আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: অস্ট্রেলিয়ার শক্তির জায়গা অনেক, ভাবনার জায়গা কোথায়?
- Author, রায়হান মাসুদ
- Role, বিবিসি বাংলা
(আগামী শনিবার, ২২শে অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্ব। এই টুর্নামেন্টে যোগ দিতে সবগুলো দলই এখন অস্ট্রেলিয়ায়। এই টুর্নামেন্টে কোন দলের শক্তিমত্তা কেমন, শিরোপা জয়ের পথে কারা এগিয়ে তা নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। প্রথম কিস্তিতে পড়ুন স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা।)
ওয়ানডেতে পাঁচবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন- ক্রিকেটের প্রতিটি বড় আসরেই অস্ট্রেলিয়া ফেভারিট দল হিসেবেই মাঠে নেমে থাকে।
এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এক বছরের ব্যবধানে আরও একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়ায়, চ্যাম্পিয়নও অস্ট্রেলিয়া, ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া শেষবার ওয়ানডে বিশ্বকাপের স্বাগতিক ছিল, সেখানেও তারা শিরোপা জিতেছিল।
গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতেও শিরোপা জিতেছে অস্ট্রেলিয়া।
ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ- বিগ ব্যাশ ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা, সঙ্গে স্বাগতিক হওয়ার সুবিধা এবং দলটির একাদশে যে মানের ক্রিকেটার আছেন তাতে এবারও অস্ট্রেলিয়া কাপ নেয়ার দৌড়ে আছে।
পরিপূর্ণ ক্রিকেটার ও সাথে পাওয়ার হিটার
অস্ট্রেলিয়ার শক্তিমত্তার জায়গার একটি হচ্ছে এই দলটি দীর্ঘদিন একসাথে ক্রিকেট খেলছে এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি স্কোয়াডে খুব বেশি পার্থক্য নেই। একেবারে নিকট অতীতে অ্যারন ফিঞ্চ ওয়ানডে ক্রিকেট ছেড়েছেন ঠিক। কিন্তু তাতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনেক দলই ভিন্ন কিছু চেষ্টা করে, নতুন কোনও অলরাউন্ডার, নতুন কোনও পন্থা অথবা একেবারেই 'আউট অফ দ্য বক্স' কিছু - যা প্রতিপক্ষ ভাবেনি।
কিন্তু টিম অস্ট্রেলিয়া প্রায় সবার থেকে আলাদা।
ডেভিড ওয়ার্নার, অ্যারন ফিঞ্চ, স্টিভ স্মিথ, জশ হ্যাজলউড, মিচেল স্টার্ক, ম্যাথু ওয়েড, প্যাট কামিন্স - এরা সবাই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিয়মিত ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে খেলে এসেছেন।
তবে খানিকটা আলাদা ধরনের ক্রিকেটার হিসেবে আছেন, যেমন- গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও টিম ডেভিড।
ম্যাক্সওয়েল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে সবচেয়ে অনিয়মিত ক্রিকেটারদের একজন, সম্প্রতি ভারতের মাটিতে সিরিজেও তিনি কোনও ম্যাচেই দুই অঙ্ক স্পর্শ করতে পারেননি।
তবু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তার ওপর ভরসা রাখছে।
এর আগের বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার রান ছিল এমন- ৫, ৬, ০, ০ ও ৭।
তবে ফাইনালে গিয়ে ১৮ বলে ২৮ রানের ইনিংসে তিনি নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার রিকি পন্টিংও আইসিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ম্যাক্সওয়েলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ভুল হবে, সে বড় ম্যাচের ক্রিকেটার।
