ইতিহাসের সাক্ষী: ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আয়াতোল্লাহ খোমেইনির নির্দেশে ধর্মনিরপেক্ষদের উচ্ছেদ

ছবির উৎস, Kaveh Kazemi/Getty Images
ইরানের ধর্মীয় নেতারা ১৯৮০ সালের গ্রীষ্মকালে দেশটিতে ধর্মীয় সংস্কৃতির পালাবদল ঘটাতে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন।
দেশব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতর তাদের শাসনের বিরোধী যেসব ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী আর ধর্মীয় মধ্যপন্থীরা ছিলেন তাদের উৎখাত করাই ছিল তাদের এই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য।
ধর্মীয় নেতারা মনে করেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ এই গোষ্ঠীগুলোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে মানুষের মনে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বীজ বপন করছে।
ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তখন একবছরের কিছু বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে।
ফারুখ নেগান্দর তখন ধর্মনিরপেক্ষ একটি বামপন্থী দল ফাদা-ইয়ানের নেতা। তিনি ও তার কমরেডরাও শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। ওই দলের বেশিরভাগই ছিলেন ছাত্র। কিন্তু তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন শাহ-পরবর্তী ভিন্ন এক ইরানের।
আরও পড়তে পারেন:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো 'গুচ্ছ বোমার চেয়েও মারাত্মক'
ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন ছিল ধর্মনিরপেক্ষ মানুষে ভরা, বিবিসির গুলনুশ গুলশানিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন ফারুখ নেগান্দর।
"আয়াতোল্লাহ খোমেইনি চেয়েছিলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালগুলোর কণ্ঠ হবে কট্টর ইসলামি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। শাহ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর, তিনি ও তার অনুসারীরা ঘোষণা করলেন যে তাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মূল লক্ষ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অনৈসলামিক চেতনার মানুষদের বরখাস্ত করা বা তাদের সরিয়ে দেয়া এবং সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইসলামী শাসনে বিশ্বাসী ধর্মীয় ব্যক্তিদের অধীনে একত্রিত করা।"
দেশটিতে সাংস্কৃতিক পালাবদলের এই বিপ্লব আসলে শুরু হয়েছিল এর মাস দুয়েক আগে- ১৯৮০ সালের বসন্তকালে।
ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখন নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রীতিমত উত্তাল। যেটাকে ইরানের নেতা আয়াতোল্লাহ খোমেইনি দেখেছিলেন একটা হুমকি হিসাবে।
"আমরা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ভীত নই। আমরা সামরিক হামলায় ভয় পাই না। আমরা ভয় পাই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। তারা গুচ্ছ বোমার চেয়েও মারাত্মক," বলেছিলেন আয়াতোল্লাহ খোমেইনি।
তার বার্তা ছিল খুবই স্পষ্ট। এপ্রিলের শেষ দিকে রেভল্যুশনারি কাউন্সিল তিনদিনের একটা চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলেছিল, এই সময়ের মধ্যে সব রাজনৈতিক দলকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণ রাজনীতি মুক্ত করতে হবে। নয়ত- " কাজটা শেষ করার জন্য আমাদেরই লোক পাঠাতে হবে" হুঁশিয়ারি দিয়েছিল রেভল্যুশনারি কাউন্সিল।

ছবির উৎস, GABRIEL DUVAL/Getty Images
প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গ
মেহেদি খোরাসানি সেসময় ছিলেন অঙ্কের ছাত্র। তিনি ফাদা-ইয়ানকে সমর্থন করতেন। অন্য যেসব ছাত্র কাউন্সিলের জারি করা এই আলটিমেটাম অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি তাদের সাথে যোগ দিলেন।
"লেকচারার, অধ্যাপকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। যাচ্ছিল শুধু শিক্ষার্থীরা," বিবিসিকে বলছিলেন মি. খোরাসানি।
"ফলে আমরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম, বসে থাকতাম, গল্প করতাম, রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেতাম। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করতাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় অন্য সময়ের মতই খোলা আছে, শুধু এরকম একটা পরিস্থিতি বজায় রাখা।"
প্রতিরোধ বাড়ার সাথে সাথে ফাদা-ইয়ানের নেতা ফারুখ নেগান্দরকে প্রেসিডেন্ট বানিসদরের দপ্তরে ডেকে পাঠানো হল।
"খুব ভোরবেলা- বোধহয় ভোর ছটা নাগাদ - প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ থেকে আমাদের ফোন করা হল। বলা হল অবিলম্বে প্রেসিডেন্টের দপ্তরে যেতে হবে। আমরাও দেরি না করে সোজা সেখানে গেলাম। দেখলাম প্রেসিডেন্ট একটা আরাম কেদারায় বসে আছেন," জানালেন ফারুখ নেগান্দর।
প্রেসিডেন্ট বানিসদর নিজে ছিলেন মধ্যপন্থী। তাকেও ইসলামি কট্টরপন্থীরা একরকম একঘরে করে ফেলেছিল।
ফারুখ বলছিলেন, প্রেসিডেন্ট তাদের জানালেন তারা সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনি বললেন তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধের প্রক্রিয়াটা সামলানোর চেষ্টা করছেন।
"শান্তিপূর্ণ বলতে তিনি সম্ভবত ইঙ্গিত করেছিলেন আমূল পরিবর্তনকামী যেসব বিপ্লবী আয়াতোল্লাহ খোমেইনির নির্দেশ পালন করতে উদ্যোগী হয়েছেন তাদের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর কথা।"
বামপন্থী গেরিলা সংগঠন ফাদা-ইয়ানের ফারুখ এবং অন্যান্য নেতাদের মনে হয়েছিল রক্তপাত এড়াতে হলে, তাদের ছাত্র সমর্থকদের কাছে গিয়ে বলতে হবে - তোমরা ঘরে ফিরে যাও।

