারের এক মামলায় বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন এই আবেদন করে।
জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বাধীন কমিশন। কমিশন কি করবে সেটা নিতান্তই তার ব্যাপার। এক্ষেত্রে সরকার কোন নির্দেশনা দিচ্ছে না। কমিশন এখন ইচ্ছে করলেই কাজ করতে পারে। কেউ অপরাধ হয়ে থাকলে কমিশন পদক্ষেপ নিয়ে থাকবে। বিচার বিভাগ সরকারকে কোন নির্দেশনা দিলে সরকার সে অনুযায়ী কাজ করবে”।
তিনি বলেন, “মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে কমিশনের সিদ্ধান্ত মিললেও সেটা কাকতালীয়। কমিশন কারো ডিকটেশনে কাজ করছেননা। কমিশন তাদের ইচ্ছে মতো কাজ করছে। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে”।
তবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং ইন্টারপোলের বিষয়টি সরকারের নির্দেশনায় হয়েছে। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন যে ভূমিকা রেখেছে সেটি সরকারের ইঙ্গিতেই হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন আইন প্রতিমন্ত্রী যেদিন বললেন তারেক রহমান সরকার উৎখাতের চক্রান্ত করছে তার পরদিনই আদেশটা হল। দুর্নীতি দমন কমিশন এখানে যে ভূমিকা রেখেছে সেটি সরকারের ইঙ্গিতেই ঘটেছে। না হলে আগে কমিশন এটি করল না কেন ? এ কমিশনকে আগেও সবাই দেখেছে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে।
তিনি বলেন, “বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপার্সন তারেক রহমান আত্মগোপন করেনি। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। ব্রিটেন সরকার তার অবস্থান জানে। আমাদের সরকারও জানে তিনি লন্ডনে রয়েছেন”।
একজন দর্শক বলেন, “বাংলাদেশে এ কমিশন কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। সবসময়ই তারা সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করেছে। এবারও তাই ঘটেছে”।
আলোচনায় অংশ নিয়ে তানিয়া আমির বলেন, “কমিশনের দায়ের করা মামলাগুলোর বিষয়ে তৎপর হওয়ার দায়িত্ব কমিশনেরই। কমিশনের কোন বাধা নেই স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য। ইচ্ছে করলেই তারা পারেন এবং এটিই তাদের দায়িত্ব”।
তিনি বলেন, “ইন্টারপোলে যেতে হলে তারা আগেই যেতে পারতো। দেখতে হবে তারা কতটুকু দক্ষ এবং তারা নিজেদের স্বাধীন মনে করে কাজ করবেন কি-না সেটি একটি বিষয়। সরকারের বলার জন্য অপেক্ষা করার দরকার কি ?”
সদরুল আমিন বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কাজ করছে। ইন্টারপোলের বিষয়টি আমার কাছে মনে হয়েছে অতি উৎসাহ। আইন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য কাকতালীয় নয়। কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করছে। ”
ক্রিকেটে স্পট ফিক্সিং
আরেকজন দর্শক মাইশা তাসনিম জানতে চান বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ঘিরে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে তা কি এদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে ?
সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদপত্রে বাংলাদেশের কয়েকজন সাবেক এবং বর্তমান খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে স্পট ফিক্সিং এ জড়িত থাকার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।
মি: আমিন বলেন, “এ বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার দরকার ছিল। স্পট ফিক্সিং খুবই অনৈতিক বিষয়। খেলার স্পিরিট নষ্ট হল। টাকার প্রতি এতো লোভ হওয়া ঠিক নয়। এটা খেলার আনন্দ নষ্ট করে দেয়। ক্রিকেটাররা কিন্তু ভালো আয় করেন। সবাই তাদের আইডল মনে করে। বাংলাদেশের তরুণ খেলোয়াড়দের এতে জড়িয়ে পড়া দুর্ভাগ্যজনক”।
মিস আমির বলেন, “এটা সিরিয়াস একটি অভিযোগ। বাংলাদেশ এটা কীভাবে সামলাবে সেটিই এখন দেখার বিষয়। আমাদের ইমেজ সংকট তো সবসময়ই আছে। ক্রিকেট নিয়ে আমাদের একটি গর্ব ছিল। কারণ এটি ইমেজ সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখছিল। এ ঘটনা একটি চরম দায়িত্ব হীনতা। ”
এ প্রসঙ্গে দর্শকরা প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেন।
একজন দর্শক বলেন, “আইপিএল এবং বিপিএলের মতো গ্ল্যামারাস টুর্নামেন্টগুলো খেলোয়াড়দের দুর্নীতিতে উৎসাহিত করছে। এরপরই এসব ফিক্সিং-এর মত শব্দগুলো শুনছি।”
আরেকজন দর্শক বলেন, “অভিযোগ প্রমাণ হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে- যাতে ক্রিকেটের ক্ষতি না হয়|”
অপর একজন দর্শক বলেন, “দেশে যখন নানান সমস্যা তখন একটা জয় আমাদের অনেক আনন্দিত করতো। এখন যখন খেলা দেখতে বসব তখন অবশ্যই অনেক খারাপ লাগবে।”
আরেকজন দর্শক বলেন, “আমরা হতাশ হলাম, আহত হলাম যে আমাদের ক্রিকেটেও দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে।”
প্রতিমন্ত্রী মি: ইসলাম, “অভিযোগ সত্যি হলে বোর্ডের উচিত হবে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। যাতে করে ভবিষ্যতে এসব আর না ঘটতে পারে। সরকার আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত। শুরুতেই দমন না করলে এগুলো বাড়তে থাকবে।”
তিনি বলেন, “খেলোয়াড়রা অনেক সচ্ছল। সরকার অনেকে খেলোয়াড়কে প্লট, টাকা ও গাড়ি দিয়েছে। তারপরেও এগুলো কেন ঘটবে”।
এবং বিএনপি নেতা মীর নাছির অভিন্ন সুরে বলেন ক্রিকেটে দুর্নীতির অভিযোগ সত্যি হলে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগ
ফেরদৌসী আরেফিন জানতে চান বর্তমান সরকার বিরোধী আন্দোলনকে যেভাবে বলপূর্বক দমন করছে সেটা কি গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ?
