টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: সাকিব আল হাসানের ৫টি বক্তব্য যা শ্রোতারা বলছেন 'অ্যারোগ্যান্ট'

ক্রিকেট, সাকিব, বাংলাদেশ

ছবির উৎস, রতন গোমেজ

ছবির ক্যাপশান, ২০১৯ সালে সাকিব আল হাসান
    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

নেদারল্যান্ডসের সাথে বাংলাদেশের খেলা আগামীকাল, তার আগে আজ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে সাকিব আল হাসান একজন সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আপনার প্রশ্ন শুনে মনে হয় আপনাকে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দিলে ভালো হতো।"

বাংলাদেশের ক্রিকেটের নিয়মিত দর্শক ও ক্রিকেট নিয়ে লেখালেখি করেন শেখ মিনহাজ হোসেন, তার মতে সাকিব যে আচরণ করলেন "সেটা ডিফেন্ড করার কোনও উপায় নেই"।

মি. হোসেনের মতে, "আপনার যদি ভিন্ন চিন্তা থাকে তাহলে আপনি সেটা বলেন। টিমের ভিন্ন চিন্তা থাকতেই পারে। সেটা দোষণীয় কিছু না।"

কিন্তু সাকিব যেভাবে বললেন, "লিটন ওপেন করলেই কি আমরা জিতবো", এটা বাংলাদেশের অধিনায়কের থেকে কাম্য নয় বলছেন তিনি।

সমর্থকদের কেউ কেউ বলছেন, "সাকিব একজন ক্রিকেটারই নন, অনেকের কাছেই তিনি রোল মডেল। এই ব্যাপারটা ওনার মাথায় রাখা দরকার"।

ক্রিকেট নিয়মিত অনুসরণ করেন এমন একজন সজল দাশ ফেসবুকে লিখেছেন, "সাকিব যেটা বলেছেন সেটা স্রেফ অ্যারোগ্যান্ট"।

তবে এবারই প্রথম নয় সাকিব আল হাসান এর আগেও এমন মন্তব্য করেছেন যা ক্রিকেট সমর্থকদের দৃষ্টিতে 'অ্যারোগ্যান্ট' (অহংকারী) মনে হয়েছে।

'লাঞ্চ ভালো ছিল'

দুই হাজার এগারো সালে বিশ্বকাপের একটি ম্যাচে বাংলাদেশ বাংলাদেশ অল্প রানে অলআউট হয়েছিল।

এতো কম রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে সাকিব বাজে ব্যাটিং কেন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিয়েছিলেন, "লাঞ্চ ভালো ছিল তো তাই সবাই তাড়াতাড়ি আউট হয়ে গেছে।"

সেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল।

সাকিব আল হাসান ছিলেন অধিনায়ক।

সাকিব তখনই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটার ও ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশের টেলিভিশন বিজ্ঞাপনেই তখন মুখে মুখে প্রচারিত কথা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল- "বাংলাদেশের জান, বাংলাদেশের প্রাণ। সাকিব আল হাসান।"

কিন্তু সাকিব অন্তত নিজের কথায় এই মান রাখতে পারেননি বলেই অনেকে মন্তব্য করেছেন।

'আমি আছি না দলে?'

সাকিব আল হাসানকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের আগে প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি তিন ফরম্যাটেই খেলবেন কি না।

সাকিব বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মিডিয়া ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে বলেন, 'আমি দলে আছি না?'

এরপর বলেন, 'আছি তো', এই বলে তিনি সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন।

কিন্তু পরে তিনি এই সিরিজে ওয়ানডে খেলেননি।

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের হয়ে প্রায় সময়ই সিরিজের আগ মুহূর্তে দল থেকে সরে যান।

এটা নিয়ে নানা সময়ে বির্কের সৃষ্টি করেছেন এবং বিশেষত ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচকরা শেষ মুহূর্তে একজন অলরাউন্ডারকে না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন।

'মেসেজ পেয়েছিলাম কিন্তু পড়িনি ভেতরে কী আছে'

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৯ শুরুর আগে যে আনুষ্ঠানিক ছবি তোলার আয়োজন করা হয় সেখানে অংশ নেননি সাকিব আল হাসান।

