আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
আবহাওয়া: বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, সাগরে তিন নম্বর সংকেত, ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপের সৃষ্টি হওয়ায় আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
লঘুচাপের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলোকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। মাছ ধরা ট্রলারগুলোকে গভীর সমুদ্রে না গিয়ে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
তিন নম্বর সতর্ক সংকেতের মানে হচ্ছে বন্দর ও বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলোর দুর্যোগ কবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসময় বন্দরে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং ঘূর্ণি বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০-৫০ কি.মি. হতে পারে।
সোমবার আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিম সাগরে লঘুচাপটি তৈরি হয়েছে। সেটি আরও প্রবল হয়ে উঠতে পারে। এখন পর্যন্ত সেটা ভারতের দিকে যাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এই পর্যায়ে পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সমুদ্রের কোন স্থানে সাগরে বাতাসের চাপ কমে গেলে সেখানে লঘুচাপ তৈরি হয়। এই প্রবণতা আরও বেড়ে গেলে একসময় নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়।
তিনি জানান, লঘুচাপের কারণে বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা বিভাগসহ অনেক এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া সাগরও উত্তাল রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, মৌসুমি বায়ু ভারতের রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও বাংলাদেশ হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। ফলে আগামী তিনদিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসেই বঙ্গোপসাগরে এ নিয়ে দুটি লঘুচাপের সৃষ্টি হলো। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে তৈরি হওয়া লঘুচাপটি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের স্থলভাগে উঠে দুর্বল হয়ে পড়ে।
বঙ্গোপসাগরে কেন এত বেশি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় হয়
আবহাওয়াবিদদের মতে, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে অবতল আকৃতির অগভীর বে বা উপসাগরে। মৌসুমি ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাস যখন এরকম জায়গায় সাগরের পানিকে ঠেলতে থাকে, তখন ফানেল বা চোঙার মধ্যে তরল পদার্থ যে আচরণ করে, এখানেও তাই ঘটে। সাগরের ফুঁসে ওঠা পানি চোঙা বরাবর ছুটতে থাকে।
"এরকম ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের টেক্সটবুক উদাহরণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগর," বলছেন আবহাওয়াবিদ এবং ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ডের একজন লেখক বব হেনসন।
তবে বঙ্গোপসাগরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন সমুদ্রের উপরিতল বা সারফেসের তাপমাত্রা। বলছেন ভারতের আবহাওয়া দফতরের প্রধান ডি. মহাপাত্র। এটি পরিস্থিতিকে আরও বিপদজনক করে তোলে।
"বঙ্গোপসাগর খুবই উষ্ণ এক সাগর", বলছেন তিনি।
পৃথিবীর নানা অঞ্চলে আরও অনেক উপসাগর আছে যেখানে উপকূল বরাবর এই ধরনের জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি আছে। যেমন লুইজিয়ানার গালফ কোস্ট।
"কিন্তু বিশ্বের আর যে কোন উপকূলের চাইতে বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূল এই ধরনের সার্জ বা জলোচ্ছ্বাসের সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে আছে", বলছেন বব হেনসন।
আর এই উপকূলজুড়ে যেরকম ঘনবসতি, সেটা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের প্রতি চারজন মানুষের একজন থাকে বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলিতে।
খেয়ালি আবহাওয়া
গত মাসের শেষে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছিল, চলতি বছরের বর্ষাকালে অর্থাৎ জুলাই ও অগাস্টে গত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সঙ্গে এই দু'মাসের মধ্যে অন্তত পনের দিন দেশের কোন না কোন জায়গায় দাবদাহের মতো পরিস্থিতি দেখা গেছে, যা অনেকটাই নজিরবিহীন।
এ অবস্থার কারণে উপকূল জুড়ে তাপমাত্রার পাশাপাশি সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও বেড়ে গিয়েছিল। তাই দিনের পাশাপাশি রাতেও যথেষ্ট গরম অনুভূত হয়েছে।
কিন্তু হঠাৎ করে আবহাওয়ার এমন আচরণের জন্য মৌসুমি বায়ুর খেয়ালি আচরণকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে শরৎ ঋতুতে এসে, সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বৃষ্টির ঘনঘটা দেখা যেতে শুরু করে। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া একটি নিম্নচাপের কারণে বাংলাদেশেও বৃষ্টিপাত শুরু হয়। পরে সেটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে ভারতের স্থলভাগে গিয়ে দুর্বল হয়ে যায়।
আবহাওয়ার খেয়ালি আচরণের কারণ কী
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের জন্য কম বৃষ্টি, বাতাসের গতিবেগ কমে যাওয়া, জলীয় বাষ্পের আধিক্য, উপকূল জুড়ে সর্বোচ্চ ও সর্ব নিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান।
সেইসাথে গত এক দশকে গ্রীষ্ম ক্রমে দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং শীতকালেও গড় তাপমাত্রা বেশি থাকছে।
সেইসাথে বর্ষাকালে বৃষ্টির পরিমাণও কমে গিয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বৃষ্টিপাত হচ্ছে অন্য মৌসুমে। এর পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে মূল কারণ হিসেবে দুষছেন আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান।
মি. মান্নান বলেন, "জুন মাসে উত্তর পূর্বাঞ্চল বৃষ্টিতে ভেসে গেল। অথচ এই মাসে খরা পরিস্থিতি। বর্ষার আচরণ কিছুটা বৈচিত্র্যপূর্ণ যেমন এক বছরে বৃষ্টি বেশি হয়, আরেক বছর কম। কিন্তু এতো দীর্ঘদিন ধরে তাপপ্রবাহ থাকাটা অস্বাভাবিক।
মূলত, ২০১৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে আবহাওয়ায় এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে মেঘ পুঞ্জীভূত হতে পারছে না। গরম বাতাসের ধাক্কায় মেঘে যে পানি থাকে তা বৃষ্টি হয়ে নামার আগেই বাষ্প হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, তীব্র গরমের কারণে বাতাসের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাবে ফসলের আবাদ কমে যাচ্ছে - যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে, সেইসাথে নতুন ধরণের রোগবালাইও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।