আর অস্ট্রেলিয়া মূলত প্রতিপক্ষকে আঘাতটা করবে, ম্যাক্সওয়েল ও টিম ডেভিডকে ব্যবহার করে।
টিম ডেভিড এমন একজন ব্যাটসম্যান যিনি কেবল সামর্থ্যের জোরে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন।
মূলত খেলতেন সিঙ্গাপুরের হয়ে, কিন্তু তার ওপর নজর পড়ে মূলত যখন তিনি বিশ্বব্যাপী টি-টোয়েন্টি লিগগুলো মাতাচ্ছিলেন।
সিঙ্গাপুরে জন্ম নিলেও পারিবারিক সূত্রে টিম ডেভিড অস্ট্রেলিয়ান।
জাতীয় দলে খেলার প্রশ্ন এলে, শুরুতেই তিনি সুযোগ পান সিঙ্গাপুরে।
তাই সেখানে কিছুদিন ক্রিকেট খেলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে এবারে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলছেন তিনি।
বিভিন্ন লিগে টিম ডেভিডের স্ট্রাইক রেট
- সিঙ্গাপুর- ১৫৯
- অস্ট্রেলিয়া- ১৭৩
- ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ- ২১০
- বিগ ব্যাশ- ১৫৩
- পাকিস্তান সুপার লিগ- ১৮২
- ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ- ১৪৪
- ইংল্যান্ড- ব্ল্যাস্ট টি-টোয়েন্টি- ১৭০
- দি হান্ড্রেড- ১৫৭
উইজডেন ইন্ডিয়ার হেড অফ কনটেন্ট- অভিষেক মুখার্জীর মতে, টিম ডেভিড এতো কন্ডিশন নিয়ে ভাবেন না, বল পেলেই তিনি পেটাতে পছন্দ করেন।
বোলিং লাইন আপ- টুর্নামেন্ট সেরার কাতারে
ওয়ানডে ক্রিকেটে আইসিসি বোলারদের র্যাঙ্কিংয়ে দুই নম্বরে এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক নম্বরে আছেন জশ হ্যাজলউড।
টি-টোয়েন্টি বোলারদের র্যাঙ্কিংয়ে চার নম্বরে আছেন লেগ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা।
সাথে আছেন টেস্ট ক্রিকেটে আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর বোলার প্যাট কামিন্স।
অস্ট্রেলিয়ার মূল চারজন বোলারই ম্যাচ উইনার। যে কারণে অস্ট্রেলিয়া পাঁচজন বোলার নিয়ে ম্যাচ খেলে না।
ম্যাক্সওয়েল, স্টয়নিস অথবা মিচেল মার্শ- পঞ্চম বোলারের কোটা পূরণ করেন উইকেট ও চাহিদা অনুযায়ী।
যেহেতু এতে করে একজন বাড়তি ব্যাটসম্যানও পাওয়া যায়।
একইসাথে প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ক দুজনই সপাটে ব্যাট চালাতে পারেন।
কামিন্স তার আইপিএল টিম কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে দুর্দান্ত কিছু ইনিংস খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন গত মৌসুমে।
আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টিতে ব্যাট তেমন হাতে নেয়ার প্রয়োজন পড়েনি তার, তবে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে কামিন্সের স্ট্রাইক রেট ১৩৯।
অস্ট্রেলিয়া দলটা নিঃসন্দেহে শক্তিশালী, যে কোনও দলকে টেক্কা দেয়ার মতো বোলিং ও ব্যাটিং লাইন আপ আছে।
কিন্তু এই দলের থিঙ্কট্যাঙ্কে এখনও কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, যেসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর বা সমাধান না বের করলে, টুর্নামেন্টে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
স্টিভ স্মিথের জায়গা নিয়ে সংশয়
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সাংবাদিক অ্যালেক্স ম্যালকম, ইএসপিএনক্রিকইফোতে নিজের আর্টিকেলে লিখেছেন, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের হিসেবে স্টিভ স্মিথ একাদশে জায়গা পেলে তিনি অবাক হবেন।
