বিশ্বকাপ ফুটবল: দেশের ভেতরের বিক্ষোভ কেন বিশ্বকাপে ইরানের জন্য বড় দুশ্চিন্তা

ছবির উৎস, Rex Features
সেপ্টেম্বর মাসের কথা। ভিয়েনা শহরে একটি আন্তর্জাতিক 'ফ্রেন্ডলি' ফুটবল ম্যাচ চলছে - ইরান আর আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন সেনেগালের মধ্যে।
খেলার ফলাফল ১-১ ড্র। রেফারি খেলা শেষের বাঁশী বাজালেন।
ইরানের দিক থেকে এই ফল নেহায়েৎ খারাপ নয় - কিন্তু দলটির মধ্যে কোন উৎফুল্ল ভাব দেখা যাচ্ছে না।
ইরানী খেলোয়াড়রা খুশি নন, মুখ গোমড়া কোচিং স্টাফদেরও।
আর মাঠের বাইরে ইরানি ফুটবল ভক্তরা তো একেবারেই খুশি নন। হবেনই বা কীভাবে, এই ইরানি ফুটবল সমর্থকরা তো মাঠেই ঢুকতে পারেননি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ স্থানীয় একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া করেছিল তাদের মাঠে প্রবেশ ঠেকাতে।
অবশ্য ঢুকতে না পারলেও তারা তাদের মুখ যেন কেউ বন্ধ করতে না পারে সে ব্যবস্থা করেছিল। তারা সাথে এনেছিল মেগাফোন, আর স্টেডিয়ামের বাইরে বসিয়েছিল লাউডস্পিকার ।
ফলে তাদের বক্তব্য এত জোরে শোনা যাচ্ছিল যে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ সেদেশে ম্যাচটি লাইভ দেখানোর সময় প্রচার করেছিল শুধু দৃশ্য - কিন্তু সবরকমের শব্দ প্রচার বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
ইরানে বিক্ষুব্ধ পরিবেশ
সেপ্টেমবরের মাঝামাঝি থেকেই ইরানের পরিবেশ ছিল বিক্ষুব্ধ। দেশটির নানা শহরে তখন চলছিল সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ।
এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনি নামে ২২-বছর বয়সী এক তরুণীর মৃত্যুতে।

ছবির উৎস, টুইটার
এই মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা পরিণত হয়েছিল সরকারবিরোধী বিক্ষোভে। গত এক দশকের মধ্যে ইরানের এত ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায়নি।
ভিয়েনার স্টেডিয়ামের বাইরের বিক্ষোভকারীরাও মাহসা আমিনির নাম করে শ্লোগান দিচ্ছিল।
কিন্তু ইরানের সরকার চায় না যে সেদেশের লোকে মাহসা আমিনির নামে শ্লোগান শুনুক, আর বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় তো নয়ই।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
কাতার বিশ্বকাপে ইরানের খেলা পড়েছে ইংল্যান্ডের সাথে। সোমবারের ওই ম্যাচে খেলোয়াড় এবং দর্শক-ভক্তরা কী আচরণ করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিন্তু কী ঘটে তা দেখতে সবারই নজর থাকবে এ ম্যাচটির দিকে।
বিক্ষোভের সূচনা মাহসা আমিনির মৃত্যু থেকে
উত্তর-পশ্চিম ইরানের এক কুর্দি পরিবারে তার জন্ম, আর সেপ্টেমবর মাসে তিনি তার পরিবারের অন্যদের সাথে তেহরান এসেছিলেন।
ইরানে মেয়েদের হিজাব সংক্রান্ত যে কড়া নিয়ম আছে - তা ঠিকমত পালন না করার অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশ তাকে আটক করার পর তার মৃত্যু হয়। এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির আইন অনুযায়ী মেয়েদেরকে হিজাব দিয়ে মাথার চুল পুরোপুরি ঢেকে রাখা এবং ঢিলেঢালা পোশাক দিয়ে বাহু ও পা ঢেকে রাখার নিয়ম আছে।

ছবির উৎস, মাশা আমিনি পরিবার
অভিযোগ উঠেছিল যে পুলিশ কর্মকর্তারা লাঠি দিয়ে মাহসা আমিনির মাথায় আঘাত করে এবং গাড়িতে তার মাথা ঠুকে দেয়। কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে যে মাহসা আমিনি হঠাৎ হার্টফেল করে মারা গেছে।