উনত্রিশে এপ্রিল ঢাকায় মিরপুর শের-এ-বাংলা স্টেডিয়ামে এই আয়োজন হয়, যেখানে সাকিব স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু ফটোসেশনে অংশ না নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নাজমুল হাসান পাপন বলেন, "ফটোসেশনে সাকিবের অনুপস্থিতি সত্যিই দুঃখজনক। আমি স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় সাকিবকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায়। ও বললো, আমি তো ঢাকায় চলে এসেছি। আপনার বাসায় আসবো রাতে। আমি বললাম, কেন? এখনই তো দেখা হবে। ও বলল, না, আমি বেরিয়ে গেছি। আমি পরে জানতে পারলাম যে সাকিবকে আগেই বলা হয়েছিল আজ দলের ফটোসেশন হবে। জাতীয় দল বিশ্বকাপে যাচ্ছে, তাই সবার সঙ্গে সাকিবকেও ফটোসেশনে দেখার আশা করেছিলাম। কিন্তু সে ছিল না।"

সাকিবকে ছাড়াই বিশ্বকাপ দলের ১৪ ক্রিকেটার অংশ নিয়েছেন ফটোসেশনে, সাকিবের অনুপস্থিতি দলের মধ্যে কোনও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা এমন প্রশ্নে নাজমুল হাসান বলেছিলেন, "আমার মনে হয় দলের অন্যরা এত দিনে ওর এসব ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে! যাহোক, আমি মনে করি এটা ওর জন্যই দুর্ভাগ্য। সাকিবের কপাল খারাপ, আমাদের বিশ্বকাপ দলের ফটোসেশনে সে থাকতে পারলো না। এছাড়া আর কী বলবো।"

সাকিব আল হাসানকে এ বিষয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাবলীল উত্তরে বলেন, "(ফটোসেশনের) মেসেজ পেয়েছিলাম কিন্তু পড়ে দেখিনি ভেতরে কী আছে।"

সাকিব আল হাসান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সাকিব একই সাথে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী এবং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২ হাজার রানের মালিক।

মানসিকভাবে অসুস্থতার কথা বলে বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে

সাকিব আল হাসান চলতি বছর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে হুট করেই মানসিকভাবে অসুস্থতার কথা বলেন গণমাধ্যমে।

তবে তিনি যাচ্ছিলেন দুবাই, একটি মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে।

ফেরার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তুমুল আলোড়ন ফেলে সাকিবকে দেড় মাসের জন্য বিশ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

সাকিব আল হাসানের সাথে এরপর ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেই ওয়ানডে সিরিজ খেলতে রাজি করান।

কিন্তু টেস্ট সিরিজে তাকে ছুটি দেয়া হয়েছিল।

সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে প্রথম ওয়ানডেতেই ম্যাচ জেতান, ৭৭ রান তুলে ম্যাচ সেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন।

সাকিব আল হাসান মাঠে যেভাবে পারফর্ম করেন সে কারণেই অনেক সময় তার বাইরের কথা ও আচরণ আড়ালে পড়ে যায়, কিন্তু ক্রিকেট সমর্থকদের অনেকেই মনে করেন তরুণ সমাজের প্রতিও সাকিবের একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থাকে।

ক্রিকেট সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি তখন লিখেছিলেন, "মানসিক অসুস্থতা এমন একটা ব্যাপার যা নিয়ে অনেকে স্ট্রাগল করছে এবং করে।"

কারও এটাকে ভুলভাবে ব্যবহার করা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।

ভিডিওর ক্যাপশান, মাগুরায় নিজ বাড়ির সামনে সাকিব আল হাসান

কখনো কখনো তার স্ত্রী উম্মে আল হাসানও যোগ দিয়েছেন ফেসবুকে

একবার সাকিব আল হাসানের স্ত্রী ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন তথাকথিত ওপেনার ও ফাস্ট বোলাররা কতোটুকু অবদান রেখেছেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার এবং তার পরিবারের কেউ যখন ক্রিকেট দলেরই অন্য সদস্যদের নিয়ে ইঙ্গিতবহ কথা নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন তা ভালোভাবে নেননি অনেকেই।

তবে সাকিব আল হাসানের স্ত্রী মনে করেন, নানা ঘটনায় তার স্বামী সাকিব আল হাসানকে ভিলেন বানানো হয়।