আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রয়াণে কালো পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশের যে গ্রামে শোক পালন করছে মানুষ
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
উনচল্লিশ বছর আগে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ এসেছিলেন বাংলাদেশে। সফর-সূচির মধ্যে অন্যতম ছিল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রাম পরিদর্শন।
রানির আগমন উপলক্ষে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছিল গ্রামটি, কাঁচা ভবন থেকে পাকা বাড়িতে বদলে গিয়েছিল স্কুলসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।
সেই গ্রামের মানুষেরা স্মরণ করছেন রানিকে
সদ্য প্রয়াত ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ সফরের সময়, তিনি গিয়েছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রামে।
স্মরণীয় সেই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পর ৮ই সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা গেছেন।
এরপর শুক্রবার থেকে বৈরাগীরচালা গ্রামের অনেক বাড়িতে উড়ছে শোকের প্রতীক কালো পতাকা।
আরো পড়তে পারেন:
গ্রামটির বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুতে এই শোক পালন করছেন তারা।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যখন বাংলাদেশে আসেন, সেসময় তার পরিদর্শনের জন্য স্বনির্ভর গ্রাম হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল ঢাকার কাছের বৈরাগীরচালা গ্রামকে।
সেসময় স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফোরের ছাত্রী ছিলেন আঞ্জুমান আরা শিউলী, সফরসূচির অংশ হিসেবে রানি গিয়েছিলেন তার স্কুল পরিদর্শনে।
তিনি বিবিসিকে বলেছেন, সেদিনের ঘটনা তার স্পষ্ট মনে আছে।
"আমি ক্লাস ফোরে পড়তাম। স্কুলের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা লাইন ধরে তাকে (রানিকে) রিসিভ করেছি। কয়েকটা ক্লাস উনি পরিদর্শন করেন। ক্লাস ফোরও তার মধ্যে ছিল। আমাদের ক্লাসে যখন ঢুকছেন আমি প্রথম সারিতেই বসা ছিলাম। আমার সৌভাগ্য হইছে রানিকে স্বচক্ষে দেখার," বলেন তিনি।
তিনি বলছিলেন, "যখন শুনলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে উনি মারা গেছেন, আমরা আবেগে আপ্লুত হয়ে গেছি। এখন আমাদের বাড়িতে বাড়িতে শোক পালন করা হচ্ছে।"
আঞ্জুমান আরা শিউলী এখন শ্রীপুরের রেডক্রিসেন্ট মাতৃসদনে প্রশিক্ষিত মিড-ওয়াইফ বা ধাত্রী হিসেবে কাজ করছেন।
এই মাতৃসদনটির উদ্বোধন হয়েছিল রানির আগমন উপলক্ষেই।
রানির মৃত্যুতে বাংলাদেশের সরকার গতকাল শুক্রবার থেকে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছে।
এই তিনদিন দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে।
বদলে যাওয়া গ্রাম
রানির সফরের আগ পর্যন্ত বৈরাগীরচালা গ্রামটি ছিল নিতান্তই একটি অজপাড়াগাঁ।
গ্রামের বাসিন্দা একেএম সাখাওয়াত হোসেন খান বিবিসিকে বলেছেন, রানির সফরের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।
রেল লাইন থেকে রানিকে স্বাগত জানাতে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।
ওই সময় মি. খানের বাবা ছিলেন শ্রীপুরের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, যে কারণে রানির সফরকে উপলক্ষ করে ওই গ্রামটিতে হওয়া উন্নয়ন কাজ তিনি নিজের চোখে দেখেছেন।
মি. খান বলছিলেন, এসব কারণেই গ্রামের মানুষ রানিকে মনে রেখেছে এবং তার মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছেন অনেক মানুষ।
রানিকে চাবি উপহার
তিনি বলেন, "গ্রামের পক্ষ থেকে আমার বাবার ফুফু আকিমুন্নেসা রানিকে একটা রুপার চাবি উপহার দিয়েছিলেন।
চাবি দেয়ার উদ্দেশ্য হলো, রানি বা তার বংশধররা বৈরাগীরচালা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে যেকোন সময় যেতে পারবেন। তার জন্য সব দরজা উন্মুক্ত, খোলা।"
"আমাদের এটা অজপাড়াগাঁ ছিল, রানির আগমন উপলক্ষে এই গ্রাম বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছিল। রানিকে এই গ্রামের মানুষ মনে করে আমাদের পরিবারের সদস্য।
উনার মৃত্যুতে আমরা এত গভীরভাবে শোকাহত যে, এখানে দোকানে দোকানে কালো পতাকা, বাড়িতে বাড়িতে কালো পতাকা তোলা হইছে," তিনি বলেন।
কেবল বিদ্যুৎ সংযোগ নয়, মি. খান বলেছেন, রানির আগমন উপলক্ষে সেখানকার প্রাইমারি স্কুলের ভবনও পাকা করা হয়েছিল।
এছাড়া শ্রীপুর থেকে বৈরাগীরচালা সড়ক এবং শ্রীপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পাকা করা হয়।
মি. খান বলছেন, রানির আসা উপলক্ষে গ্রামটিতে যে উন্নয়ন কাজ হয়েছিলো, পরে তারই সূত্র ধরে এলাকায় ব্যাপক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে।
প্রায় চার দশক আগে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যখন ওই গ্রামে যান, তিনি ঢাকা থেকে ট্রেনে শ্রীপুর গিয়েছিলেন।
সেখান থেকে গাড়িতে করে গিয়েছিলেন বৈরাগীরচালা গ্রামে।
গ্রামটি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামের মডেল, যেখানে কৃষি থেকে খামার সব এক গ্রামের মধ্যেই ছিল।
রানি ওই গ্রামে সারাদিন বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং প্রকল্প ঘুরে দেখেছিলেন।
গ্রামের কাঁঠাল বাগানে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের সাথে জড়িত নারীদের সাথে সময় কাটিয়েছিলেন রানি।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ক্ষুদ্র ঋণের একটি প্রকল্পের সাথে যুক্ত সালেহা খাতুন।
সত্তরোর্ধ সালেহা খাতুন বলছিলেন ঋণগ্রহীতা দলের প্রতি গ্রুপে তিনজন সদস্যের একজন ছিলেন তিনি।
তিনি বলছিলেন, "আমার লগের কেউ-ই আর নাই, খালি আমি বাঁইচা আছি, আর সবাই মারা গেছে। আমার লগে যারা ছিল তাদেরকে কিছু জিজ্ঞাস করছেন উনি (রানি)। তারা জবাব দিছে, আমি খাড়ায় ছিলাম পাশে। অনেকক্ষণ তিনি হাসিমুখে কথা বলছিলেন। "
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রানি মারা গেছেন শুনেছেন?
তিনি মলিন কণ্ঠে জবাব দেন "পরশুই শুনছি। দুঃখ লাগতেছে। রানি আবার আইবার কথা কইছিল, আইছে না আর।"
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আনুষ্ঠানিক শোক পালনের বাইরে সালেহা খাতুন, আঞ্জুমান আরা আর সাখাওয়াত হোসেন খানের মত বৈরাগীরচালার কয়েকশ' পরিবার ভালোবাসায় স্মরণ করছেন কয়েক হাজার মাইল দূরের একটি দেশের রানিকে, ৩৯ বছর আগে তাদের গ্রামে কয়েক ঘণ্টার সফরে এসে যিনি তাদের মায়ায় বেঁধেছিলেন।