তার পরিবার বলছে, মাহসার কোন স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল না। তার মৃত্যু এমন তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে যে - সাকেজ শহরে তার দাফনের সময় মহিলারা মাথার হিজাব খুলে ফেলে সরকারবিরোধী শ্লোগান দেন।
ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে, আর সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
এর একটা বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় খেলার মাঠে।
অক্টোবর মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান ক্লাইম্বিং প্রতিযোগিতার সময় ইরানিয়ান প্রতিযোগী এলনাজ রেকাবি তাতে অংশ নেন হিজাব না পরা-অবস্থায়।
তিনি দেশে ফিরলে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয় হাজার হাজার মানুষ।
দেশে ফেরার আগে তিনি ইনস্টাগ্রামে একটি বার্তা পোস্ট করেন - যাতে তিনি বলেন যে 'ভুলবশতঃ' তার চুল খোলা অবস্থায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। তার পোস্টের ভাষা থেকে অনেকে ধারণা করেন যে চাপের মুখে তাকে ওই বিবৃতি দিয়ে হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের জন্য এক বড় প্ল্যাটফর্ম ফুটবল
ইরানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হচ্ছে ফুটবল - আর এবছর তাদের জন্য বিশ্বকাপও এক বড় ঘটনা।
বিশ্বকাপ ফুটবলে ইরানের অংশ গ্রহণের রেকর্ড - মধ্য প্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় - খুব খারাপ নয়।
এ পর্যন্ত ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল - ১৯৭৮, ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২।
অবশ্য কোনো বারই গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি ইরান।
কীভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ইরানি ফুটবলাররা
ইরানি ফুটবলের বড় দুই তারকা হচ্ছেন আলি করিমি ও আলি দায়েই । আলি করিমি ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখে খেলেছেন। তা ছাড়া আলি দায়েই হচ্ছেন ইরানের পক্ষে রেকর্ড গোলদাতা।
এরা দুজনের সরকারবিরোধীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন।
গত ২৭শে সেপ্টেম্বর সেনেগালের সাথে ইরানের একটি ম্যাচের আগে ইরানের কিছু খেলোয়াড় সামাজিক মাধ্যমে বার্তা পোস্ট করে বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানান।
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Reuters
তাদের বলা হয়েছিল এরকম কিছু না করতে - কিন্তু তারা তা মানেননি।
ইরানের জাতীয় দলের তারকা সরদার আজমুন ইনস্টাগ্রামে এখনো সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
সাতাশ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার জার্মান লিগে বেয়ার লেভারকুসেনে খেলে থাকেন। আর ইনস্টাগ্রাম হচ্ছে হাতে গোণা যে দু-চারটি সামাজিক মাধ্যমে নেটওয়ার্ক ইরানিরা ব্যবহার করতে পারে তার একটি ।
বেশ কয়েক মাস ধরেই ইরানি ফুটবল লিগে খেলোয়াড়রা গোল উদযাপন করছেন না।
বলটা যখন গোললাইন অতিক্রম করে তখন যিনি গোল করেছেন সেই খেলোয়াড়টি তার হাত নিচে নামিয়ে আনেন - যা সম্ভবত ইরানে এখন যা ঘটছে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।
রাষ্ট্রীয় টিভিতে এখন গোল হবার পরই গোলদাতাকে না দেখিয়ে যারা গোল খেয়েছে তাদেরকে দেখানো হতে থাকে ।