মিস আমির বলেন, “হরতালের নামে রাজনীতিতে যা চলছে যে অবস্থার সৃষ্টি করা হয় এটা গণতান্ত্রিক চর্চা নয়। কেউ জাতীয় পতাকা পোড়ালে, শহীদ মিনার ভাংচুর করলে সন্ত্রাস দমন আইনে শক্ত হাতে যে ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল সেটায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এগুলো রাজনৈতিক কাজ নয়, এগুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড”।
মীর নাছির বলেন, “বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দশ হাজার মামলা করা হয়েছে। সাড়ে ৩ লাখ আসামী করা হয়েছে। জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ২৫টি মামলা করা হয়েছে। আমাদের সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সব সংকটের সমাধান হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলে”।
মি: আমিন বলেন, “বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই গ্রেফতার হয়েছেন। বিবৃতি দেয়ার মতো কেউ নেই। সরকার অসহনশীল। কিছুই সহ্য করতে পারছেনা। তবে জ্বালাও পোড়াও আমরা সমর্থন করিনা”।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যদি কেউ অবৈধ কাজ বা ষড়যন্ত্র করে তাহলে জনগণ তা প্রতিরোধ করবে। সরকার কোন বাড়াবাড়ি করেছে বলে আমি মনে করিনা। সরকার যথেষ্ট সহনশীলতা দেখিয়েছে”।
হরতাল এবং ইংলিশ মিডিয়াম
শামীমা আখতার জানতে চান রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত ইংলিশ মিডিয়ামের পরীক্ষার দিন পরীক্ষা দিচ্ছেনা। তাহলে বাংলা মিডিয়ামের পরীক্ষার দিন কেন দেয়া হচ্ছে ?
সাম্প্রতিক সময়ে ইংলিশ মিডিয়ামের পরীক্ষার সুবিধার্থে বিএনপির ৩৬ ঘণ্টার হরতালের সময় ছাড় দেয়া হয়েছিলো। এ প্রেক্ষিতেই বিষয়টি আলোচনায় আসে।
তবে মীর নাছির বলেন, “এ ধরনের বৈষম্য করে হরতাল দেয়া হয়না”।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ইংলিশ বা বাংলা মিডিয়াম নয়, বিরোধী দল তাদের স্বার্থ দেখেই হরতাল দেয়”।
একজন দর্শক বলেন, “ রাজনীতিকদের সন্তানরা অধিকাংশ বিদেশে পড়ালেখা করে। আর দেশে থাকলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ালেখা করে। এ কারণেই হয়তো হরতালের সময় একটু বিবেচনা করা হয়েছে”।

মি: আমিন বলেন, “ইংলিশ মিডিয়াম কোন বিবেচনা করা হয় বলে আমার মনে হয়না”।
মিস আমির বলেন, “হরতাল কোন গণতান্ত্রিক অধিকারই হতে পারেনা”।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে চলতি সপ্তাহে আলোচিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপনার কী মতামত?:
দূর্নীতি দমন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকেন,তাহলে সরকার দলের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়,অথচ বিরোধী দলের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয় না কেন? দূর্নীতি দমন কমিশন কি বড় দূর্নীতিবাজ নয়?জনগন যদি বড় বিচারক হন, তাহলে শান্তিপ্রিয় সংখ্যাগরিষ্ট জনগন তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চান,সেটা মানা হচ্ছে না কোন অপকর্মের ভয়ে?
নুর মোহাম্মদ মজুমদার, দোহা,কাতার।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন নির্বাচন কমিশনের মতই স্বাধীন তবে এর কেউই দেশের বর্তমান প্রধান দুই দলের অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না, যদিনা এ দু দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে অথবা তৃতীয় কোন ফ্রন্ট ক্ষমতায় যায়।
তাজুল ইসলাম, ঢাকা।