গত ১২ মাসে স্মিথের স্ট্রাইক রেট ১১২। যা টি-টোয়েন্টিসুলভ নয় বলেই মনে করেন বিশ্লেষক ও লেখক অ্যালেক্স ম্যালকম।
তবে স্মিথ যে পারছেন না পাওয়ার ক্রিকেটের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এটা তিনি নিজেও স্বীকার করছেন।
গ্যাবায় সম্প্রতি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক টেস্ট অধিনায়ক বলেন, তিনি অন্যান্য অনেক ক্রিকেটারের মতো শক্তিশালী নন কিন্তু তিনি চেষ্টা করছেন টাইমিং দিয়ে নিজের ঘাটতি পূরণ করার।
যেটা করতে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন বলছে পরিসংখ্যান।
ক্যামেরন গ্রিন ও নাথান ইলিশকে নিয়ে- নির্বাচকরা ছিলেন মধুর সমস্যায়
অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ডেভিড ওয়ার্নার; এই দুজনই অস্ট্রেলিয়ার নিয়মিত ওপেনিং জুটি হিসেবে পরিচিত। চোট বা কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকলে, অন্তত গত ছয় সাত বছর ধরে এই দুজন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের হয়ে সাদা বলের ক্রিকেটে ম্যাচ শুরু করছেন ব্যাট হাতে।
কিন্তু মাঝে বাধ সেধেছিলেন ক্যামেরন গ্রিন।
ডেভিড ওয়ার্নারের অনুপস্থিতিতে এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানকে টিম ম্যানেজমেন্ট ভারতের মাটিতে ব্যাটিং অর্ডারের ওপেনিংয়ে পাঠিয়ে দেন।
মোহালিতে ৩০ বলে ৬১ এবং হায়দ্রাবাদে ২১ বলে ৫২ রান তুলে গ্রিন জানান দেন এই পজিশনের জন্য তিনিও প্রস্তুত।
গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অ্যারন ফিঞ্চ অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জিতলেও ব্যাট হাতে করুণ অবস্থা ছিল।
সেমিফাইনালে ০ এবং ফাইনালে করেছিলেন ৫ রান।
কিন্তু তিনিই আবার এই বছর শ্রীলঙ্কার মাটিতে, পাকিস্তানের মাটিতে এবং ভারতের মাটিতে ১০ ম্যাচে ৩১৪ রান তুলেছেন, ১৩৫ স্ট্রাইক রেটে।
ডেভিড ওয়ার্নারও কম যান না। তিনি সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২০০-এর বেশি স্কোর তাড়া করতে নেমে ৭০-এর মতো রান তুলে প্রমাণ দিলেন, তাকে কেন প্রয়োজন।
দুই হাজার উনিশ সাল থেকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কমপক্ষে ২০ ইনিংস যারা ব্যাট করেছেন, তাদের মধ্যে ডেভিড ওয়ার্নারের গড় সবচেয়ে বেশি।
গত তিন বছরে সবচেয়ে বেশি ব্যাটিং গড়
- ৬৯.০৬- ডেভিড ওয়ার্নার
- ৫৮.৮১- মোহাম্মদ রিজওয়ান
- ৫৩.২৭- ভিরাট কোহলি
- ৫০.৮৭- ডেভন কনওয়ে
- ৫৭.০৪- জস বাটলার
(সূত্র- ইএসপিএনক্রিকইনফো)
চূড়ান্ত স্কোয়াডে অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডে জায়গা না পেলেও বিশ্লেষকদের সবাই একমত দলে কোনও ইঞ্জুরি ঘটলে ক্যামেরন গ্রিন সেই জায়গাটি পাবেন।
এই অভাগাদের তালিকায় গ্রিনের সাথে আছেন নাথান ইলিশ, ৫ ম্যাচে ১৫ উইকেট নেয়া এই ফাস্ট বোলারেরও জায়গা হয়নি চূড়ান্ত স্কোয়াডে।
তবে সব মিলিয়ে কাগজে কলমে অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডের বিশ্বকাপ ধরে রাখার সামর্থ্য রয়েছে। এমনকি স্কোয়াডের বাইরেও এমন ক্রিকেটার আছেন যারা বিশ্বের যে কোনও দলে জায়গা করে নিতে পারেন।