ইরানে যে দুটি ফুটবল দলের সমর্থক সবচেযে বেশি - তাদের একটি হচ্ছে এস্তেগলাল এফসি। দু সপ্তাহ আগে তারা সুপার কাপ জিতেছে। সে সময় তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা বিজয় উদযাপন করবে না।

ছবির উৎস, Getty Images
তারা আয়োজকদের বলে দিয়েছিল যে ম্যাচ শেষের অনুষ্ঠানে যদি আতসবাজি পোড়ানো বা গান বাজানো বন্ধ রাখা হয় - তাহলেই শুধু তারা ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেবে।
রাষ্ট্রীয় টিভিতে সেই সব দৃশ্যও সংক্ষিপ্ত ভাবে দেখানো হয়েছিল।
বিক্ষোভ শুরু হবার পর থেকেই দেশটিতে ইরানি লিগের ফুটবল ম্যাচগুলো রুদ্ধদ্বার মাঠে খেলা হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন যে ইরানি কর্তৃপক্ষের ভয় - ফুটবল ভক্তদেরকে মাঠে আসতে দিলে তারা একটা নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইরানের ফুটবল দলের সবশেষ ম্যাচটি ছিল নিরারাগুয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচ।এ ম্যাচটিও অনুষ্ঠিত হয়েছিল দর্শকবিহীন স্টেডিয়ামে। ওই ম্যাচের সময় অনেক খেলোয়াড়ই জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করে।
তবে দু-জন খেলোয়াড় ছিলেন ব্যতিক্রম। এরা দুজন জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছিলেন, এবং তারা আগে ইরানের শাসকদের সমর্থন করেছিলেন।
প্রতিবাদ করছেন অন্য ইরানি খেলোয়াড়রাও
একই ভাবে প্রতিবাদ করেছেন দুবাইয়ে বীচ ফুটবলের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ টুর্নামেন্টে আসা ইরানি খেলোয়াড়রা।
তাদের সাইদ পিরামুন এতটি গোল করার পর উদযাপনের সময় মাথার চুল কাটার ভঙ্গি করেন। এটি এখন এক প্রতীকী ব্যাপার হয়ে উঠেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
ইরানের কিছু বিক্ষোভে দেখা গেছে কিছু নারী প্রকাশ্যে তাদের চুল কেটে ফেলছেন। বীচ ফুটবলের তারকারা সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন - এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
বীচ ফুটবলের ফাইনালে ইরান ব্রাজিলকে হারায়। আর তার পরও খেলোয়াড়রা কোন উল্লাস উদযাপন করেননি।
সাম্প্রতিক কিছু ম্যচের সময় ইরানের বাস্কেটবল, বীচ ফুটবল, ভলিবল এবয় ওয়াটার পোলো খেলোয়াড়রাও জাতীয় সঙ্গীত গাননি।
বিশ্বকাপে ইরানের গ্রুপে দুই 'চিরশত্রু' ব্রিটেন ও আমেরিকা
এসব নানা ঘটনার ফলে এক চাপা উত্তেজনার মধ্যে ইরান বিশ্বকাপ খেলতে কাতার যাচ্ছে।
ইরানি খেলোয়াড়রা যদি আবার জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করে, অথবা কাতারে ক্যামেরার সামনে প্রতিবাদ হিসেবে অন্য কিছু করে? কী হবে তাহলে? ইরানি খেলোয়াড়রা গোল করার পরই বা কী করবেন?
তার ওপর ইরানের সাথে একই গ্রুপে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড আর ওয়েলস -
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডকে তাদের "চিরশত্রু" বলে মনে করে ইরান।
আরো একটি প্রশ্ন ইরানের ফুটবল ফ্যানরাই বা টুর্নামেন্টে কী প্রতিক্রিয়া জানাবে?
অনেকেই আছেন দ্বিধায়। কারণ তারা কী করবেন বুঝতে পারছেন না ।
ইরানের সমর্থকরা চিন্তিত - কারণ তারা ইরানের পক্ষে শ্লোগান দিলে কি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে বিক্ষোভকারীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন - তাদের সাথে প্রতারণা করা হবে?









