সরকারি চাকরি: বাধ্যতামূলক অবসর কেন দেয়া হয়, এটা কি আমলাদের জন্য কোনো শাস্তি

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। কিন্তু ঠিক কী কারণে তাকে অবসরে পাঠানো হলো সেটি প্রকাশ করা হয়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে শুধুমাত্র জনস্বার্থে চাকরি হতে অবসর দেয়ার কথা বলা হলেও তার কোন কর্মকাণ্ড জনস্বার্থবিরোধী হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। প্রজ্ঞাপনটি রবিবার জারি করা হয়েছে।

সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের কয়েকজন বলেছেন যে আইন অনুযায়ী সরকার ২৫ বছর হয়ে গেলে একজন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠাতে পারে কিন্তু সেজন্য সুনির্দিষ্ট কারণ কখনো প্রকাশ করা হয় না।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সচিব মর্যাদার কোন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনাটি বিরল এবং এ কারণে মিস্টার হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সরকারি এ সিদ্ধান্ত কার্যত বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সালাউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলছেন, বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তাই কখনো জানতে পারেননি যে আসলে তাকে কেন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।

আর সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলছেন, সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ না থাকলে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া উচিত নয় কারণ এটি কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

বাধ্যতামূলক অবসর: আইনে কী বলা হয়েছে

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মকবুল হোসেনকে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪৫ অনুযায়ী সরকারি চাকরি হতে অবসরের কথা বলা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে।

এ ধারায় বলা হয়েছে 'কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ পঁচিশ বছর পূর্ণ হবার পর যে কোনো সময় সরকার, জনস্বার্থে, প্রয়োজনীয় মনে করলে কোনো রূপ কারণ না দেখিয়ে তাকে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করতে পারবে'।

তবে শর্ত থাকে যে যেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে।

মূলত এই ধারার আওতাতেই সরকার যে কোন কর্মকর্তাকে এমনকি তাকে কিছু না জানিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অর্থাৎ চাকরি থেকে অবসর দেয়ার আগে কি কারণে অবসর দেয়া হচ্ছে সেটি জানাতে সরকারের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

যদিও সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলছেন, চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে থাকা কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর দিলে তাকে কারণ জানানো উচিত। না হলে তিনি আদালতে যেতে পারেন প্রতিকারের জন্য।

"কয়েকজন আদালতে গিয়েছেন এবং তাদের পক্ষে সিদ্ধান্তও পেয়েছেন। এটি সরকারের জন্য বিব্রতকর। তাই কারণ জানালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জন্যও ভালো আবার সরকারের জন্যও স্বস্তিকর হতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

বাধ্যতামূলক অবসর কী ইঙ্গিত দেয়

বাংলাদেশে যখন নতুন করে কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে সাধারণত তারপর কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে দেখা যায় এবং এসব সিদ্ধান্ত হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়।

তবে এ যাবৎকাল কত কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে তার কোনো হিসেব পাওয়া যায়নি।

এবার মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়ার কোনো কারণ জানানো হয়নি বলে বিষয়টি নিয়ে রীতিমত অন্ধকারে প্রশাসনের উঁচু স্তরের অনেক কর্মকর্তাও। মিস্টার হোসেন বর্তমান সরকারের আমলেই অনেকগুলো পদোন্নতি পেয়ে সচিব পদে এসেছিলেন।

স্বাভাবিকভাবে ২০২৩ সালের ২৫শে অক্টোবর চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার কথা ছিল তার।

আবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সরকারের জন্য স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয় যেখানে সাধারণত রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করতে সরকার স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

নাম প্রকাশ করতে চাননি এমন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সরকার ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় এবং এতদিন পর কোনো সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর অর্থ একটাই হতে পারে আর তাহলো তিনি সরকারের স্বার্থবিরোধী কোনো তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন কিংবা কোনো গুরুতর অসদাচরণ করেছেন।

তার মতে, হয়তো গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সরকার এমন কিছু পেয়েছে যাতে মনে হয়েছে তাকে অবসরে পাঠানোই যৌক্তিক।

"আসলে সরকার এক যুগের বেশি ক্ষমতায়। এখন বাধ্যতামূলক অবসরের জন্য এক্সট্রিমলি সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড ছাড়া আর তো কোনো যুক্তি দেখি না। আবার অনেক সময় প্রভাবশালী কারও তদবির না রাখার কারণেও কর্মকর্তাদের ভিকটিম হবার নজির বাংলাদেশে আছে। সেরকমও হতে পারে। তবে মূল কারণটি যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কেবল তাদেরই জানা আছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

বাধ্যতামূলক অবসর কি কোনো শাস্তি নাকি সেফ এক্সিট?

অধ্যাপক সালাউদ্দিন এম আমিনুজ্জমান ও আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান- দুজনেই বলছেন এটা কোনো শাস্তি নয় কারণ এতে তিনি অবসরকালীন সব সুবিধা পাবেন।

"তবে এটি অস্বস্তির নিজের ও পরিবারের জন্য। আর্থিক ক্ষতি এই অর্থে যে বাকী মেয়াদের বেতন ভাতা পাচ্ছে না। তবে দেখার বিষয় হলো একদিকে কেউ মেয়াদ শেষের আগে চাকুরী হারাচ্ছেন আবার কেউ কেউ মেয়াদ শেষ করেও ৩/৪ বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাচ্ছেন," বলছিলেন আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান।

অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলছেন, বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া যেতে পারে গুরুতর অসদাচরণের জন্য অর্থাৎ জনস্বার্থে, যাতে তার দ্বারা অন্যরা প্রভাবিত না হতে পারে।

"কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশে নানা কারণে অনেক ভালো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলছেন, কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে কখনোই সরকার ব্যাখ্যা দেয় না, যা নিতান্তই অনুচিৎ।

"সরকার যাকে পছন্দ করছে না তাকে পঁচিশ বছর হলেই সরিয়ে দেবে আর কাউকে মেয়াদ শেষের পরেও ৩/৪ বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেবে, এটা কেমন কথা। পুরো বিষয়টা আসলে সবসময়ই সরকারের খেয়াল খুশি মতো। এতে কোনো স্বচ্ছতা নেই," বলছিলেন তিনি।

তার মতে এটি কোনো শাস্তি নয় কারণ অপরাধের জন্য হলে তো বিভাগীয় মামলা দিয়ে চাকুরিচ্যুত করতে পারতো।

"আবার হতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অপরাধ করেছেন কিন্তু সরকার তার অপরাধের শাস্তি না দিয়ে বাধ্যতামূলক অবসরের মাধ্যমে সেফ এক্সিটের (নিরাপদ প্রস্থান) সুযোগ দিলো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিস্টার খান।

তিনি অবশ্য মনে করেন খুব অনিবার্য না হলে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান ব্যবহার করা উচিত নয়। কারণ তিনি মনে করেন এতে প্রশাসনের সব স্তরেই একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।