ছবির উৎস, Kaveh Kazemi/Getty Images
সংঘাতে উত্তাল ছাত্র রাজনীতি
এর মধ্যে রেভল্যুশনারি কাউন্সিলের জারি করা চূড়ান্ত সময়সীমার দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসতে লাগল।
ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা বিপুল সংখ্যায় আয়াতোল্লাহ খোমেইনির অনুগত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে শুরু করল।
মেহেদি আর অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তখন উত্তর তেহরানের পার্স কলেজের ভেতরে আটকা পড়েছেন। তিনি বলছেন সেসময় কীভাবে পরিস্থিতি মোড় নিল অন্যদিকে।
"আমরা তখন ৩০০/৪০০ ছাত্র কলেজের ভেতরে। ওরা বাইরে থেকে কলেজ ভবনের ভেতর গ্যাস ছুঁড়তে শুরু করল। আমরা দেখলাম আমাদের সেখান থেকে বেরনর কোন পথ নেই। আমার প্রতিটা সেকেন্ডের কথা মনে আছে।
"ওরা কলেজের গেটের কাছে চলে এল। তারা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দাঁড় করিয়ে দুপাশে মানব দেওয়াল তুলে দিল। তাদের হাতে ছিল বন্দুক আর অন্যান্য অস্ত্র। তারা আমাদের বলল - একজন একজন করে ওই মানব দেওয়ালের মাঝের পথ দিয়ে বেরিয়ে যাও। যাবার সময় আমাদের মাথায়, কাঁধে সমানে তারা বেদম পেটাতে লাগল।"
মেহেদি খোরাসানি বলছেন, তারা ছিলেন পুরো নিরস্ত্র। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্রের হাতে একটাও বন্দুক বা অস্ত্র ছিল না।
আয়াতোল্লাহ খোমেইনির অনুগত সমর্থকরা জোর দিয়ে বলছিল ছাত্ররা অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Kaveh Kazemi/Getty Images
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় অবরুদ্ধ
রাজধানীর কেন্দ্রে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় তখন ঘিরে রেখেছে হাজারখানেক আয়াতোল্লাহ খোমেইনির সমর্থক ক্রুদ্ধ কট্টরপন্থী। ভেতরে তখন বন্দি পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী।
ফারুখ নেগান্দর তখন প্রেসিডেন্টের গাড়িতে করে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছুটলেন এই অচলাবস্থা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে।
রেভল্যুশনরি বাহিনীর একজন প্রতিনিধি বললেন প্রত্যেক ছাত্রকে জনে জনে তল্লাশি করা হবে তাদের কাছে অস্ত্র আছে কিনা দেখার জন্য। কেবল তারপরই তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরতে দেয়া হবে।
"আমি এই প্রস্তাবের বিরোধী ছিলাম। কারণ তারা চাইছিল শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করতে। এতে উস্কানি বাড়ত, সংঘাতের ঝুঁকি ছিল। ছাত্ররা আমাদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছিল," বললেন ফারুখ।
তিনি বললেন শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত ছিল, কিন্তু ছিল শান্ত।
"তারা স্লোগান দিচ্ছিল, কিন্তু কোনরকম হুমকি ছিল না। তারা গান গাইছিল, নির্দেশের অপেক্ষা করছিল এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহপাঠীদের উৎসাহিত করছিল।"
ফারুখ নেগান্দর বললেন, অবশেষে কয়েক ঘণ্টা আলোচনার পর যখন ভোর হল, ক্যাম্পাসের ওপর আকাশে সূর্য উঠল, কট্টরপন্থীরা রাজি হলেন ছাত্ররা তল্লাশি ছাড়াই ক্যাম্পাস ছাড়তে পারবে।
"ভোর ছটায় আমি যখন জানলার বাইরে তাকালাম, দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরটা পুরো খালি। সেটা ছিল আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত- মনে হয়েছিল ভেতরে আটকা পড়া হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন আমি বাঁচাতে পেরেছি," আবেগভরা কণ্ঠে বলছিলেন ফারুখ নেগান্দর।
কিন্তু কোথাও কোথাও সংঘর্ষ এড়ানো যায়নি, হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল।

ছবির উৎস, Kaveh Kazemi/Getty Images
অনিশ্চিত ভবিষ্যত
শেষ পর্যন্ত সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল নেয় রেভল্যুশনারি গার্ড বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং সেগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মেহেদি খোরাসানির মত ছাত্ররা ভাবতে বসেন এরপর তারা কী করবেন, কোথায় যাবেন?
"আমাদের সামনে তখন বিশাল একটা অনিশ্চয়তা। জীবিকার জন্য আমি প্রাইভেটে অঙ্ক পড়াতে শুরু করি, মিনিক্যাব চালাই মাঝেমধ্যে। কিন্তু মনপ্রাণে আমি ছিলাম একজন আন্দোলনকর্মী। আমরা ভেবেছিলাম দুএক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় আবার খুলে যাবে।"
হয়ত আন্দোলন আবার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা।
কিন্তু সেটা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় সহসা খোলেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইসলামীকরণ
তার সাংস্কৃতিক বিপ্লব সফল করার লক্ষ্যে আয়াতোল্লাহ খোমেইনি ১৯৮০ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পরিষদ গঠন করেন- নাম দেন কালচারাল রেভল্যুশন কাউন্সিল- সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিষদ। এর দায়িত্ব হয় এই পালাবদল প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারির।
এই পরিষদ গঠনের মধ্যে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে ইসলামীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখা হয় দু বছরের ওপর।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা চিঠি পেতে শুরু করেন। তাদের জানানো হয় কারা সেখানে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবেন আর কাদের সাসপেন্ড করা হবে বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরতরে নিষিদ্ধ করা হবে।
মেহেদিকে চিঠি দিয়ে জানানো হয় তাকে সাসেপন্ড করা হয়েছে। তাকে ডেকে পাঠানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার জন্য।
"বিভিন্ন ইসলামিক সমিতির সদস্যরা অথবা হেযবোল্লাহ ছাত্ররা, সংস্কৃতির এই পালাবদলের আগে যারা আমাদের পাশে বসে একইসঙ্গে ক্লাস করত, গিয়ে দেখলাম তারাই এখন টেবিলের অন্যদিকে। তারাই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা- তারাই আদালতের বিচারক," বিবিসিকে বলছিলেন মেহেদি খোরাসানি।
"তারা আমাকে বলল- হয় তুমি দুঃখ প্রকাশ কর, নাহয় স্বীকারোক্তি দাও যে তুমি অন্যায় করেছো। গ্যারান্টি দাও ভবিষ্যতে এরকম কোন কাজ করবে না। রাজনীতি করবে না। বলো - তুমি অনুতপ্ত। সেই মুহূর্তে বুঝলাম আমার লেখাপড়ার দিন শেষ- বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবার রাস্তা আর আমার জন্য খোলা নেই।"

ছবির উৎস, Kaveh Kazemi/Getty Images
কালচারাল রেভল্যুশান কাউন্সিল -যেটির গোড়াপত্তন করেছিলেন আয়াতোল্লাহ খোমেইনি, সেটি এখনও কার্যকর রয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি ইসলামিক হয়নি, যেটা তিনি চেয়েছিলেন।
তবে দুবছরের বেশি বন্ধ থাকার পর শত শত ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার অধ্যাপক এই বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে তাদের কাজ হারান। তারা আর ফিরতে পারেননি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হারান হাজার হাজার শিক্ষার্থীও।
পরের কয়েক বছরে বহু রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়, অনেককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন ফাদা-ইয়ান দলের কর্মীরাও।
ফারুখ নেগান্দর নির্বাসনে চলে যান ব্রিটেনে আর মেহেদি খোরাসানি পালিয়ে যান সুইডেনে। সেখানে আবার গোড়া থেকে লেখাপড়া শুরু করেন তিনি।









